আমার চোখে তো পড়েনি।
তাহলে!
এই তাহলের জবাব কি আর আমি জানি!
আমরা তো আর কাশী-বৃন্দাবন যেতে পারব না। ট্র্যাকের জোর নেই। হ্যাঁ গো, মেজো বউমা নালিশ করলে কি আমাদের পুলিশে ধরবে?
বিষ্ণুপদ একটু ভেবে বলে, তা ধরতে পারে।
এও কি কপালে লেখা আছে, শেষ অবধি?
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মাত্র।
নয়নতারা বলল, আমাকে ধরে ধরুক, সে সইবে। কিন্তু তোমাকে ধরলে যে আমাকে গলায় দড়ি দিতে হবে।
বিষ্ণুপদ মৃদু স্বরে বলল, একটু পান খেয়ে ঘুমোও। কাল কি হবে তা নিয়ে ভাবতে নেই। যা হওয়ার হবে।
ঘুম কি হবে?
একটু পান মুখে দাও। হবে।
বাস্তবিকই পান মুখে নিয়ে নয়নতারা ঘুমোলা। তখন বিষ্ণুপদ টৰ্চটা হাতে নিয়ে এসে বাইরে বসল। বুকের মধ্যে বড় উচাটন। বড় উথাল-পাথাল। একটা আশার আলো যেন বিদ্যুচ্চমকের মতো ঝলসে উঠে মিলিয়ে গেছে।
বামাচরণের ঘর থেকে নানাবিধ শব্দ হচ্ছে। কখনও শ্যামলীর গলা, কখনও বামাচরণের উঃ আঃ।
অপমান করবে? তা করুক। বিষ্ণুপদ উঠোন পেরিয়ে বামাচরণের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
বউমা, আমি বিষ্ণুপদ।
শ্যামলীর কঠিন জবাব এল, কী চান? শেষ তো করে ফেলেছেন মানুষটাকে।
বউমা, বামার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?
কষ্ট হলে কী করবেন?
আমি বাইরেই বসা আছি। দরকার হলে ডেকো।
আপনাকে বসে থাকতে হবে না। নাকে তেল দিয়ে ঘুমোন গিয়ে। উঃ, কত দরদ!
বিপদের সময়ে বিচলিত হতে নেই। হিতে বিপরীত হয়।
আপনি ঘরে যান। আমার উপদেশের দরকার নেই।
বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি বড় অপদার্থ, মা। আমাকে মাপ করে দাও।
একথাটার কোনও জবাব এল না। বামাচরণ শুধু একবার বলে উঠল, কে গো? বাবা নাকি?
তুমি ঘুমোও তো।
বাইরে কী বাবা? ঘরে আসতে বলো।
শ্যামলী কঠিন গলায় বলল, না। তুমি ঘুমোও।
বামাচরণ একবার উঃ বলে কাতর আর্তনাদ করল। তারপর বলল, বাবা গায়ে হাত বোলালে ব্যথা সেরে যায় জানো? ছেলেবেলায়…
আর বলতে পারল না বামা। বোধহয় ঝিমুনি এল।
শ্যামলী চাপা গলায় বলল, আমি বসে সেবা করছি আর উনি বাবা-বাবা করছেন।
বিষ্ণুপদ মাথাটা দুধারে নাড়ল। তারপর বড় ধীর পায়ে ফিরে এল দাওয়ায়।
ধীরে ধীরে বামাচরণের ঘরের শব্দটব্দ সব বন্ধ হয়ে গেল। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়ল দুজনেই।
বিষ্ণুপদর আজ দুচোখ বড় জ্বালা করছে। দু-এক ফোঁটা জলও পড়ল বোধহয়। আজ তার বড় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। যদি এই মুহূর্তেই বুকের শব্দ থেমে যায়, তাহলে বেশ হয়।
একটা ছায়ামূর্তি চোর পায়ে উঠোনে ঢুকল। চারদিকটা আন্দাজ করছে।
বিষ্ণুপদ টৰ্চটা একবার পট করে জ্বালিয়েই নিবিয়ে দিয়ে খুব চপা গলায় বলল, আয়।
ছায়ামূর্তি কাছে এসে দাওয়ায় বসল।
তোর জন্যই বসে আছি।
রামজীবন একটা শ্বাস ফেলল। বিষ্ণুপদ বাতাসটা খুঁকে বুঝল, রামজীবন আজ মদ খায়নি।
কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
মনটা ভাল নেই বলে একটু কলকাতায় ঘুরে এলাম। ফিরেছি অনেকক্ষণ, বটতলায় বসেছিলাম।
কী হয়েছে তা জানিস?
জানি। শুনেছি।
এ কাজ করলি কেন? সেদিন মার খেয়েও কেমন ঠাণ্ডা ছিলি, বুকটা আমার ভরে গিয়েছিল। আজ বড় অস্থির লাগছে। কেন করলি বাপ।
নিজের জন্য করিনি বাবা।
কার জন্য করলি?
ও যে আপনাকে আর মাকে উচ্ছেদ করতে চায়!
তা আর বেশী কথা কী? চাইতেই পারে।
রোজ বুঝামেলা ভাল লাগে না বাবা। একদিন একটু শিক্ষা হওয়া ভাল।
বিষ্ণুপদ মাথা নাড়ল, ও ভাবে কি হয় বাপগুণ্ডা লাগিয়ে কি শিক্ষা হয়। বামা যা চায়, তাতে তার হক আছে। লোভী বলে ওর তর সয় না।
বাবা, বামাচরণ কখনও এ সংসারের জন্য কিছু করেছে? আপনাদের সেবা দূরে থাক, কোনওদিন শরীর খারাপ হলে এসে জিজ্ঞেস করেছে, কেমন আছেন? কোনওদিন একটা ফল হাতে করে এনেছে আপনার জন্য। কিছুই করেনি, তবু ভাগ চায় কেন? ভাগে ওর কী অধিকার?
অন্য কেমন তা দেখে তোর দরকার কী? তুই কেমন সেটা নিয়ে ভাবিস না কেন?
আমি কেমন, বাবা?
তোর অনেক গুণ বাপ। অনেক গুণ। কিন্তু বাপকে মাকে ভালটা মন্দটা খাওয়ালে আর ভক্তি শ্রদ্ধা করলেই কি হয়? বুকটা যে ভেঙে দিলি! দায়ের কোপ খেয়েও রেগে গেলি না, সেইটে দেখে যে বড় ভরসা হয়েছিল।
রামজীবন মাথাটা নিচু করে রইল। তারপর বলল, আমি তো খারাপই বাবা। আপনি আমার মধ্যে ভাল দেখেন কেন?
মার খেয়ে যদি উল্টে মারলি, তবে শোধবোধ হয়ে গেল। যদি মার খেয়েও না-মারলি, তবে তোর তবিলে কিছু জমা হল। আমি আহাম্মক, এরকমই বুঝি।
বামা যখন আপনাকে ঘরছাড়া করতে চায়, তখন আমার মাথার ঠিক থাকে না।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, কাল হয়তো পুলিশ আসবে। আজ অবধি এ জীবনে কখনও পুলিশের সঙ্গে বোঝাঁপড়া হয়নি আমার। এবার হবে।
পুলিশে খবর দিয়েছে, আমি জানি বাবা। তবে এফ আই আর করেছে আমার নামে। থানা থেকেই জেনে এসেছি।
থানায় গিয়েছিলি?
প্রায়ই যাই। কিছু হবে না। সাক্ষী নেই।
ঘরে যা।
যাই। মাঝরাত অবধি বসে আছেন, আপনার শরীর খারাপ হবে না?
শরীর আর কিসের খারাপ হবে? এখনও আছে, এই যথেষ্ট।
ওরকম বলবেন না বাবা।
আমার কখনও মরার ইচ্ছে হয় না। প্রাণটা যতদিন থাকে ততই যেন ভাল। কিন্তু আজ আমার বড় মরার ইচ্ছে হচ্ছিল।
কেন বাবা?
দুনিয়ার সঙ্গে আর লটকে থাকতে পারছি না। আলগা হয়ে গেছি যেন!
রামজীবন হাত বাড়িয়ে বিষ্ণুপদর পা দুটো ছুঁয়ে বলল, এই পা ছুঁয়ে যা প্রতিজ্ঞা করতে বলবেন আজ, তাই করব। বলেন বাবা।
বিষ্ণুপদ নড়ল না। চপ করে বসে রইল।
বলেন বাবা, যা খুশি। আজ যা প্রতিজ্ঞা করাবেন, তাই করব।
