ভুল হয়েছে বীণাদি। মাপ করে দাও।
এ কথা ঠিক যে বীণা সত্যিই আর ঘরসংসারের কথা ভাবে না। নিমাইকে ছেড়েছে বলে যে আর একজন পুরুষের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে হবে এমনটাতেও সে বিশ্বাস করে না। কিন্তু আবার এ কথাও ঠিক যে, তার আজকাল এক এক সময়ে বড় ফাঁকা আর একা লাগে। মাঝে মাঝে অম্বলের ব্যথায় সে ঘুমোতে পারে না বলে রাতে জেগে শুয়ে শুয়ে বড় নিঝুম বোধ করে। মনে হয়, তার বুকের ভিতরেও যেন অন্ধকার, ঝিঁঝি ডাকছে, হা হা করে পাগলা বাতাস বয়ে যাচ্ছে।
বর্ষার শুরুতেই জ্বর হল বীণার। শুরুতেই একশো দুই। পরদিন জ্বর ঠেলে উঠল চারে। সঙ্গে কয়েকবার বমি আর দাস্ত। দুদিন জ্বর নিয়েও সে উঠে সব পরিষ্কার করতে পারল। তৃতীয় দিনে বড় কাহিত হয়ে পড়ল শরীর। পড়শী এক ডাকের মাসি এসে দেখে-টেখে বলল, এ জ্বর কিন্তু ভোগাবে।
কী করি বলো তো!
ডাক্তার ডাকিনি?
না, কে ডাকবে? দুদিন তো কাউকে খবরও দিতে পারিনি। আজ তুমি এলে।
ডাক্তার ডাকা তো আর শক্ত কাজ নয়। অধীরকে গিয়ে পাঠাচ্ছি বৃন্দাবন ডাক্তারকে ডেকে আনতে। কিন্তু তোর যে এখন কাছে থাকার লোক চাই।
কাকাকে একটা খবর পাঠাবে? তা হলে দলের কোনও মেয়েকে পাঠিয়ে দেবেন। কুসুমের কথা বোলো। কুসুম এলে ভাল হবে।
তাই হবে মা। মাথাটা ধুইয়ে দিয়ে যাই। উঃ, এ যে অনেক জ্বর।
বৃন্দাবন ডাক্তার এল। দেখেটেখে বলল, টাইফয়েড বলেই তো মনে হচ্ছে। কয়েকদিন দেখা যাক, তারপর ক্লোরোমাইসিটিন দেওয়া যাবে।
বীণা একটু অস্থির হয়ে বলল, এখনই সারিয়ে দিন ডাক্তারবাবু। আমার যে অনেক কাজ।
কাজ বললেই শুনছে কে? প্রধানমন্ত্রীর তো তোমার চেয়েও অনেক বেশি কাজ, তাই বলে কি অসুখ হলে তাঁকে শুয়ে থাকতে হয় না?
আমি যে একা। কে সামলাবে সব?
সেটা তো বলতে পারি না। আর একাই-বা কেন? নিমাই কোথায় গেছে?
সে এখন এখানে থাকে না।
অ। তাই তাকে দেখি না আজকাল। কোথায় থাকে এখন সে!
কাঁচড়াপাড়ায়, দোকান দিয়েছে।
যাক, একটা হিল্পে হয়েছে তা হলে! শুকনো মুখে ঘুরে বেড়াত, দেখে ভারি কষ্ট হত। দোকান দেওয়ার ভারি শখ ছিল।
কুসুম এল বিকেলের দিকে।
কী হল বীণাদি?
ডাক্তার বলছে টাইফয়েড।
ও বাবা!
ভয় পেলি নাকি?
কুসুম একগাল হাসল, আমার আবার ভয়! বাবার ক্যান্সার হয়েছিল, টানা নমাস সেবা করেছি। শু-মুত ঘেঁটে আমার অভ্যাস আছে।
সেইজন্যই তো তোকে ডাকা। শোন, বাড়িতে বলে আয়। কয়েকটা দিন আমার কাছেই থাকবি। পারবি তো?
বলেই এসেছি। তোমার চিন্তা নেই।
পারুলদের বাড়িতে একটা তক্তাপোশ পড়ে আছে, ব্যবহার হয় না। ওটা আজই ওরা পৌঁছে দেবে। ওটাতেই শুবি।
তক্তাপোশর কী দরকার ছিল? তোমার তো পাকা মেঝে। এখানেই শুতে পারতাম।
পাকা মেঝে মানে কি আর তেমন কিছু? ড্যাম্প আছে।
জ্বরটা দুপুরের পর এত বাড়ল যে বীণাপাণি একটা ঘোরের মধ্যে ড়ুবে গেল। ড়ুবে গিয়ে একটা স্বপ্নের মতো কিছু দেখল। দেখল, বিশাল একটা রেস্টুরেন্টে বসে সে খুব চপ কাটলেট খাচ্ছে। টেবিলে অনেক খাবার। এত খেয়ে শেষ করতে পারবে না।
কে যেন পিছন থেকে বলে উঠল, খাও খাও। খুব খেয়ে নাও, পয়সা লাগবে না। আমাকেও তো অনেক খাইয়েছে।
মুখ ঘুরিয়ে সে নিমাইকে দেখতে পেল। কিন্তু স্বপ্নের চেহারাও অনেক বদলে যায়। এ নিমাই বেশ লম্বা, ভাল স্বাস্থ্য, ফর্সাও। তবু নিমাই বলে ঠিকই চিনল সে। বলল, শোধ দিচ্ছে নাকি?
জিব কেটে নিমাই বলে, আরো ছিছি। তোমার ঋণ কি শোধ করা যায়? তবে আমি নিমকহারাম নই।
তুমি পয়লা নম্বরের নিমকহারাম।
হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই নিমাই এক কাপ আইসক্রিম তার মাথায় উপুড় করে দিল।
বীণা চমকে উঠে বলে, করলে কি? চুলে যে আঠা হয়ে যাবে! আমাকে পালায় নামতে হবে না?
মাথাটা গরম হয়েছে তোমার ঠাণ্ডা করে দিচ্ছি।
মাথায় সত্যিই ঠাণ্ডা টের পেয়ে চটকা ভাঙল বীণার। টের পেল কুসুম তার মাথায় জল ঢালছে।
কী করছিস রে কুসুম?
মাথা ধুইয়ে দিচ্ছি। জুরটা যে বড্ড উঠেছে। ভুল বকছো।
ভুল বকছি? কী বলছিলাম?
কি সব হাবিজাবি। কাকে যেন নিমকহারাম বলে গাল দিচ্ছিলে।
প্রচণ্ড মাথা ধরা, শরীরের প্রগাড় দুর্বলতা সত্ত্বেও একটু হাসল। বীণাপাণি। বলল, কাকে গাল দিচ্ছিলাম রে? জুরের ঘোরে মুখ ফসকে কত কথা বেরিয়ে যায়।
কী খাবে বলো তো!
খাওয়া! ও নামও উচ্চারণা করিাসনি। বমি পায়।
ডাক্তার কী বলে গেছে জানো? ঠেসে খাওয়াতে। ভাত অবধি। জন্মে শুনিনি জ্বর হলে কাউকে ভাত দেওয়া হয়। আজকাল সব নিয়ম উলটে যাচ্ছে।
স্নিগ্ধ জলের ধারায় বড় আরাম পাচ্ছিল বীণাপাণি। চোখ বুজল। ঘুম পাচ্ছে।.
ওমা, এ কি তোমার বউ নাকি?
নিমাই খুব লাজুক হাসি হেসে বলল, ওই আর কি।
তার মানে?
করে ফেললাম বিয়ে। করতেই হত তো। আমার বিরাট ব্যবসা, ওদিকেই পড়ে থাকতে হয়, যত্ন আত্তি কে করে বলো!
জ্বলে গেল বীণাপাণি। তবু বলল, খুব বীরত্বের কাজ করেছো তো! তা আমন একগলা ঘোমটা কেন? ঘোমটা সরিয়ে মুখখানা একটু দেখাও।
নিমাই শশব্যাস্তে বলল, দেখার মতো নয়। খেদিবুচি চেহারা। একেবারেই সাদামাঠা। তোমার ধারে কাছে নয়।
আমাকে কি কোনওকালে সুন্দর দেখেছো তুমি?
ও বাবা! তুমি সুন্দর নও। অমন মুখচোখ, আমন শরীর কোটা মেয়ের আছে?
থাক, আর খোসামোদ করতে হবে না। ঘোমটাটা খোলো, মুখটা দেখি।
দেখলে তোমার খারাপ লাগবে। ট্র্যারা, দাঁত উঁচু, কালো।
তাই তো হওয়ার কথা। তোমার কি আর ভাল জুটবে? দোজ্যবরে, তার ওপর অপদার্থ।
