চয়ন ব্যস্ত হয়ে বলে, না না। তা নয়।
তা হলে?
আমার মনে হয় আপনি ঠিক ততটা আগ্রহী ছিলেন না।
অত ভদ্রতা করে বলছেন কেন? বী এ ফ্রেন্ড অ্যান্ড বী ফ্র্যাংক। চয়ন লজ্জা পেয়ে বলে, আমি তো অত বুঝি না।
খুব অবুঝও আপনি নন। ঠিক আছে। এ নিয়ে পরে কথা হবে। দুটো গাড়িই আমাদের পেরিয়ে গেছে। ওদের ধরা যাক।
গাড়িটা আচমকা দারুণ জোরে চলতে শুরু করল। আর সিটে সিঁটিয়ে বসে রইল চয়ন।
এয়ারপোর্ট দেখে চয়ন মুগ্ধ। এত বড়, এত সাজানো, এত ঝকঝকে ব্যাপার সে আগে বড় বিশেষ দেখেনি। লাউঞ্জে রশ্মিকে ঘিরে তার মেলা আত্মীয়স্বজন।
দুটো গাড়িকে পিছনে ফেলে হেমাঙ্গই পৌঁছেছে আগে। লাউঞ্জে ঢাকার মুখে সামান্য প্রোটোকল ছিল। সেটা ডিঙিয়ে চয়নকে নিয়ে ভিতরে ঢুকেই সে বেশ নাটকীয়ভাবে ডাকল, রশ্মি!
রশ্মি হাসিমুখে একটু এগিয়ে এল, এসেছে?
দুজনেরই হাসিমুখ। দুটো মুখই মেঘমুক্ত। কোনও টেনশন নেই। একটু দূর থেকে দুটো মুখকে এরকমই মনে হল চয়নের। এরা কি পরস্পরের খপ্পর থেকে বেঁচে গেল? এরা কি পরস্পরের গ্রাস হতে হতেও হল না?
চয়নের অবশ্যম্ভাবী অনিন্দিতার কথা মনে হল। অনিন্দিতা একটা কিছু ঘটিয়ে তুলতে চাইছে কি? গতকালও থিয়েটারের টিকিট এনেছিল এবং তাকে অনিন্দিতার সঙ্গে যেতেও হয়েছিল থিয়েটারে। নাটকটা কেমন তা ভাল বঝেনি চয়ন। তবে তার ভাল লাগছিল না। কিন্তু অনিন্দিতা মন্ত্ৰমুগ্ধ হয়ে দেখছিল। ফেরার সময় একসঙ্গে কিছুক্ষণ। না, বিশেষ ইঙ্গিতবহ কোনও কথা হয়নি। শুধু অনিন্দিতা একবার জিজ্ঞেস করেছিল, ভাল লাগল?
ভালই তো!
কোনটা ভাল?
কেন, নাটকটা!
আর আমি! বলে খুব হেসে ফেলেছিল অনিন্দিতা।
চয়ন একটু দূর থেকে দেখছে, রশ্মি কথা বলছে হেমাঙ্গর সঙ্গে। একটা ডোরাকাটা জামা আর জিনসের প্যান্ট পরে আছে হেমাঙ্গ। দাড়িতে তার মুখে একটা আলাদা সৌন্দর্য এসেছে। আর রশ্মি তো দারুণ সুন্দরীই। তার পরনে সবুজ আর সাদায় মেশানো চুড়িদার। দুজনকে মুখোমুখি বেশ মানিয়েছে। যেন মেড ফর ইচ আদার। কিন্তু ব্যাপারটা যেমন দেখাচ্ছে। তেমন নয়। পৃথিবীতে এরকম কত ভুল দৃশ্য আছে।
লাউঞ্জে ঢুকল এসে চারুশীলা অ্যান্ড পার্টি। হইহই ব্যাপার। এই ডামাডোলে কেউ লক্ষই করল না চয়নকে। এরকমই ভাল। সে কারও লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকলে অস্বস্তি বোধ করে। ভয় একটাই, ফেরার সময় তাকে আবার ভুলে ফেলে না চলে যায়।
দল থেকে কিছুক্ষণ পর একটি মেয়ে শুটপুট করে এসে তার পাশে দাঁড়াল।
একা দাঁড়িয়ে যে!
চয়ন লাজুক গলায় বলে, এমনি।
আপনি ভীষণ মুখচোরা, না?
চয়ন মৃদু হেসে বলে, না, তা নয়। রশ্মি আর হেমাঙ্গবাবু কথা বলছিলেন তো, তাই একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঝুমকি হেসে বলল, বিদায়-দৃশ্যটা কেমন হল? খুব ট্র্যাজিক?
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, কি জানি ঠিক বুঝতে পারিনি।
ঝুমকি দলটার দিকে চেয়ে রইল। তারপর বললচারুমাসি আমাকে ভীষণ ভালবাসে। সব জায়গায় নিয়ে যায় জোর করে। নইলে আমার কিন্তু একদম আসার ইচ্ছে ছিল না।
চয়ন হঠাৎ প্রশ্ন করল, কেন?
এরা সবাই বড়লোক। অনেক টাকা। আমার যেন বড়লোকদের সঙ্গে বেশী মেলামেশা করতে অস্বস্তি হয়। আপনার হয় না।
চয়ন একটু অবাক হয়ে বলে, আমার! আমি তো সামান্য পড়ার মাস্টার।
আপনি এলেন কেন?
উনি জোর করে নিয়ে এলেন।
দূর থেকে চারুশীলা হাতছানি দিয়ে ডাকল ঝুমকিকে।
চয়ন বলল, আপনি যান। ডাকছে।
ঝুমকি চলে গেল। চয়ন একদৃষ্টে চেয়ে রইল। সে এই মেয়েটিকে নিয়ে ভাবছে। ভাবতে হচ্ছে। এই মেয়েটারও একটা চাপা বক্তব্য আছে। সেটা ঠিক বোঝা যায় না।
বিদায় পর্ব শেষ হয়ে গেল। সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এনক্লোজারে ঢুকে গেল রশ্মি। সে ফিরে যাচ্ছে নিজের ক্ষেত্রে। নিজের জায়গায়। মুখে হাসি। কোনও বিষণ্ণতা নেই। বিন্দুমাত্র নেই।
চারুশীলা সবাইকে কফি খাওয়াল। তারপর তারা উঠল ওপরে। যেখান থেকে প্লেনটা দেখা যায়। নানা আলো বিকীরণ করে প্লেনটা দাঁড়িয়ে গো গো করছে। আকাশজোড়া অন্ধকার। ওই অন্ধকারে একটু পরেই আকাশে উধাও হবে বিমান। তার ছোট্টো খোলর মধ্যে কয়েকটি মানুষ। হাজার হাজার মাইল পেরোবে। কী সাঘাতিক।
চয়নের পাশেই দাঁড়ালো হেমাঙ্গ। বলল, কুইটস্।
চয়ন চমকে উঠে বলে, কিছু বলছেন?
দাড়ি-গোঁফের ভিতর দিয়ে একটু হাসল হেমাঙ্গ। বলল, বললাম।
আজ্ঞে আমি বুঝতে পারিনি।
বললাম হিয়ার এন্ড দি ড্রামা। ড্ৰপসিন।
ওঃ।
আমি আবার মুক্ত, ভারহীন, স্বাধীন।
চয়ন মৃদু একটু হাসল।
হাসলেন যে!
ভালই তো।
কাল গাঁয়ে ফিরে যাচ্ছি।
কালকেই?
নয় কেন? দিন সাতেক বিরহের জ্বালাটা জুড়িয়ে আসি।
ও।
বিশ্বাস করলেন না।
কেন করব না?
মুখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি বিরহে বিশ্বাসী নন।
ছয়ন বিব্রত হয়ে বলে, তা নয়। আমি সব ঠিকমতো বোঝাতে পারি না।
আপনার কাছে অনেক কিছু শেখার আছে মশাই।
কী যে বলেন।
হেমাঙ্গ অন্যমনস্কভাবে প্লেনটার দিকে চেয়ে রইল।
চয়ন হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, প্লেনে চড়তে ভয় করে না?
হেমাঙ্গ তার দিকে ফিরে চেয়ে বলে, করে। আমার তো খুব করে। কেন যে এসব বিপজ্জনক জিনিস বানায় মানুষ। এ সবের চেয়ে নৌকো ভাল, পালকি ভাল, পায়ে হাঁটা ভাল বা ঘোড়ায় চড়া। বুঝলেন, পৃথিবী আবার একদিন সেই সব যুগে ফিরে যাবে।
চয়ন মৃদু হাসল।
প্লেনটা উড়ল আরও আধঘণ্টা বাদে। জীবনে প্রথম প্লেন উড়তে দেখল চয়ন। অনেকটা গড়িয়ে গিয়ে রানওয়েতে ঘুরল। তারপর একটা প্রচণ্ড গতি। একটা ঢেউ। তারপর জানালার পিদিমের সারি নিয়ে অন্ধকার আকাশে কী সুন্দর একটা ক্ষণিকের দৃশ্য হয়ে মিলিয়ে গেল।
