অরিজিন্যালি গুজরাতি। তবে বাঙালি হয়ে গেছে। পছন্দ?
০৭৩. শ্যামলীকে শাসিয়ে গেল
যেদিন ছেলেগুলো এসে বামাচরণের বউ শ্যামলীকে শাসিয়ে গেল, সেদিনকার ঘটনা গড়িয়েছিল অনেক দূর। রাতে দুই ভাইয়ে প্রথমে তুমুল ঝগড়া। তারপর বেদম মারপিট। বামাচরণ একটা দা নিয়ে এসেছিল অবশেষে। মাতাল রামজীবন হয়তো সেদিনই মারা পড়ত। শ্যামলী প্ৰায় উড়ে এসে কোমর জড়িয়ে ধরে বামাকে আটকায়। তবু দায়ের ডগাটা লেগেছিল রামজীবনের কপালে। ধারের দা, কপালের চামড়া আড়াআড়ি ইঞ্জি তিনেক ফঁক হয়ে গলগল করে রক্ত গড়াতে লাগল। অনেকদিন ঠাণ্ডা মেরে ছিল বিষ্ণুপদ, মিইয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন নতুন আনা বিজলি বাতিতে ছানিওলা চোখেও এই রক্তপাত দেখতে পেল। দেখে শরীরে একটা এমন কাঁপুনি উঠেছিল যে, তখনই দম বন্ধ হয়ে মরার দাখিল। নয়নতারা দৌড়ে গিয়ে রামজীবনকে জাপটে ধরে হাউমাউ করে সেঁচাতে লাগল। সঙ্গে রাঙাও। সেই চিকারে পাড়াপড়শীরা দৌড়ে এল। বাড়ির মধ্যে তুমুল হই হট্টগোল। এদিকে বারান্দায় বিষ্ণুপদ ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছিল। কেউ লক্ষ করেনি তাকে। মূৰ্ছা কাকে বলে তা জানেই না বিষ্ণুপদ। সেদিন বোধ হয় কয়েক মিনিট তার মূৰ্ছাই হয়েছিল। আবার সেটা আপনা থেকেই কেটেও গেল। যখন চোখ চাইল তখন রামজীবন উঠে দাঁড়িয়েছে। কপালে একটা ন্যাড়া বাঁধা, পুলিন ডাক্তার এসেছে, নিতাই এসেছে। আরও মেলা ভিড়। বামাচরণকে ঘরে টেনে নিয়ে দোর দিয়েছে শ্যামলী।
উঠতে গিয়ে বিষ্ণুপদ দেখল, শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, মাথাটা চক্কর দিচ্ছে। কিন্তু এতো সুখের শরীর নয়। ইদানীং জরব হয়েছে বটে, কিন্তু একটা জীবন তো রোদে জলে, মাইল-মাইল হাঁটাপথে, মজুরের অধিক পরিশ্রমে শরীর পোক্ত হয়েছে। বিষ্ণুপদ তাই পারি না-পারি করেও সিঁড়ি ভেঙে উঠোনে নামল।
পুলিন ডাক্তার তার দিকে চেয়ে ঘেঁকিয়ে উঠল, এইসব দেখার জন্য বেঁচে আছো? মরতে পারে না। না পারো তো কাশী, গয়া কোথাও গিয়ে ভিক্ষে করে খাও গে, তবু পাপচক্ষে এসব দেখতে হবে না।
বিষ্ণুপদর গলাটা বড্ড ধরা ছিল। মাথাটা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, মরার আগে এ সব হল প্ৰায়শ্চিত্ত। বুঝলে? প্ৰায়শ্চিত্ত।
পুলিন কঠিন মুখ করে বলল, পরিষ্কার পুলিশ-কেস। সংসার আঁকড়ে আর পড়ে থেকো না হে বিষ্ণুপদ। বয়স হলে মানুষের যে কী জ্বালা, আজ হাড়ে হাড়ে টের পাই।
মাঝখানে দাঁড়ানো রামজীবন, তাকে ধরে তখনও কাঁধছে নয়নতারা। রাঙা নিজেদের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে বামাচরণের বাপান্ত করছে চেঁচিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় রামজীবন একেবারে চুপ। একবার শুধু বিষ্ণুপদর দিকে তাকিয়ে বলল, আমার কিছু হয়নি বাবা। সামান্য একটু রক্ত গেছে। ও কিছু নয়। আপনি গিয়ে শুয়ে থাকুন।
শোবো? হঠাৎ শোবো কেন? কতটা কেটেছে?
সামান্যই।
নিতাই মাতব্বর লোক। এ গায়ের গান্ধীবাবা। লোকের উপকার করে বেড়ায়। এম এল এ হওয়ার ইচ্ছেও আছে। ইদানীং কী সব রাজনীতির কারণে কিছুদিন গ্রামছাড়া হয়ে ছিল। আবার ফিরেছে।
নিতাই বলল, জ্যাঠা, আপনার অনুমতি থাকলে পুলিশ ডাকবো। আজ যা হল এরপর তার চেয়ে অনেক গুরুতর ব্যাপার ঘটতে পারে।
রামজীবন ঠাণ্ডা গলায় বলল, না, পুলিশ ডাকার দরকার নেই। বাড়ির কেচ্ছা বাড়ির মধ্যেই থাকা ভাল। ৩০৬
যেটা তোদের ইচ্ছে। তবে পুলিশ ডাকলে ঘটনার একটা লিগ্যাল রেকর্ড থাকত।
বোঝা যাচ্ছিল, রামজীবনের নেশাটা কেটে গেছে। দার্শনিকের মতো একটু হেসে সে বলল, আমার বাপ-মা এখনও বেঁচে আছে রে নিতাই। তাদের সামনে তাদের ছেলেকে ধরে নিয়ে যাবে—এটা কি হয়? ছেড়ে দে। যা হওয়ার হয়ে গেছে।
নিতাই মাথাটা নেড়ে বলল, ঠিক আছে। কিন্তু শ্যামলী বলছিল, কারা সেদিন এসে ওকে শাসিয়ে গেছে। কারা জানিস?
রামজীবন একটা শ্বাস ছেড়ে বলে, জানি। বটতলার কাশী আর বিশে।
কেন শাসিয়েছিল?
সে অনেক কথা। আজ থাক। পরে একসময় শুনিস।
এরপর রামজীবন পাড়াপড়শীদের উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে বলল, আজ আপনারা ফিরে যান। রাত হয়েছে। ঝগড়াকাজিয়া সব সংসারেই হয়ে থাকে।
মিনিট দেশেকের মধ্যেই বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল।
বিষ্ণুপদ বারান্দায় এসে বসল। শরীর জুতের নেই। রামজীবনকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে নয়নতারাও এল। পানের বাটাখানা নিয়ে বসল কাছেই। নিঃশব্দে একখানা পান বানিয়ে মুখে দিয়ে বসে রইল।
বিষ্ণুপদ আড়চোখে দেখল নয়নতারাকে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, সংসারে যখন এসব হয় তখন মৃত্যুভয় কেটে যায়, না? তখন মনে হয়, মরণ রে, তুহু মম শ্যামসমান।
নয়নতারার কান্নার একটা রেশ এখনও রয়েছে। হেঁচকি তুলতে গিয়ে সেটা প্রকাশ হল।
আর কেঁদো না। আজ অনেক কেঁদেছো।
মেয়ে হয়ে জন্মেছি, আর কাদবো না, তাই কি হয়? কাঁদতেই তো জন্মায় মেয়েরা।
সে তোমরা। আজকালকার মেয়েদের তা নয়।
আমি তো আর আজকালকার নই।
দেখে শেখো।
আর শেখা! কত শিখছি গো।
কথা আর এগোয় না। দুজনে বসে থাকে। রাত বাড়ে। মশা কামড়ায়।
অনেকক্ষণ বাদে বিষ্ণুপদ বলল, রেমোটা কিরকম ধারা হয়ে গেল, দেখেছে? কেমন ঠাণ্ডা মেরে গেল।
নয়নতারা বলল, দেখেছি। রেমা তো ছেলে খারাপ নয়। মদ খেলেই যা একটু তড়পায়।
বন্ধুগুলো খারাপ। মেজো বউকে ওরকম অপমান করে গেল সেদিন, কাজটা উচিত হয়নি।
তা বলে ভাইকে কাটতে যাবে?
একটু আস্তে বলো। রাত হয়েছে, শুনতে পাবে।
পাক গে। বলে নয়নতারা আবার পান খায়।
বিষ্ণুপদ চুপ করে থাকে। একটা হাই তুলে বলে, আজ শরীরটা বড় খারাপ লাগছে। শুয়ে পড়ি?
