চারুশীলার গাড়িতে ফিরে এল চয়ন। অনভ্যস্ত রাত্রিবাস।
সে অবাক হয়ে দেখল, তার জন্য চমত্তার বিছানা তো হয়েছেই, বিছানার পাশে একটা টুলের ওপর নতুন পায়জামা, গেঞ্জি আর ভোয়ালে। সঙ্গে নতুন টুথব্রাশ আর টুথপেস্ট।
শুয়ে পড়ুন। আমি বাতি নিবিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। বাথরুটা চিনে রেখেছেন তো? পায়ের দিকে। ঘরে ডিমলাইট জ্বলবে। বালিশের পাশে টর্চও আছে।আর কিছু চাই?
চারুশীলার দিকে অবাক চোখে চেয়ে চয়ন বলে, আরও?
চারুশীলা হাসল না। বলল, দরকার হলে বাঁ দিকের বেড সুইটা টিপবেন। ওটা কলিং বেল। বাজালে চাকরদের মধ্যে কেউ চলে আসবে।
চয়ন মাথা নেড়ে বলল, ঠিক আছে।
» ০৭০. টাকা আসছে
টাকা আসছে। খুব ধীরে আসছে। কিন্তু আসছে ঠিকই। বড়লোকদের যেমনধারা আসে তেমন নয়। কিন্তু গরিবদের মতো করেও তো টাকার আনাগোনা আছে। কাকার কাছ থেকে বাড়তি এক হাজার টাকা পাচ্ছিল বীণা। গত মাসে কাকা সেটা একশো টাকা বাড়িয়ে দিল। বলতে নেই, কাকারও দিনকাল ভাল। চোরাপথে ব্যবসার টাকা তো আছেই, বিশ্ববিজয় অপেরার বুকিংও বড় কম হচ্ছে না। খুব নামডাক চারদিকে। বীণার মাইনে সেখানেও কিছু বেড়েছে। টাকা বেশ কিছু জমে গিয়েছিল বীণার হাতে। শ্বশুরবাড়িতে টাকা দেওয়া বন্ধ করেছে অনেকদিন। নিমাইকে আর টানতে হচ্ছে না। এই টাকা দিয়ে সে ঘরের মেঝেটা বধিয়ে নিয়েছে। খুব পোত্ত একটা স্টেনলেস স্টিলের বাক্সের মধ্যে প্লাস্টিকে নিচ্ছিদ্র করে ডলার আর পাউন্ডগুলো বেঁধে সে মেঝের অনেক গভীরে পুঁতে দিয়েছে। মেঝে বাধানোর পর হাফ ছেড়ে বেঁচেছে সে। পাকা বন্দোবস্ত হয়ে রইল ব্যাঙ্কের ভস্টের মতো। পাকা মেঝের তলা থেকে তো আর কেউ বের করতে পারবে না সহসা, না জানলে। বীণা ভেবে দেখেছে, ওই ডলার আর পাউন্ড এখন তার কাজে লাগবে না। দরকারও নেই। ওটা ভবিষ্যতের জন্য থাক।
এই ভবিষ্যৎ কথাটা নিয়ে বীণা আজকাল খুব ভাবে। তার ভবিষ্যৎ কী? নিমাইয়ের সঙ্গে যুতে থেকে তার জীবনটা একরকম নষ্ট হচ্ছিল। আর ওই অলস লোকটাও হয়ে যাচ্ছিল অকেজো। বিদেয় হয়ে ভালই হয়েছে। এখন বীণাও স্বাধীন নিমাইও স্বাধীন। কিন্তু তবু বীণা একটা ভবিষ্যৎ দেখতে চায়। কলকাতার বড় দল বা সিনেমায় সে কি কখনও ডাক পাবে? তার মুখ কি কখনও দেখা যাবে দেওয়ালে সঁটা পোস্টারে? নাম বেরোবে কি কাগজে? ভবিষ্যৎ বলতে সে এসবই বোঝে। ঘরসংসার নয়, ছেলেপুলে নয়, তার ভবিষ্যৎ হবে ওরকমই কিছু। যদি ততটা নাও হয়, ক্ষতি নেই। খানিকটা সে এগিয়েছে, আরও অনেকটা নিশ্চয়ই এগোবে। বয়স এসে ধরার আগেই সে আরও একটু এগোতে চায়।
সুন্দরবনে এক জায়গায় পালা ছিল। মেলা লোক হল আসরে। পালা জমেও গেল খুব। বীণাপানির ওপর সেদিন যেন কিসের ভর হয়েছিল। এত ভাল পার্ট করল আর এমন গান গাইল যে আসর মাত।
সেই রাতে পালার শেষে কাকা অবধি মুগ্ধ। আঙুল থেকে আংটি খুলে তাকে দিয়ে বলল, নাও বীণা, আজকের জন্য তোমার প্রাইজ।
বীণার সেদিন হাসি আর কান্না একসঙ্গে পাচ্ছিল। এত আনন্দও আছে জীবনে! আংটিটা দু-হাতের অঞ্জলিতে নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে কাকাকে বলল, তোমার মুখ থেকে যা শুনলাম সেইটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাইজ। আংটিটা ফেরত নাও কাকা।
দেওয়া জিনিস কেউ ফেরত নেয়।
নাও, এটা তোমার কোন গ্রহবৈশুণ্যের জন্য তোমার বউ বানিয়ে দিয়েছিল। এ আমি নিতে পারব না। এটা পরার পর থেকেই তোমার উন্নতি হচ্ছে।
আরে, তাতে কি? আবার একটা বানিয়ে নেবোখন।
না কাকা, আংটিটা পরে থাকে। তুমি বেঁচে থাকলেই আমরা অনেকে বাঁচবো।
দোনোমোনো করে কাকা আংটি ফেরত নিল, কিন্তু তার বদলে কড়কড়ে দুটো টাকা দিল তাকে। বলল, এটাই রাখখা তা হলে। প্রাইজ।
বীণার সঙ্গে কাকার সম্পর্কটা খুব ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। তবে খারাপ কিছু নয় এখনও। একবার দলের পাপিয়া নামে একটা মেয়ে তাকে বলেছিল, ও বীণাদি, তুমি কাকাকে বিয়ে করো না কেন?
বীণা অবাক হয়ে বলে, বিয়ে! কী বলছিস; তোর মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?
আলটপকা বলে ফেললাম বলে রাগ কোরো না। কিন্তু হলে কি খারাপ।
আমার একজন বর আছে। অপদার্থ হলেও আছে। কাকারও বউ আছে। তার চেয়ে বড় কথা আমদের সম্পর্ক ওরকম নয় মোটেই। তোরা বুঝি এসব নিয়ে আড়ালে আলোচনা করিস?
পাপিয়ার মুখ একটু শুকিয়ে গেল। সে জানে, বিশ্ববিজয় অপেরায় এখন ক্ষমতার দিক দিয়ে কাকার পরেই বীণাপাণি। বীণাপাণি ইচ্ছে করলেই তাকে দলছাড়া করতে পারে। সে কাচুমাচু মুখ করে বলল, কী জানো, আমি ভাবি তোমার আর কাকার জোড় হলে খুব ভাল হত। দুজনে যেন দুজনের জন্যেই জন্মেছো।
বীণাপাণি রাগ করেনি। সে জানে, পুরুষদের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করে এই যাত্রা করে বেড়ানো, এর জন্য কানাঘুষো হয়েই থাকে। ওসব গায়ে মাখতে নেই। সে একটু হেসে বলল, মেয়েরাই মেয়েদের সবচেয়ে বড় শত্ৰু, জানি তো? একটু মেলামেশা হলেই কত কী ভেবে নেয় মেয়েরা। হ্যাঁ রে, মেয়েদের স্বাধীনতার কথা যে এত শোনা যায় সেটা কি তবে একটা হুজুগমাত্র। কাকার সঙ্গে আমার মেলামেশাটা কি বন্ধুর মতো হতে পারে না?
তা তো পরেই।
তা হলে হঠাৎ বিয়ের কথা ওঠে কেন? বিয়েটা কোন্ স্বৰ্গবাস বল তো! বিয়ে ছাড়া মেয়েদের বুঝি আর কাজ নেই?
আমার ভুল হয়েছে বীণাদি। রাগ কোরো না।
বীণাপাণি বিষণ্ণ গলায় বলল, এইটুকু বয়সে, ভাল করে জ্ঞান হওয়ার আগেই আমার বাবা কোথা থেকে একটা লোক ধরে এনে বিয়ে দিয়ে দিল। তার ফলটা কী হল বলতো! কটা হাত-পা গজাল আমার? কোন্ আনন্দে ছিলাম? বিয়ের কথা শুনলেই তাই আমার পিত্তি জ্বলে যায়। আর তোরাও হয়েছিস তেমনি, বিয়ের জন্য লালা করে বেড়াস। যেন বিয়ে হওয়া মানেই মোক্ষলাভ।
