দুজনে ধরাধরি করে যখন সিলিন্ডার বারান্দায় নিয়ে যাচ্ছিল তখন অপর্ণাও গেল সঙ্গে সঙ্গে। মণীশ সব পারে। ওকে বিশ্বাস নেই। হয়তো ঝুমকিকে ফাঁকি দিয়ে নিজেই আনবে টেনে জগদ্দল জিনিসটা। অপর্ণা আগেভাগেই গিয়ে সিলিন্ডারের হাতল চেপে ধরল।
একটু হাসল মণীশ। ভরা সিলিন্ডারটা তিনজনে মিলে তুলল বটে। কিন্তু ঝুমকি বা অপর্ণার গায়ে তেমন জোর নেই। কাৰ্যত মণীশই ওজনের সিংহভাগ বহন করল। সেটা টের পাচ্ছিল অপর্ণা, বলল, তুমি আমন ঝাঁকুনি দিলে কেন? …ওই দেখ, তুমিই তো দেখছি বেশি ভার নিচ্ছ… আহা, অত তাড়াতাড়ি কোরো না.
সামান্য কাজ, তবু কত অসামান্য হয়ে গেছে আজকাল। মণীশের হাঁফ ধরে গিয়েছিল রান্নাঘর অবধি আসতেই। কিন্তু জোর করে হাঁফধরা শ্বাস গোপন করল সে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক শ্বাস ছাড়ার চেষ্টা করতে করতে সিলিন্ডারটা লাগিয়ে দিল সে।
বাবা!
কী রে!
আমার কাছে এসে একটু বসবে?
কেন, তোর কী হয়েছে?
শরীরটা ভাল নেই। জুর।
দেখি। বলে নিজের গালটা মেয়ের কপালে ঠেকিয়ে বলল, টেম্পারেচার তো আছে দেখছি।
বাবা, তোমার বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে কেন?
কোথায়! না তো!
করছে কিন্তু বাবা।
সামান্য। ওটা কিছু নয়।
অপর্ণ গ্যাস জ্বালাতে ব্যস্ত ছিল বলে এই ডায়লগটা শুনতে পেল না। পেলে বিপদ ছিল।
ঝুমকির ঘরে ঢুকে চারদিকে চেয়ে মণীশ বলে, বাঃ, ঘরটা তো বেশ গুছিয়ে রাখিস তুই?
মা রোজ বকে, জানো? বলে আমি নাকি ভীষণ অগোছালো।
কই, আমার চোখে তো অগোছালো ঠেকছে না।
বোসো না বাবা, একটু গল্প করি।
তোর শরীর খারাপ, শুয়ে পড়। আমি বসছি।
শোবো না। এখন ঘাম হচ্ছে। একটু ভাল লাগছে। বাবা, তোমার অফিসে আমার একটা চাকরি কি কিছুতেই হয় না।
চাকরি করবি কেন? তোর কিসের অভাব?
অভাব! অভাব তো কিছু নেই। কিন্তু বসে থাকব। কেন?
তোর চাকরি করা উচিত নয়। যার চাকরির প্রয়োজন নেই সে যদি চাকরি করে তা হলে আর একজন নিডিকে সে বঞ্চিত করে।
আমার যে দরকার বাবা।
কিসের দরকার সেটা বলবি তো!
তোর মা তো চায় তোর বিয়ে দিতে।
বিয়ে? কক্ষনও না।
না কেন?
ওসব আমার ভাল লাগে না।
মণীশ একটু হাসল। চেয়ারে বসে দেওয়ালে একটা টিকটিকির কিছু কেরামতি দেখতে দেখতে বলল, ভাল। খুব ভাল।
কি ভাল?
স্বাধীন থাকার ইচ্ছাটা।
তুমি আমাকে সাপোর্ট করছ তো?
করছি। তোর বিয়ে হলে আমি অনেকটা একা হয়ে যাব। হার্ট দুর্বল, হয়তো আর একটা অ্যাটাকিও হয়ে যাবো। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে, বেশ ভাল। আবার অন্য দিক দিয়ে দেখতে গেলে মোটেই ভাল নয়।
ভাল নয় কেন বাবা?
এককথায় কি এর জবাব হয়? আমরা কেউ কোনও অবস্থাতেই স্বাধীন নই। স্বাধীনতা একটা রিলেটিভ ধারণামাত্র। এক ধরনের আই ওয়াশ। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মানেই চাকরির অধীনতা, সেখানেও হুকুম করার লোক আছে, বাধ্যবাধকতা আছে। পুরো স্বাধীনতা কোথাও নেই।
তবু বিয়ের চেয়ে অনেক সম্মানজনক!
তাই কি?
সিস্টেমের অধীনতা মানা যায়, কিন্তু বিশেষ একজন পুরুষের বাঁদী হয়ে থাকব কেন?
তোর মা কি আমার বাঁদী?
তোমাদের কথা আলাদা। তোমাদের মতো কপাল কটা আছে?
বিয়ে হলে দেখবি, তুইও তোর মায়ের মতোই। স্বাধীনতার ব্যাপারটা কেমন জানিস? দুধ ফেলে পিটুলিগোলা খাওয়ার মতো। যে সব মেয়েরা সব সময়ে স্বাধীনতা স্বাধীনতা করে তারা একটু সাইকিক কেস।
বাবা! তুমিও একথা বলছ?
মণীশ একটু ক্লান্ত হাসি হেসে বলে, ভালবাসার অভাব হলেই মানুষ একটা অলটারনেটিভ খোজে। স্বাধীনতা হল সেই জিনিস। স্বাধীনতা ব্যাপারটাই আমি বুঝতে পারি না।
সকাল থেকে দুপুর অবধি স্তিমিত রবিবারটা আবার একটু চাঙ্গা হল বুবকা আর অনু ফেরার পর। মুর্গি আর ফ্রায়েড রাইস দুটোই জমে গেল খুব।হইহই হল।
ক্লান্ত মণীশ দুপুরে বেশ কিছুক্ষণ ঘুমল। বুকে একটা অস্বস্তি তার আছেই। ব্যথা নয়, ধড়ফড়ানি নয়, শুধু মনে হয় কে যেন একটা আঙুলের ডগা তার বুকের বা ধারে ছুঁইয়ে রেখেছে। এই অস্বস্তিটা সে প্রায় সবসময় টের পায়।
ঘুম থেকে উঠে যখন ঘড়ি দেখল মণীশ তখন পৌনে চারটে। তার পাশেই ঘুমোচ্ছে অপর্ণা। ইদানীং একটু মোটা হয়েছে। চুলগুলো কিছু ফাকা। দু-একটা সাদার ঝিলিক।
মনটা খারাপ লাগল তার। বয়স হচ্ছে।
পত্রিকার পাতা নাড়াচাড়া করল আরও কিছুক্ষণ। আধাঘন্টা পর উঠল। অপর্ণা।
উঠেই বলল, এই তোমাকে আমন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে কেন?
ফ্যাকাসে? যাঃ, আমি তো ভাল আছি।
কিন্তু কেমন দেখাচ্ছে বলো তো! টায়ার্ড ফিল করছ?
না তো!
কতদিন চেক-আপ হয়নি! কাল চলো তো, চেক আপ করাবো।
মাসখানেক আগেই হয়েছে। অকারণ ভয় পেও না।
একটু চুপ করে থেকে অপর্ণা বলে, একটা কথা বলবো?
বলো।
আমি যে বাড়ির প্ল্যান জমা দিলাম তাতে তুমি খুশি হওনি?
মণীশ একটু অবাক হয়ে বলে, আলাদা করে খুশি হওয়ার মতো ঘটনা কি সেটা?
আমাদের বাড়ি হবে এটা ভাবতে তোমার ভাল লাগছে না?
বাড়ি! বলে মণীশ কিছুক্ষণ যেন ভোবল। তারপর বলল, বাড়ি।
তার মানে কি হল?
মণীশ একটু হাসে, বাড়ি তো ভাল জিনিস। নিজেদের বাড়ি।
ঠেস দিচ্ছ কেন?
মণীশ হঠাৎ খুব অন্যমনস্ক হয়ে গেল। শূন্য চোখে চেয়ে থেকে খুব ক্ষীণ কষ্ঠে বলল, কোথায় বাড়ি কে জানে?
ওটা আবার কেমন কথা?
ওটাই কথা অপু। বাড়ি যে কোথায় তা কি জানি! কে জানে সেই বাড়ির চেহারা কেমন?
ফের ওসব বলছ?
তোমার আনন্দ দেখে আমারও একরকম আনন্দ হচ্ছে। একটা খেলনা পেয়ে বাচ্চা যেমন ভুলে থাকে তুমিও তেমনি।
