না, ঠিক তা হল না। কিন্তু ভাল লাগল। সেই মৃদু ভাললাগা যেন আফটার শেভ লোশনের মৃদু গন্ধের মতো লেগে রইল অনেকক্ষণ তার মনে।
আজকাল চারুশীলা ফোন করে না। একটু রাগ করেছে। করতেই পারে। চারুশীলা খুব চেয়েছিল, বিয়েটা হোক। চেষ্টাও করেছিল যথাসাধ্য। অপমানটা ভুলতে পারছে না।
রশ্মির ফোন আসার দুদিন বাদে সে চারুশীলাকে ফোন করল এক রাত্রে।
কেমন আছিস চারুন্দি?
এই একরকম। তোর কি খবর?
আমারও ওই একরকম। রেগে আছিস নাকি?
রাগিব। কেন?
আজকাল খোঁজ নিচ্ছিস না।
শুনতে পাচ্ছি তুই নাকি ভীষণ ব্যস্ত। দিল্লি-বোম্বাই করে বেড়াচ্ছিস।
तालु छिब्लभ।
রশ্মির কোনও খবর পেয়েছিস?
দুদিন আগে ফোন করেছিল।
কী বলে?
ভাল আছে। ওটা তো ওর দেশ, জন্মভূমি।
আমাকেও ফোন করেছিল।
তাই নাকি? কী বলছে তোকে?
ভুঃ। তোর কথাও হল। তোকে মিস করছে।
কী যে কারলি তুই-ই জানিস।
প্রসঙ্গটা ভুলতে পারছিস না কেন?
ভুলব? রশ্মিকে কি ভোলা যায়?
রশ্মিকে ভুলবি কেন? কী বোকা তুই! বিয়ের প্রসঙ্গটার কথা বলছি। ওটা তো এখন ইতিহাস।
ইতিহাস ভুলতে হয় বুঝি?
ভুলে যা চারুদি। প্লিজ! ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন।
এখন ভগবানকে টেনে এনে নিজের দোষ ঢাকছিস? বেশ ছেলে!
আচ্ছা চারুদি, তুই কেন আমার জীবনটায় অশান্তি ঢোকাতে চাস বল তো! আমার বহুকালের একটা মাত্র শখ, সেটা হল একা থাকা। অনেক কষ্টে বাবা-মাকে বুঝিয়ে বিডন স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে এখানে এসে দিব্যি ছিলাম। তোরা তার মধ্যে একগাদা জটিলতা এনে ফেললি।
রশ্মিকে কি আমি এনেছিলাম ধরে?
আমিও আনিনি, রশ্মি একটা আকস্মিকতা, আমরা বন্ধুর মতোই তো ছিলাম। বিয়ের আইডিয়াটা তোর মাথায় খেলেছিল বোধ হয়।
সেটা তোর ভালর জন্যই। পরে পস্তাবি।
প্রসঙ্গটা থাক চারুদি। অনেক দিন আমাকে নেমন্তনু খাওয়াসনি। একদিন খাওয়াবি।
যেদিন খুশি চলে আয়।
সুব্রতদা বাইরে চলে যায়নি তো?
না। এখন কিছুদিন থাকবে। ইউ পি-তে একটা বড় প্রোজেক্টের কাজ পেয়েছে। এখন তার বেস ওয়ার্ক চলছে।
কলকাতায় আছে তো?
আছে। কালকেই আয়।
সন্ধের পর যাব।
চারুশীলা খুশি হল। বলল, তোর মস্ত সাপোর্টার হল তোর সুব্রতদা। কেন রে?
আমি লোকটা যে ভাল।
ছাই ভাল। ও কেবল বলে, হেমাঙ্গ ইজ এ গুড ডিসিশন মেকার। আমি শুনে হেসে বাঁচি না। শালুক চিনেছে গোপালঠাকুর।
সুব্রতদা ইজ এ ওয়াইজ ম্যান।
দুজনে দুজনের পিঠ চুলকে গেলেই তো হবে না। তোরা দুজনেই চূড়ান্ত ইমপ্র্যাক্টিক্যাল।
কাল যাচ্ছি তা হলে।
ফোন ছেড়ে দিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল হেমাঙ্গ। আজকাল টি ভি বা ভি সি আর ছাড়তে ইচ্ছে হয় না। গান শুনতে ইচ্ছে হয় না। বই পড়তে ইচ্ছে হয় না। শুধু চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে। বসে বসে যে কিছু একটা ভাবে তাও নয়। এলোমেলো নানা চিন্তা উড়ে যায় মাথার ভিতর দিয়ে ছেড়া মেঘের মতো।
তাকে কি আলসেমিতে ধরেছে?
পরদিন সন্ধের পর হেমাঙ্গ গাড়ি চালিয়ে হাজির হয়ে গেল চারুশীলার বাড়িতে। নানা সুখাদ্য রান্নার গন্ধ পেল বাতাসে। দেখল, তাকে উপলক্ষ করে আরও কয়েক জনকে নিমন্ত্রণ করে এনেছে। তার একটা ঘনিষ্ঠমহল আছে। অবশ্যম্ভাবী তাতে থাকবেই কৃষ্ণজীবন সন্ত্রীক, থাকবে অনু আর ঝুমকিরা, ইদানীং থাকছে চয়নও। তারাই আছে। না, ঝুমকি নেই, অনু আছে।
এত লোকের ভিড় আজকাল ভাল লাগে না হেমাঙ্গর। কথা বলতে ক্লান্ত লাগে।
তাকে দেখে অনুই প্রথম লাফিয়ে উঠল, হ্যাল্লো!
হেমাঙ্গ মৃদু হেসে বলল, হ্যাল্লো। আরে! তুমি যে বেশ বড় হয়ে গেছ!
ছাই হয়েছি। একদম লম্বা হচ্ছি না যে!
তুমি কত?
পাঁচ ফুটের একটু বেশি।
তা হলে খুব লম্বা হবে। এটাই তো বাড়ের বয়সী।
অনু মাথা নেড়ে বলে, কোনও চান্স নেই। ষোলোতেও মাত্র এতটুকু হাইটি! ষোলোর পর কি আর মেয়েরা লম্বা হয়?
তা বলতে পারব না। তবে শুনেছি আঠারো পর্যন্ত সবাই বাড়তে থাকে।
উঃ, তা হলে বেঁচে যাই। পাঁচ চার বা পাঁচ হলে মোটামুটি চলে যাবে। পাঁচ সাত বা আট হলে তো কথাই নেই।
তুমি বুঝি খুব হাইট ভালবাস?
কে না বাসে বলুন, আপনি কিন্তু বেশ লম্বা। কত বলুন তো!
পাঁচ এগারো।
ওঃ, সুপার্ব!
একটু ইতস্তত করে হেমাঙ্গ জিজ্ঞেস করল, ঝুমকি আসেনি বুঝি?
দিদির জ্বর হয়েছিল। উইক।,
চাকরি পেয়েছে?
না তো!
একটু গভীর বিষণ্ণ মুখে কৃষ্ণজীবন বসেছিল এক ধারে। হেমাঙ্গকে দেখে একটু হাসল।
হেমাঙ্গ পাশের সোফাটায় বসে বলল, কেমন আছেন?
কৃষ্ণজীবন বিনীতভাবে বলল, ভালই। আপনার কি খবর?
ভাল।
দাড়ি রাখলেন বুঝি?
ঠিক রাখা নয়। রোজ শেভ করতে ইচ্ছে হয় না।
দাড়ির একটা প্লাস পয়েন্ট আছে। র্যাডিয়েশন থেকে বাঁচায়।
তাই নাকি? আমি অবশ্য সেটা ভেবে রাখিনি।
শুনলাম কোথায় এক গ্রামে নদীর ধারে একটা বাড়ি কিনেছেন!
কে বলল?
চারুশীলা বলছিলেন।
হ্যাঁ।
বেশ করেছেন। শহরের মানুষেরা আজকাল একটু দূরে কোথাও ফার্ম হাউস বা খামারবাড়ি করছে। উইক এন্ডে চলে যায়। একটু বিশুদ্ধ বাতাসে দম নিয়ে আসে।
কাজটা তা হলে ঠিকই করেছি। বলছেন? সবাই তো আমাকে পাগল বলছে।
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলল, মোটেই নয়। আমার তো মনে হয়, শহরের বাইরে একটা শেলটার করে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আপনি খুব শহর-বিরোধী, তাই না?
জীবন ম্লান হেসে বলে, তাও ঠিক নয়। শহর তৈরি করতে হলে তাতে লোকবসতির সঙ্গে সমানুপাতে প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল। মানুষের অস্তিত্বের জন্যই দরকার ছিল। ছেলেবেলার কলকাতার আকাশে চিল দেখেছেন?
