শোও গে।
তুমি?
আমি! আমার কি আজ ঘুম হবে?
তবু শুয়ে থাকবে চলো। চলো।
দুজনে পাশাপাশি শুয়ে রইল। কিন্তু ঘুম হল না কারোই। বুকের মধ্যে নানা অশান্তি আর ভয় আজ নাড়াঘাটা খেয়ে ঘুলিয়ে উঠেছে।
ঘটনার তিন দিন বাদে এক সন্ধেবেলা বামাচরণকে ধরাধরি করে বাড়ি নিয়ে এল কয়েকজন। মাথা ফাটা, ঠোঁট দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে, কপালে একটা ঢিবি ফুলে আছে, সর্বাঙ্গে আরও নানা ক্ষত। বামাচরণ কথা কইতে পারছে না। গোঙাচ্ছে।
সারা বাড়িতে তুমুল কান্নাকাটি আর চেঁচামেচি উঠল। শ্যামলী চেঁচাচ্ছিল, চেঁচিয়ে কাঁদছিল নয়নতারা।
আবার নিজের শরীরের কাঁপুনি আর মাথার অন্ধকার টের পেয়ে বিষ্ণুপদ কিছুক্ষণ স্থবিরের মতো বসে রইল। যারা ধরাধরি করে এনে দাওয়ায় শুইয়ে দিয়েছে বামাচরণকে, তাদের একজন বলল, মাঠের ধারে পড়েছিল।
আবার পুলিন এল। পাড়াপড়শীরা এল। শুধু রামজীবনের কোনও পাত্তা নেই।
বিষ্ণুপদ কোনওক্রমে শুধু পুলিনকে জিজ্ঞেস করতে পারল, বাঁচবে?
পুলিন মাথা নেড়ে বলল, বাঁচবে। হাসপাতালে নিলে ভাল হত। অনেক রক্ত গেছে। কলির শেষ হে, বিষ্ণুপদ। এ হচ্ছে সুন্দ-উপসুলের লড়াই। দেখে যাও, পাপস্খালন হোক।
শ্যামলী চিৎকার করে রামজীবনকে গালাগাল দিচ্ছিল। সেইসব গালাগালের মধ্যে শুয়োরের বাচ্চা, কুকুরের বাচ্চা, বেশ্যার ছেলে, বেজ ইত্যাদির সঙ্গে, মুখে রক্ত উঠে মরার অভিশাপও ছিল। পুলিন একটু বিরক্ত হয়ে বলল, চেঁচামেচি করে কী লাভ হচ্ছে বলে তো! একে বরং ঘরে নিয়ে শোওয়াও গে। আর কাউকে পাঠিয়ে কয়েকটা ওষুধ আনিয়ে নাও। তুলো আর ব্যান্ডেজও লাগবে। তাড়াতাড়ি করো, আমি বেশিক্ষণ বসতে পারব না।
তাই হল। শ্যামলীর চেঁচানি একটু কম হল। বামাচরণকে ঘরে নিয়ে শশাওয়ানোর পর সেটা আরও কমে গেল।
কাণ্ডটা যে রামজীবনের পরম বান্ধবরাই করেছে, এটা বুঝতে কারও বাকি নেই। পুলিন ডাক্তার বিষ্ণুপদর পাশেই একখানা টিনের চেয়ারে বসে বলল, মরতে কি তোমাকে সাধে বলি? এর জন্যই বলি। আগের দিনে যে পঞ্চাশোর্ধ্বে বনং ব্ৰজেৎ নিয়ম ছিল, তারও কারণ হল এইসব।
বিষ্ণুপদ নীরবে শুধু মাথা নাড়ল। কথা কওয়ার মতো অবস্থা নয়।
পুলিন কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলে, শুনেছো তো, আমার ছোটো পুত্রটির কাণ্ড। কথা নেই, বার্তা নেই, কোথা থেকে একটা গোদা মেয়েছেলে ধরে এনে বুক ফুলিয়ে বলল, এ আমার বউ। বরণ করো। বোঝ কাণ্ড! আমরা তো হা হয়ে গেছি। তখন সে একখানা লেকচার ঝাড়ল। পুরনো বিয়ের নিয়ম-কানুন সে মানে না, এর সঙ্গে তার আশনাই হয়েছে, তাই একেবারে বিয়ে করে, শাখা সিঁদুর পরিয়ে এনে হাজির করেছে। জুতাপেটা করে তাড়াতে যাচ্ছিলাম, তা গিন্নি আড় হয়ে পড়লেন। মায়েরা তো সব ক্ষমার অবতার। আর মায়ের প্রয়েই যত কুলাঙ্গার তৈরি হয়। কী বলে?
বিষ্ণুপদ সামনের দিকে চেয়েছিল। বুকটা বড় হু-হু করছে। তার বড় ভরসা ছিল, রামজীবন উল্টে কিছু করবে না। সেদিন দায়ের কোপ খেয়েও যেমন ঠাণ্ডা হয়ে রইল, রাগ দেখাল না, তাতেই মনে হয়েছিল, রেমোর বোধহয় একটা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সে যে ঠাণ্ডা মাথায় অন্য হিসেব কষেছিল, তা কি বিষ্ণুপদ জানত।
কী ভাবছো হে বিষ্ণুপদ? সংসারের কথা হলে, ও আর ভেবো না। ঘটিবাটি বেচে হলেও অন্য কোথাও গিয়ে থাকে। আমিও তাই ঠিক করেছি। হুগলিতে আমার মেজো ভাই আছে, সেখানে জমির একটু বন্দোবস্ত হয়েছে।
বিষ্ণুপদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, আমি বড় নিষ্কর্মা।
বলেই বুঝল, কথাটার কোনও মানে হল না। তাই ফের বলল, তুমি হলে করিষ্কর্মা লোক। আমার মতে হাবাগোবা নও।
দেখ বিষ্ণুপদ, বহু বছর তোমাকে দেখছি। এই গায়ে উদ্বাস্তু পত্তনের সময় থেকে সুখে দুঃখে একসঙ্গেই আছি। তোমাকে কি কিছু কম চিনি? সাতে-পাঁচে থাকো না, সে ঠিক কথা। কিন্তু তা বলে বসে বসে এইসব দেখবে নাকি?
কোথায় পালাবো বলো? আমার যে যাওয়ার জায়গা নেই। ওইটেই তো ভুল করেছে। একটা যাওয়ার জায়গা করে রাখতে হয়।
বিষ্ণুপদ চোখ বুজে খুব বুক ভরে গভীর শ্বস টানল। মাথার চক্করটা টের পাচ্ছে সে। পুলিন আরও কিছুক্ষণ বকবক করল বসে। সে সব কথা তার কানেই ঢুকল না। তারপর পুলিন উঠে গেল বামাচরণের ঘরে। ব্যাভেজ বাঁধবে, টেডড্যাক ইনজেকশন দেবে।
কিছুক্ষণ বাদে শ্যামলী হঠাৎ দরজা খুলে বেরিয়ে এসে নাটকীয় ভাবে চেঁচিয়ে বলল, আপনারা পুলিশে খবর দিন, পুলিশে খবর দিন। তারাই এসে দেখুক, এ বাড়িতে রোজ কী হচ্ছে।
পুলিন ডাক্তার ভিতর থেকেই বলে উঠল, চেঁচিও না বউমা, এ রুগীর ঘর। মাথা ঠাণ্ডা রাখো।
বিষ্ণুপদর কাছে সামনের সব দৃশ্যই কেমন যেন কাচের ওপারের দৃশ্যের মতো হয়ে গেছে। যেন এসব অন্য এক জগতের ছবি। সব মিথ্যে, সব মায়া।
বাড়িটা নিস্তব্ধ হল প্রায় রাত বারোটা নাগাদ। সকলেই শুতে গেল। বিষ্ণুপদও। শুয়ে নয়নতারা বলল, হ্যাঁ গো, কৃষ্ণর কত বড় বাড়ি?
বড়ই। তবে জায়গা-বাসা বিশেষ নেই। কেন বলো তো!
আমরা গিয়ে যদি থাকি তো জায়গা হবে?
বলো কি, সেখানে গিয়ে থাকবে!
কেন, ফেলে দেবে নাকি?
বিষ্ণুপদ একটু হাসল, তা হয়তো ফেলবে না। কৃষ্ণ তো রাখতেই চায়। কিন্তু আবার কিন্তুও তো আছে! বউমা।
তা একটু গালমন্দ করবে, অচ্ছেদ্দা অবহেলা করবে। তা করুক না। খুনোখুনি তো দেখতে হবে না।
শেষ বয়সটায় এই যে কষ্ট পাচ্ছে, এও হয়তো ভালই। পাপ কাটছে।
অত পাপ কি করেছি? তুমি কী বলো?
