অনেক দেখেছি।
আমরাও দেখেছি। দোকান থেকে খাবার আনার সময় প্রায়ই ছো। মেরে নিয়ে যেত। আজকাল আর দেখতে পান?
না।
তার মানে, কাছাকাছি চিল বসতে পারে এমন যে-সব গাছপালা ছিল সব লোপাট হয়ে গেছে। পাখি কমছে, জীবজন্তু কমছে। বাড়ছে শুধু ঘরবাড়ি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল হেমাঙ্গ। কৃষ্ণজীবন খুব বলিয়ে কইয়ে মানুষ নয়। নিজের বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়ে কথা বলতে পারেই না।
হেমাঙ্গ বলল, কোথায় যেন গিয়েছিলেন আপনি?
আমস্টারডাম। বলে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে হঠাৎ কৃষ্ণজীবন বলল, ওরা আমাদের একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। একটা অয়েল ট্যাঙ্কার ক্যাপসাইজ করে অনেকটা এলাকা জুড়ে সমুদ্র বিষিয়ে গেছে। মাছ মরছে, পাখি মরছে। সেইসব দেখাল ঘুরিয়ে।
হ্যাঁ। আমরা টেলিভিশনেও দেখতে পাই।
কী অপচয় বলুন তো! অত তেল নষ্ট হল, সমুদ্রের কত প্রাণী মারা গেল।
তা তো ঠিকই।
আমার মনে হয় কি জানেন? আজকাল প্রায়ই অয়েল ট্যাঙ্কার লিক করে যে তেল পড়ে যাচ্ছে এর জন্য ওয়ার ফুটিংএ একটা ব্যবস্থা করা উচিত। এমন যন্ত্র তৈরি করা দরকার যা দিয়ে জল থেকে তেল ফের তুলে নেওয়া যাবে। কাজটা খুব শক্ত হওয়ার কথা নয়। কারণ, তেল জিনিসটা জলে ভাসে। এটা সম্ভব হলে তেলটাও বাঁচে, সমুদ্রটাও বাঁচে।
ঠিকই বলেছেন।
কিন্তু এইসব জরুরি যন্ত্র তৈরি হচ্ছে না। হচ্ছে অকাজের জিনিস। তাই না? ট্যাঙ্কারগুলোও যে কোন স্ট্যান্ডার্ডে তৈরি হয় কে জানে। আপনারা এটাকে বিজ্ঞানের যুগ বলে চিহ্নিত করেন, কিন্তু এসব দেখে মনে হয় মানুষ বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করছে না।
হেমাঙ্গ এই তদগত লোকটার দিকে চেয়েছিল। বেশ আছে কৃষ্ণজীবন। বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্করহিত, ভাবনার ড়ুবজলে এর দিন কাটে। বেশ আছে কৃষ্ণজীবন। এর জীবনে একটা দুরন্ত ভালবাসা আছে। সে ভালবাসা পৃথিবীর প্রতি।
নিঃশব্দে কৃষ্ণজীবনের ডান পাশে এসে বসল অনু।
হেমাঙ্গর কেমন যেন মনে হল, আর বসে থাকার মানে হয় না। এদের দুজনকে আগেও দেখেছে হেমাঙ্গ। অসম বয়সী এই দুটি নারী ও পুরুষ—এদের একজনের চোখে ভক্তি ও শ্রদ্ধার সম্মোহিত দৃষ্টি, অন্য জনের চোখে অনুকম্পা মেশানো প্রশ্রয়। এখানে হেমাঙ্গ বহিরাগত। মানুষে মানুষে সম্পর্কের যে কতরকম কম্বিনেশন হয়, কত জটিল, সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তার কোনও শেষ নেই।
এক নির্জন কোণে একা বসে ছিল চয়ন।
এই যে, কেমন আছেন?
চয়ন তটস্থ হয়ে বলে, ভাল।
বসতে পারি?
আরে কী যে বলেন। বসুন না।
হেমাঙ্গ বসল এবং হাসতে লাগল। বলল, আপনার কথা যতবার মনে হয় ততবার হাসি পায়।
চয়ন কাচুমাচু হয়ে রইল। প্রশ্ন করল না।
সেদিন এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময়ে আপনার কথাগুলো নিয়ে আমি আজও ভাবি আর আপনমনে হাসি।
চয়ন ক্ষীণ একটু স্মিতভাব মুখে ফুটিয়ে তুলে বলে, আমি খুব গুছিয়ে কথা বলতে জানি না। আপনার কোনও অসম্মান করিনি তো!
আরে না মশাই, না। আপনি আমাকে নিজেকে বুঝতে সাহায্যই করেছেন। অনেক সময়ে নিজের আবেগগুলোকে ঠিক চেনা যায় না কিনা!
যে আজ্ঞে।
প্রেম-ট্রেম করেছেন কখনও?
চয়ন একটু সচকিত হয়ে বলে, আজ্ঞে না।
কখনও পড়েননি?
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, না। আমার জীবন ঠিক আর পাঁচজনের মতো নয়।
আপনি গরিব আর এপিলেপটিক বলে?
চয়ন নিবে গিয়ে বলে, আমি ওসব ভাবতেই পারি না। সবসময়ে আমার অস্তিত্বের সংকট।
হেমাঙ্গ তার দিকে চেয়ে থেকে বলল, আপনার কোনও সংকট নেই।
আজ্ঞে, আপনি আমার সব খবর তো জানেন না।
কিছুটা জানি। বাকিটা অনুমান করে নিতে পারি। আপনি একটা কমপ্লেক্সে ভুগছেন। নিজেকে নিয়েই আপনার বেশি ভাবনা। ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স নয় তো!
চয়ন মৃদু হাসে, যে ইনফিরিয়র সে নিজেকে ইনফিরিয়র ভাবলে তা আর কমপ্লেক্স থাকে না।
কথা তো বেশ জানেন দেখছি। আমি বলি কি, আপনি কয়েক দিনের জন্য আমার বাড়িতে চলে আসুন। স্পেয়ার রুম, একস্ট্রা বেড় সব আছে। কয়েক দিন আপনার সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যাক। আপনার প্রবলেমগুলো সলভ করা যায় কি না দেখব।
চয়ন করুণ হেসে বলে, যে আজ্ঞে।
বিশাল হলঘরের অন্য প্রান্তে মহিলামহল বসে গেছে। সেখান থেকে একবার হেমাঙ্গর উদ্দেশ্যে হাত নাড়ল চারুশীলা। হেমাঙ্গও হাতটা তুলল।
হঠাৎ চয়ন বলল, আপনার জন্য আজ একটা নতুন রান্না হচ্ছে। হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলল, আমার জন্য?
যে আজ্ঞে।
কি রান্না হচ্ছে?
তা জানি না। শুনেছি আপনাকে সারপ্রাইজ দেওয়া হবে।
নাঃ, তা হলে তো সারপ্রাইজটা থাকল না।
তা হয়ত থাকল না। কিন্তু কে জানে?
তার মানেটা কী হল?
চয়ন একটু লজ্জা পেয়ে বলল, না, মানে কিছু নেই। শুনলাম আপনার জন্য একটা স্পেশাল মেনু হচ্ছে।
হেমাঙ্গ একটু চুপ করে রইল। কিছু বলল না। বুঝলও না।
বুঝল আর ঘণ্টাখানেক বাদে। খাওয়ার সময়। সর্ষে শাক দিয়ে একটা দারুণ মুখরোচক তরকারি। এত সুন্দর জিনিস কখনও খায়নি হেমাঙ্গ।
কে রাঁধল রে?
তাকে লুকিয়ে রেখেছি।
তার মানে?
মুখ টিপে হেসে চারুশীলা বলল, এই, ডাক তো অঞ্জলিকে।
অঞ্জলি এসে খাওয়ার ঘরে দাঁড়াল। মুখে এক রাশ লজ্জা। ছিপছিপে, লম্বা, ফর্সা, চাবুকের মতো চেহারার এই তরুণীকে আগে কখনও দেখেনি হেমাঙ্গ। মুখখানাও ভারি সুন্দর।
হেমাঙ্গ চাপা গলায় বলে, কে রে?
এ পাড়ায় নতুন এসেছে। ওরা পাক্কা নিরামিষাশী। সেই জন্য আমাদের সঙ্গে খেতে বসেনি।
ওঃ।
দেখতে সুন্দর নয়?
হ্যাঁ। রাঁধেও ভাল।
