বাড়ি কি খেলনা?
একটু সিরিয়াস খেলনা। একটু দামী। এই যা।
তোমার ফিলজফির জ্বালায় কি আমি পাগল হয়ে যাবো?
মণীশ নড়েচড়ে বসে বলল, আচ্ছা, ভেবে দেখি আর একটু। এক কাপ চা করে আনো। ততক্ষণ ভেবে ফেলি।
থাক, তোমাকে আর ভাবতে হবে না।
অপর্ণা চা করে এনে দেখে, মণীশ জানালার ধারে চেয়ারে এলিয়ে বসে আছে। মুখচোখ ভাল নয়। দুর্বল। একটু জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে।
কী হল তোমার?
মণীশ অবাক হওয়ার ভান করে বলে, কী হবে? তোমার যে রজ্জুতে সর্পভ্রম হচ্ছে।
শরীর খারাপ নয় তো?
না। শরীর ঠিক আছে।
শোনো। হার্ট এইলমেন্টে মনেরও একটা ভূমিকা আছে। তুমি আবার আগের মতো একটু ফুর্তিবাজ হয়ে ওঠে তো!
মণীশ চায়ে চুমুক দিয়ে ভ্রূ কুঁচকে কী ভেবে নিয়ে বলে, অপু, তুমি বরং ঝুমকির বিয়ের চেষ্টা করো।
হঠাৎ একথা কেন?
বিয়েটা দিয়ে যাই।
দিয়ে যাই কথাটার অর্থ জানো?
জানি। জেনেই বলছি।
হ্যাঁ গো, তোমার তবে সত্যিই শরীর ভাল নেই। ডাক্তার ডাকবো?
না। এখনও ডাক্তারের দরকার নেই। কিন্তু যা বলছি শোনো।
কী শুনবো?
ঝুমকির বিয়েটা এবার দেওয়া দরকার।
মেয়ে কি আমার কথা শুনবে? তুমি বুঝিয়ে বলো।
একটু খোঁজ নাও। হতে পারে, শী ইজ ইন লাভ উইথ সামওয়ান। কিন্তু হয়তো প্রেমটা একতরফা। একটু খোঁজ নাও।
কার কাছে খোঁজ নেবো? ও মেয়েকে কেটে ফেললেও একটা কথা বের করা যাবে না।
মণীশ চুপ করে রইল। অনেকক্ষণ বাদে বলল, তা হলে বাড়িটাই হোক।
০৭২. রশ্মি চলে যাওয়ার দিন
রশ্মি চলে যাওয়ার দিন চারেক পর ফের গায়ের কুটিরে ফিরে গেল বটে। হেমাঙ্গ। কিন্তু বেশি দিন থাকা হল না। তার পার্টনাররা তাগাদা দিচ্ছে, কাজকর্মে মন দাও। বিস্তর কাজ পেন্ডিং।
অস্বাভাবিকতাটা হেমাঙ্গও বুঝতে পারছে। সে যদি কাজ না-ই করে তা হলে ফার্ম থেকে তার শেয়ার তুলে নিয়ে বেকার হয়ে যেতে হবে। তার চেয়েও বড় কথা, নিজের কেসগুলি যদি সে না করে তা হলে ক্লায়েন্টরা অন্য ফার্মের কাছে চলে যাবে। তাতে বিস্তর ক্ষতি। শুধু তার নয়, পার্টনারদেরও।
সুতরাং হেমাঙ্গ তার কুটির ছেড়ে কলকাতায় ফিরল। দাড়িটা কাটল না। রয়ে গেল। কলকাতায় ফিরেই আকণ্ঠ কাজে ড়ুবে গেল সে। তার ফাঁকে ফাঁকেই ক্লায়েন্টের ডাকে যেতে হল বোম্বাই, মাদ্রাজ, বাঙ্গালোর, কানপুর। গায়ে থেকে থেকে একটা জড়তা আসছিল শরীর আর মনে। কাজের জাতাকলে পড়ে সেটা কেটে গেল।
দীর্ঘদিন আলস্যজড়িত সময় কাটানোর পর হঠাৎ এত কাজের চাপে প্রথমটা হাঁফ ধরে যাচ্ছিল হেমাঙ্গর। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে সয়ে গেল। রশ্মির ফাঁকা জায়গাটা কি কাজ দিয়েই ভরাট করে নেওয়া যাবে!–
প্রায় দুমাস বাদে এক রাতে রশ্মির টেলিফোন এল লন্ডন থেকে।
কোথায় থাকো বলো তো! অন্তত তিনবার ফোন করেছি। গত দু মাসে। ফের কি গাঁয়ে ফিরে গেছ নাকি?
না রশ্মি। অনেক দিনের কাজকর্ম জমে ছিল, বাইরে যেতে হল। কয়েকবার। কেমন আছ?
খুব ভাল। প্রথমটায় এসে এক বান্ধবীর কাছে ছিলাম কয়েকদিন। তারপর কাউনসিলের ফ্ল্যাটে। এক সপ্তাহ হল গ্রিনফোর্ডে একটা বাড়ি কিনেছি।
বাড়ি কিনেছ?
ছোট সুন্দর বাড়ি। বেশ অনেকটা জায়গা আছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে অগোছালো হয়ে দিব্যি আছি। এবার এখানে ভীষণ ঠাণ্ডা। তুমি কেমন আছ?
এই একরকম। একটু ফাঁকা লাগছে। তুমি নেই।
রশ্মি হাসল, বোকা। আমি তো হাতের নাগালেই। কলকাতা থেকে কেউ কেউ আজকাল উইক-এন্ডেও লন্ডনে আসে, তা জানো?
সে যারা পারে তারা যায়।
সামারে চলে এসো না! ওই সময়ে আমার মাও আসবে আমার কাছে। ইউরোপে একটা ট্রিপ দিয়ে আসব। আর শোনো, আমরা কিন্তু এখন অ্যাডাল্ট। কথাটা মনে রেখো।
একটু বিষণ্ণ হাসল হেমাঙ্গ। রশ্মি তাকে ডাকছে। সে গিয়ে রশ্মির সঙ্গেই থাকবে? তার সঙ্গেই ইউরোপ ঘুরবে? না, সেটা পেরে উঠবে না হেমাঙ্গ।
মুখে সে বলল, আচ্ছা, দেখা যাবে। গাড়ি কিনেছ?
হ্যাঁ। একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মার্সিডিস। দাড়িটা কি কেটে ফেলেছ?
না। আছে।
তা হলে কেটো না। দাড়িতে তোমাকে বেশ রোমান্টিক দেখাচ্ছিল।
তোমার নিশ্চয়ই লন্ডনে গিয়ে ভাল লাগছে?
দারুণ। তুমিতো জানোই এটাই আমার দেশ। এখানে আমি যত নিশ্চিন্ত বোধ করি ততটা আর কোথাও নয়। দিস ইজ মাই হোম। এখানেই জন্মেছিলাম, হয়তো এখানেই মরব।
জানি। তুমি এখানে একদমই স্বচ্ছন্দে ছিলে না।
না। আমার হাফ ধরে যেত।
বরফ পড়ছে?
আমি আসার পর একদিন পড়েছিল। সবুজ একটু মরে গেছে, কিন্তু তত্ত্ব লন্ডন এই সিজনেও কলকাতার চেয়ে অনেক বেশি গ্রিন।
কোনও অশান্তি নেই তো?
লন্ডনে বরাবর কিছু অশান্তি থাকেই। তবে এখনও তো লন্ডন পুলিশ আর্মস ক্যারি করে না। ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়। গ্রিনফোর্ড খুব পিসফুল এলাকা। সামারে আসবে? কথা দাও।
চেষ্টা করব।
তোমার সেই শপিং-এর নেশোটা এখনও আছে? নতুন কী কিনলে?
হেমাঙ্গ মৃদুস্বরে বলল, কিছু না। অনেক দিন কিছু কিনিনি। আজকাল খুব গেয়ো হয়ে গেছি।
তাই বুঝি? এটা তো খুব ভাল খবর।
রশ্মি, তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি মিস করছি?
জানো না বুঝি? বলে রশ্মি একটু শব্দ করে হাসল, তোমাকেই মিস করছি।
ওখানে তোমার এখন নিশ্চয়ই অনেক কাজ!
ওঃ ভীষণ। চাকরির পর বাড়ি এসে অনেক রাত অবধি পড়াশুনো করি। তার ওপর রান্নাটান্নাও করতে হচ্ছে! সময় একদম পাই না।
এইরকম আরও কিছুক্ষণ আলগা কথা হল। তারপর ফোন ছেড়ে দিল তারা। হেমাঙ্গ ভাবতে বসল, রশ্মির সঙ্গে কথা বলে তার কোনও ভাবান্তর হল কি? বুকে দামাল রক্ত ছুটিল কি পাগলা ঘোড়ার মতো? আলো হয়ে গেল কি অন্ধকার মন?
