মোটেই টান নেই।
আচ্ছা, তাই হল। অতি উত্তেজিত হয়ো না। নিমাইকে তা হলে খবর পাঠাতে হবে না তো! এখনও ভেবে দেখ।
না, কিছুতেই না।
তাড়াতাড়ি সেরে ওঠে বীণা। রিহার্সালের জন্য মন খারাপ কোরো না। বর্ষাকালে তো আর বায়না নেই। পালা নামতে দেরি আছে।
আমার তো আরও কাজ আছে।
সেসব আমি সামলে নেবো। ঘরটা বঁধালে বুঝি? ভাল কাজ করেছে।
কাকা চলে যাওয়ার পর বীণা খানিকক্ষণ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থেকে বলল, হ্যাঁ রে, কুসুম, তোরা কি আমাকে আর কাকাকে নিয়ে আড়ালে কিছু বলিস?
হঠাৎ ওকথা কেন?
সেদিন পাপিয়া হঠাৎ কেন আমাকে বলল, বীণাদি তুমি কাকাকে বিয়ে করো!
ওসব কথা, রাখো তো এখন।
বল না। কুসুম, কেন বলল?
কুসুম একটু হেসে বলে, ওই যে সুন্দরবনে কেরোকাঠি না কোথায় পালার পর কাকা তোমাকে হাত থেকে আংটি খুলে দিয়েছিল, সেই থেকে চাউর হয়েছে।
আংটি খুলে দিলে কী হয়?
আহা, আংটি দিয়েই তো শকুন্তলা আর দুষ্মন্তের বিয়ে হয়েছিল, মনে নেই!
বীণা হাঁ করে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজে বলে, ভগবান!
০৭১. অপর্ণার ইদানীংকালের জীবনে
অপর্ণার ইদানীংকালের জীবনে সবচেয়ে বড় ঘটনাটা ঘটল। পরশুদিন, শুক্রবার। একজন ঠাকুরমশাইকে ধরে পাঁজি সুপ্রিয় ভুকুই দিনটা স্থির করে রেখেছিল সে। সঠিক প্রশ্নটি অবধি বয়ে যেতে দেয়নি। করপোরেশনে সে বাড়ির প্ল্যান জমা দিয়ে এল।
কিন্তু এত বড় ঘটনাটা শুধু তার কাছেই বড়। বাড়ির আর কারও কাছে নয়। ছেলেমেয়েরা কেউ ব্যাপারটাকে পাত্তাই দিল না, এমন কি মণীশ পর্যন্ত নিরুত্তাপ। কিন্তু একটা আনন্দকে সবাই মিলে অনুভব না করলে কি হয়?
আনন্দটা অপর্ণার একার এবং নিজস্বই রয়ে গেল। সারা দিন নানা কাজের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ তার ভাবী বাড়িটার কথা মনে হয়। সুড়কি রংয়ের মিষ্টি একটা দোতলা। গেরুয়া বর্ডার থাকবে তাতে। চারদিকে গাছ-গাছালি থাকবে। দক্ষিণে
কিন্তু বাড়ি হওয়ার আগে কত কি করার থাকবে অপূর্ণার? ইট আসবে, সিমেন্ট আসবে, বালি আর পাথরকুঁচি আসবে। মাটি খুঁড়ে ভিত গাথা হবে। পিলার উঠবে। ধীরে ধীরে দেওয়াল, গাঁথনি, ছাদ ঢালাই। একটা শূন্য স্থানে স্বপ্নের মতো, ম্যাজিকের মতো তৈরি হবে একখানা বাড়ি। আর কেউ না হোক অপর্ণা প্রথম থেকেই সাক্ষী থাকবে ঘটনাটায়। সারা দিন সে ছাতা মাথায় দিয়ে বসে থাকবে একটি কোণে। কাজ দেখবে, পাহারা দেবে, কাজের ফাঁকি ধরবে। আর এইসব করতে করতে ওই বাড়ির প্রতিটি ইটে, কাঠে, খাজে, কোণে সঞ্চারিত হতে থাকবে তার মায়া আর ভালবাসা। একখানা বাড়ি এমনিতেই কিছুই নয়। কিন্তু অপর্ণার বাড়ির মধ্যে সে নিজেও মিশে থাকবে ইট কাঠ সিমেন্টের মধ্যে।,
আজ রবিবার। কিন্তু সব রবিবারই ঠিক রবিবারের মতো হয় না। আজকের রবিবারটা কেমন যেন গোমড়ামুখো, নীরব, নীরস আর ঘটনাহীন; ফি। রবিবারের মতোই আজও কিছু ভালমন্দ রান্না হচ্ছে। মুর্গির মাংস আর ফ্রায়েড রাইস। এসব আজকাল খুব সাবধানে রাঁধতে হয় অপর্ণাকে। মণীশের রিচ খাওয়া বারণ। অপর্ণা তাই মাংসটা রাধে অনেকটা স্টুএর মতো করে। ফ্রায়েড রাইস রাধে স্যালাড অয়েল দিয়ে। যাতে মণীশও খেতে পারে।
সকাল থেকে মণীশ আজ গোটা চারেক খবরের কাগজ নিয়ে বসেছে নিজের ঘরে। ব্রেকফাস্টের সময় রবিবার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হইহই করে। এমনই কপাল যে, আজ সেটাও ঘটেনি। বুবকা সকালে জগিং করে এসেই চলে গেল স্কুলের ফেট-এ। অনু গোল ওয়েস্টার্ন মিউজিকের ক্লাস করতে। ঝুমকি আছে বটে, কিন্তু না থাকার মতোই। টনসিল ফুলে কষ্ট পাচ্ছে খুব। অনেক বেলা অবধি শুয়ে ছিল। একটু আগে উঠেছে। চা খেয়ে আবার শুয়েছে, জ্বর জ্বর ভাব।
বাসমতী দেরাদুন চালের ভাতটা চড়িয়ে একটু হাঁফ ছাড়ল অপর্ণা। হোক। মাংস হয়ে গেছে। কাজের মেয়েটা স্যালাড কাটছে, খাওয়ার মুখে একটু ভাজাভুজি করে দিলেই হবে।
প্রথমেই মেয়ের ঘরে হানা দিল সে।
কী করছিস, এই মেয়ে?
ঝুমকি করুণ চোখ মেলে তাকাল, শুয়ে আছি, দেখছি তো!
কেমন লাগছে?
ভাল না। ঢোক গিলতে গলায় লাগছে।
কতবার করে বলি, বাইরে বেরনোর সময় গলাটা মাফলার দিয়ে জড়িয়ে নে! কখনও কথা শুনিস?
মাফলার গলায় দিয়ে বেরনো যায় বুঝি?
কেন যাবে না? রোগ হলে সব করতে হয়।
এ মা, মাফলার যে বিচ্ছিরি জিনিস।
অন্তত একটা স্কাফ তো গলায় বাধতে পারিস! যার টনসিালের অসুখ তার কি স্টাইল করলে চলে?
উঃ, আত জোরে কথা বোলো না তো মা। মাথা ধরেছে, জোরে শব্দ হলে মাথা দপদপ করে।
সকালে তো কিছু খেলি না। এখন একটু দুধ খা।
ইচ্ছে করছে না! একটু শুয়ে থাকতে দাও চুপ করে।
খুব রেগে যাচ্ছিল অপর্ণা। রাগটা সামাল দিল। মেয়ের কপালে হাত দিয়ে দেখল, একটু টেম্পারেচার আছে।
ডাক্তার ডাকব রে?
না মা, টনসিল তো আমার পুরনো বন্ধু। চিন্তা কিসের?
বন্ধু না শক্ৰ? ওরকম বন্ধুর সঙ্গে ভাব না রাখলেই হয়।
ডাক্তার ডেকো না মা! গুচ্ছের অ্যান্টিবায়োটিক গেলাবে। ওসব খেলে আমার আরও শরীর খারাপ হয়।
আচ্ছা, বাড়িতে একজন শুয়ে থাকলে কি ভাল লাগে, বল তো!
ইচ্ছে করে শুয়ে আছি নাকি?
একটু উঠে রোদে গিয়ে বোস না।
না মা, এই বেশ আছি। বাবাকে একটু আমার কাছে এসে বসতে বলো।
অপর্ণ স্থির চোখে মেয়ের দিকে চেয়ে বলে, আমি যে তোর কাছে বসে আছি সেটা বুঝি কিছু নয়? আমি কি তোদের কেউ নই?
ঝুমকি একটু হেসে মায়ের একখানা হাত ধরে বলল, কে বলে তুমি কেউ নাও? বাবা কাছে এলে ভাল লাগে, তাই
