আর আমি কাছে এলে ভাল লাগে না, না?
খুব লাগে মা। তুমিও থাকো। কিন্তু তোমাকে তো ডেকে পাই না। কত কাজ তোমার! একটু বসেই উঠে যাও।
আর তোর বাবা বুঝি সারা দিন বসে থাকে তোদের কাছে?
খুব হিংসুটি হয়েছো তো মা!
অপর্ণা ঠাট্টা করছিল না। তার দু চোখ ভরে জল আসছিল। তার তিনটে ছেলেমেয়েই কোন এক আশ্চর্য কাৰ্যকারণে মণীশের ভক্ত। বাবা ওদের প্রাণ। সেটা মোটেই অপর্ণার খারাপ লাগে না। হিংসেও হয় না। কিন্তু তার মাঝে মাঝেই মনে হয়, ওরা তাকে ততটা ভালবাসে না যতটা ভালবাসা উচিত ছিল।
মায়ের মুখ দেখে দুঃখে করুণ হয়ে গেল ঝুমকি, ও মা, তোমার চোখ ছলছল করছে কেন? আমি কী বলেছি বলো তো! শুধু তো বলেছি। বাবাকে একটু আমার কাছে এসে বসতে বলো। তাতে কি দোষ হল মা?
না, দোষ হবে কেন?
এ কথায় তো কিছু নেই মা।
সে আমি জানি আর ভগবান জানে। তোরা যে কেন আমাকে সহ্য করতে পারিস না।
ঝুমকি দুহাতে অপর্ণার কোমরটা জড়িয়ে ধরে বলল, মা গো, রাগ কোরো না, লক্ষ্মী মেয়ে।
রান্নাঘর থেকে কাজের মেয়েটা হঠাৎ চেঁচিয়ে বলে উঠল, ই মা! গ্যাস যে ফুরিয়ে গেল!
অপর্ণা তড়িৎগতিতে উঠে দাঁড়াল, কী হয়েছে রে?
তোমার গ্যাস নিবে গেছে।
ফ্যান পড়ে নেবেনি তো?
না গো, ফ্যান পড়বে কি? ওথিলায়নি তো এখনও।
ছোটখাটো দুশ্চিন্তাগুলোই কুরে খায় অপর্ণাকে। এই যে গ্যাস ফুরোলো এটা কোনও সমস্যাই হয়তো নয়। কিন্তু তার কাছে এখন এটাই মস্ত সমস্যা। ভরা সিলিন্ডার রয়েছে তিনটে ঘর পেরিয়ে সেই বারান্দায়। দুর্ঘটনার ভয়ে তারা বারান্দায় সিলিন্ডার রাখে। রান্নাঘর থেকে যেটা অনেকটাই দূর। এখন ওই ভারী সিলিন্ডার টেনে আনবে কে? আগে মণীশ আনত, ইদানীং বুবকা। কিন্তু মণীশের পক্ষে অসম্ভব, কোনও ভারী কাজ করা তার একদম বারণ, বুবকা বাড়ি নেই। কী হবে এখন?
দেখলি তো কপালটা আমার! এখন কী করি?
ঝুমকি বলল, ভাবছো কেন? বুবকা এসে যাবে। তুমি বসে থাকো।
পাগল! আধাসেদ্ধ ভাত ফেলে রাখলে নষ্ট হয়ে যাবে। কত দামী চাল!
তোমার যে কত প্রবলেম মা!
অপর্ণা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, সংসারটা তো আমাকেই চালাতে হয়। কিনা, তাই প্রবলেমগুলোও যে আমারই। যাই দেখি গে।
রান্নাঘরে এসে অপর্ণা সিলিন্ডার ঝাঁকিয়ে বুঝল, গ্যাসই ফুরিয়েছে বটে। এবং ভাত খুব বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এখনই আগুনে না বসালে নষ্ট হয়ে যাবে।
তোর যেমন বুদ্ধি! বাবা কত বড় অসুখ থেকে উঠেছে জানিস? যমের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
একটু উঁচুগ্রামেই কথা হয়ে থাকবে। মণীশ শোওয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রান্নাঘরের সামনে দাঁড়াল। চোখে চশমা, হাতে খবরের কাগজ।
কী হল বলো তো! এনি প্রবলেম?
আর বোলো না। গ্যাসটা ফস করে ফুরিয়ে গেল।
ওঃ, তাতে কি হল? এখনই লাগিয়ে দিচ্ছি।
তুমি? বলে একটা আর্ত চিৎকার করে ওঠে। অপর্ণা।
মণীশ যাওয়ার জন্য ঘুরেছিল খানিকটা, থমকে গিয়ে বলে, কী হল?
তুমি সিলিন্ডার টানতে যাচ্ছ?
বরাবর তো আমিই লাগিয়েছি।
অপর্ণা দুখানা বড় বড় চোখে তার দিকে চেয়ে বলল, সত্যিই তুমি বোধ হয় মানুষও খুন করতে পারো। ওই ভারী সিলিন্ডার টানলে তোমাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে? যাও, চুপচাপ ঘরে গিয়ে বসে থাকো। রান্নাঘরের প্রবলেম আমি সামলাব।
মণীশের খেয়ালই ছিল না যে, তার হার্টের অসুখ। এ কথায় হঠাৎ সে আনমনে বাঁ হাতটা তুলে নিজের বা পাজরে রাখল। তারপর বলল, আমি কি ততটা আনফিট?
অপর্ণা মেঘগর্জনের মতো বলল, ডাক্তারের বারণ, মনে থাকে যেন।
হার্ট অ্যাটাক হলে আর কি কোনওদিনই নর্মাল লাইফে ফিরে আসা যায় না। অপু? সামান্য একটা সিলিন্ডার লাগানো এমনকি শক্ত কাজ?
খবরদার বলছি। আর একটাও কথা নয়।
ঝুমকি ঘর থেকে উঠে এল। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে দু হাত দিয়ে একটু ভর রেখে বলল, না বাবা, তুমি এসব করবে না।
মণীশ একটু হেসে বলে, দেখ না একদিন এক্সপেরিমেন্ট করে। আমি শক্ত মালে তৈরি।
অপর্ণা চোখ পাকিয়ে বলে, তুমি কী দিয়ে তৈরি তা আমার জানা আছে। খুব বীরপুরুষ। কিন্তু বয়সটাও বসে নেই আর শরীরটাও লোহা দিয়ে তৈরি নয় এটা মনে রেখো।
ঝুমকি বলল, আচ্ছা মা, এক কাজ করলে হয় না? আমি আর বাবা ধরাধরি করে নিয়ে আসি না কেন?
অপর্ণ দৃঢ় গলায় বলে, না কখনও না। মেয়েদের ভারী জিনিস টানা একদম ভাল নয়।
বাঃ রে, আজকাল তো মেয়েরা ওয়েট লিফটিংও করে।
যে করে করুক। তোমাকে করতে হবে না।
মণীশ ঝুমকির মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, দ্যাটস এ গুড প্রোপোজাল। তবু তোমার যদি আপত্তি থাকে তবে তুমিও চলো হাত লাগাবে। তিনজনে মিলে আনলে সিলিন্ডার ব্যাটা খুব জব্দ হবে। চলো।
বাসমতী অত্যন্ত সুখী চাল। একটুতেই গলে যাবে বা আঠা হয়ে যেতে পারে। চালটা নতুনও বটে। বুবকার জন্য আর অপেক্ষা করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অগত্যা বেজার মুখে অপর্ণা বলল, তোমাকে ধরতে হবে না। আমি আর ঝুমকি বরং গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ে আসি।
মু মুদ্রাড় বলে, তাতে মেঝেতে দাগ পড়বে। সারা ফাঁকা সিলভারটা সরিয়ে নিয়ে যাই।
না না, তুমি না।
মণীশ কথাটা কানে তুলল না। সিলিন্ডারটা গিয়ে খুলে ফেলল। ঝুমকি গিয়ে ধরল তাড়াতাড়ি।
ছেড়ে দে। এটা হালকা, আমি পারব।
অপর্ণা ফের চেঁচাল, তুমি তো সবই পারো। আমার গলাটা টিপে ধরতে পারো না?
আরে বাবা, এটা সত্যিই হালকা।ধরেই দেখ না।
আমি জানি। বলে অপর্ণ ঝুমকির দিকে চেয়ে বলল, হ্যাঁ রে, বাপের গন্ধে উঠে এলি বুঝি? এখন বুঝি আর শরীর খারাপ লাগে না?
