ঠিকই বলেছো। আমার মতো মানুষের তো তোমার মতো বউ হওয়ার কথা ছিল না। এ তোমাকে বরং একটা প্ৰণাম করুক। শত হলেও তুমি সম্পর্কে বড়।
বউটিা ঢিপ করে একটা প্ৰণাম করেও ফেলল।
একটু পিছিয়ে গেল বীণাপাণি। বউটা। যখন উঠে দাঁড়াল, তখন ঘোমটা সরে গেছে। বীণাপাণি অবাক হয়ে দেখছিল, টুকটুকে ফর্সা ভরাট লক্ষ্মী প্রতিমার মতো একখানা মুখ। দুখানা বড় বড় চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে।
বীণাপাণি অবাক হয়েই বলে, এ তো ভীষণ সুন্দর! একে পেলে কোথায়?
চারশো বিশটা অমায়িক গলায় বলল, তুমি নিজে সুন্দর বলেই ওকে সুন্দর দেখছো।
তোমার কাছে সত্যি কথা শুনব না। এ তো জানিই। কিন্তু কাঁদছে। কেন?
ওকেই জিজ্ঞেস করো।
বীণাপাণি মেয়েটার দিকে চেয়ে রইল। মুখটা চেনা ঠেকছে কেন? খুব যেন চেনা!
ও মেয়ে, কাদছো কেন?
মেয়েটা বলল, আপনি আমাকে মাপ করুন।
গলার শব্দটাও যেন কোথাও শুনেছে বীণা! চেনা, অথচ ধরা যাচ্ছে না।
আমি মাপ করলুম, কিন্তু যার গলায় বুললে টের পাবে কেমন মানুষ!
বউটা আরও কেঁদে উঠে বলে, ও কথা বলবেন না। ওঁর মতো মানুষ হয় না। সাক্ষাৎ দেবতা।
বীণা ফুঁসে ওঠে, দেবতা! দেবতা! পুরুষকে দেবতা বানিয়ে বানিয়েই তো নিজেদের বারোটা বাজালে। ওরা দেবতা নয়, হনুমান। তুমি একটি হনুমানের গলায় মুক্তোর মালা। বুঝলে! কিন্তু হনুমান তো মুক্তোর মর্ম বুঝবে না, চিবিয়ে দেখবে, টানাহ্যাঁচড়া করবে, তারপর ছিঁড়ে ফেলে দেবে একদিন। অমন দেবতার মুখে আগুন।
আপনি কেন পুরুষদের ওপর এত রেগে আছেন দিদি?
দিদি! খবরদার আমাকে দিদি ডাকবে না। এমনি ডাকতে পারো, কিন্তু বড় সতীনকে ছোট সতীন যেমন দিদি ডাকে তেমন ভেবে নয়। বুঝলে? বরং বীণাদি ডাকবে। আচ্ছা, তোমাকে কোথায় দেখেছি, বলো তো?
আমাকে!
ভীষণ চেনা চেনা লাগছে। একেই বা জোটালে কী করে?
মেয়েটা জবাব দিল না, মুখ নিচু করে পায়ের নখে মাটি খুঁড়ছে।
খুব লাজুক বুঝি, তুমি?
মেয়েটা বিষণ্ণ মুখখানা তুলে বলে, লজ্জাই তো ললনার ভূষণ!
তাই বুঝি? তবে আমি তো একদম ভূষণহীণা। আমার একটুও হায়া লজ্জা নেই। কেন, ও বলেনি তোমাকে?
না, তেমন কিছু বলেনি।
ওর যে একটা বউ আছে বা ছিল সেটা বলেছে তো! নাকি সেটা চেপে রেখে বিয়ে করেছে তোমাকে?
সব বলেছেন। কিছু লুকোননি।
যাক, তা হলে একটু সৎ সাহস এখনও আছে। তবে ভাজা ভাজা করে ছাড়বে, দেখো।
নিমাই মিটি মিটি হাসছে। রাগটাগ, কিছু নেই মুখে।
আসল শয়তান করা হয় জানো? যাদের মাথা সবসময়ে ঠাণ্ডা, হাসি-হাসি মুখ, আর মনে জিলিপির প্যাঁচ। ওকে বাইরে থেকে দেখে, কেমন ভোলমানুষটি!
দিদি, পায়ে ধরি, ওঁকে নিয়ে ওরকম বলবেন না।
কেন বলব না?
শুনলেও যে আমার পাপ হবে।
আহা ন্যাকা, তোমার পাপ হতে যাবে কোন দুঃখে? শয়তানকে শয়তান বলাইতো ভাল।
উনি যে ভীষণ ভাল লোক।
ছাই ভাল; কতদিন ঘর করেছো?
বেশি দিন নয়। কিন্তু বোঝা যায়।
সজোরে মাথা নেড়ে বীণা বলে, কিছু বোঝা যায় না। আমারই বুঝতে কতদিন সময় লাগল। আচ্ছা, তোমার গলার স্বরটা কোথায় আগে শুনেছি বলো তো!
জানি না তো!
তোমাকে দেখেছি বলেও যে মনে হচ্ছে।
নিমাই হঠাৎ খুব হাসতে লাগল।
তুমি হঠাৎ হাসছে কেন?
চিনতে পারলে না?
না, কে ও?
ভাল করে দেখ।
দেখলাম তো!
তবু পারছে না!
না তো!
তোমার চোখ নেই। নইলে চিনতে দেরি হয়?
বলেই ফেল না।
এ তো বীণা ।
তার মানে?
বীণাপাণি। বিষ্ণুপদ বিশ্বাসের মেয়ে। গাঁ শীতলাতলা বিষ্টুপুর।
বীণা স্তম্ভিত হয়ে বলে, কী যা তা বলছো? মাথা খারাপ হল নাকি?
খুব হা হাঃ করে হেসে ওঠে নিমাই।.
বীণা চোখ মেলে চায়। কপাল ভেজা। বোধ হয় জলপট্টি দেওয়া হচ্ছে। ঘর একটু আবছা অন্ধকার। বিছানার পাশে দুজন লোক দাঁড়ানো।
কে?
আমি-আমি কাকা।
ও। কখন এলে?
একটু আগে। জুরটা কি করে বাঁধালে?
ডাক্তার বলছে টাইফয়েড। কী হবে বলো তো!
কিসের কী হবে? জুরজারি তো মানুষেরই হয়।
আমার যে রিহার্সাল চলছে।
কাকা আবার হাসল, প্ৰাণটা তো আগে। তারপর নাটক। কয়েকটা দিন রিহার্সাল বাদ দিলে কোনও ক্ষতি হবে না।
আমার ভীষণ খারাপ লাগছে।
নাটক-নাটক করে আমিই পাগল বলে সবাই জানে। তুমি তো দেখছি আমার চেয়েও আরও এক ডিগ্রি বেশি পাগল। এ পাশ থেকে কুসুম বলে উঠল, জুরের ঘোরে অনেক ডায়লগও ছাড়ছে।
তাই? বলে কাকা আবার হাসল।
আমন হেসো না তো। আমি জ্বলছি নিজের জ্বালায়।
তোমার আবার জ্বালা কিসের? ঝাড়া হাত-পা।
কাকা, তোমাকে একটা কথা বলব?
বলো না!
আমার একটা কাজ করে দেবে?
নিশ্চয়ই।
কাঁচড়াপাড়ায় কাউকে পাঠিয়ে একটা খোঁজ নেবে?
কার খোঁজ? নিমাইয়ের?
হ্যাঁ।
খবর দিতে হবে তো!
না না।
কাকা ফের হাসল। বলল, মেয়েদের তেজ বেশিক্ষণ থাকে না। তাই না? যেই জ্বর হল অমনি সব বঁধ ভেঙে গেল?
ভ্রূকুটি করে বীণা বলে, একটুও না। আমি মোটেই ওকে খবর দিতে বলিনি।
তবে কী বলছো?
আমি শুধু জানতে চাই-বলে বীণা থেমে গেল। কী জানতে চায় সে? কী জানতে চায়? নিমাই সত্যিই আবার বিয়ে করেছে কি না? করলেই কি? তার কি যায় আসে?
বীণা বলল, থাকগে।
আহা, লজ্জা পাচ্ছে কেন? বলেই ফেল না।
তুমি হাসছো? খুব মজা, না?
মজারই ব্যাপার। তবে আনন্দও হচ্ছে।
কিসের আনন্দ?
কাকা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে, নিমাই বড় ভাল লোক ছিল বীণা ।
হঠাৎ এ কথার মানে?
কি করে মানে বলি? মানেটানে জানি না। কথাটা হঠাৎ মনে এল। তোমার যে এখনও নিমাইয়ের ওপর টান আছে এটাতেই আমার আনন্দ।
