চয়ন সংকোচের সঙ্গে বলে, প্রত্যাখ্যান! এটা কি তাই?
নয় তো?
হেমাঙ্গ কী শুনতে চাইছে তা চয়ন বুঝতে পারল। বলল, না, প্রত্যাখ্যান কেন হবে?
অন্তত লোকে তো তাই ভাববে?
চয়ন একটু ভাববার ভান করল। তারপর একটু সরল গলায় বলে, আমার তা মনে হয় না।
হেমাঙ্গ সামনের হেডলাইটে উজ্জ্বল রাস্তার দিকে চেয়ে বলে, কি জানি, আমার তো সন্দেহ ছিল সবাই আমাকেই দায়ী করবে। ডি ছি করবে, খানিকটা সেই ভয়েই তো গায়ে পালিয়ে ছিলাম।
চয়ন মৃদু হেসে বলে, আপনার গাঁয়ের বাড়িটা খুব সুন্দর।
আপনার ভাল লেগেছে? যাদের চোখ আর রুচি আছে তাদের ভালই লাগবে। বসবাস করার পক্ষে শহর একদম বাজে জায়গা। বুক ভরে দমটা অবধি নেওয়ার উপায় নেই। কৃষ্ণজীবনবাবু কি আর সাধে পরিবেশ-পরিবেশ করে এত অস্থির হন! আমার তো ইচ্ছে করছে কালকেই আবার গায়ে চলে যাই। যাবেন আমার সঙ্গে?
চয়ন একটু শঙ্কিত হয়ে বলে, আমার তো উপায় নেই।
টিউশনি?
আজ্ঞে।
আমারও তো কত কাজ কলকাতায়। কিন্তু জীবনের আনন্দটাই যদি না থাকে তা হলে পয়সা দিয়ে কী হবে?
তা তো বটেই।
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চালাল হেমাঙ্গ। তারপর বলল, তা হলে আপনি বলছেন রশির সঙ্গে আমি বিট্রে করিনি।
না তো!
একটা যেন স্বস্তির শ্বাস মোচন করে হেমাঙ্গ বলে, রশি খুব ভাল স্বভাবের মেয়ে। কাল নিজে গিয়ে আমাকে কলকাতায় টেনে আনল। একটুও রাগ করল না আমার ওপর।
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, ওঁর মতো মেয়ে কমই দেখা যায়। যেমন ব্রিলিয়ান্ট, তেমনি বিনয়ী।
রশির প্রশংসা শুনে খুশি হল হেমাঙ্গ। বলল, বিয়ে করলে ওরকম মেয়েকেই করতে হয়। আমার কপালটাই হয়তো খারাপ।
চয়ন সতর্কভাবে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, আপনিও তো কম যান না!
আমি! হাসালেন মশাই। রশ্মির তুলনায় আমি নিতান্তই এলেবেলে।
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, না না, তা কি হয়? আপনারা দুজনেই সমান ভাল।
বলছেন?
হ্যাঁ। আর তাই আমার মনে হয়, বিয়েটা না হয়ে আপনার কোন ক্ষতি হয়নি।
অ্যাঁ। ক্ষতি হয়নি মানে?
চয়ন ব্যস্ত হয়ে বলল, সমান ভাল দুজনের জোড় হয়তো মিলত না।
কথাটা শুনে এত অবাক হয়ে গেল হেমাঙ্গ যে, আর একটু হলে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত। সামলে নিয়ে বলে, কী বলছেন চয়ন?
চয়ন ভীষণ সংকুচিত হয়ে বলল, বিজ্ঞানের নিয়মেই সগোত্র হওয়া ভাল নয়।
হেমাঙ্গ গাড়ির গতি কমিয়ে চয়নের দিকে অবাক একটি চাউনি হেনে বলল, আপনি তো ডেঞ্জারাস লোক মশাই!
চয়ন একটু ভয় পেয়ে গিয়ে বলল, আপনি রাগ করলেন।
হেমাঙ্গ আরও কিছুক্ষণ ধীর গতিতে গাড়ি চালাল। ততক্ষণে ডান পাশ দিয়ে সাদা মারুতিটা বেরিয়ে গেল। জানালা দিয়ে চারুশীলা মুখ বাড়িয়ে বলল, এই হাঁদারাম, গাড়ি খারাপ হয়েছে নাকি?
না। সব ঠিক আছে।
গাড়িটা বেরিয়ে গেলে হেমাঙ্গ বলল, রাগ করাই বোধ হয় উচিত। কিন্তু রাগ হচ্ছে না। সগোত্র কথাটা খুব ইন্টেলিজেন্টলি পুট করেছেন তো! একজ্যাক্টলি যেন এই শব্দটাই আমি খুঁজছিলাম।
আমি কিন্তু ভেবেচিন্তে বলিনি।
তা না বললেও এ কথাটা যে আপনার মাথায় এসেছে এটা কম কথা নয়। আমার কখনও কখনও মনে হয়েছে আমাদের মধ্যে স্বভাবের একটা বড় মিল আছে। আবার নেইও। কিন্তু মিলটাই বোধ হয় বেশি।
চয়ন করুণ একটু হাসল। সে জানে হেমাঙ্গ এখন যা বলছে সেটাও সত্যি নয়। কারণ বাস্তবিক পক্ষে হেমাঙ্গর সঙ্গে রশ্মির মিলের চেয়ে অমিলই ঢের বেশি। চয়ন সগোত্র শব্দটা ব্যবহার করেছে অনিচ্ছে সত্ত্বেও স্রেফ আত্মরক্ষার জন্য।
হেমাঙ্গ একটু সময়ের ফাঁক দিয়ে বলল, আমি ওকে খুব ভালবাসি বটে, কিন্তু মনে হল আমাদের বিয়েটা যেন একটা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার মতো হয়ে যাবে। এরকম হওয়া উচিত নয়। কী বলেন? বিয়ে করলে ইংল্যান্ডে যেতে হবে, আমার শিকড় উপড়ে নিতে হবে। আমার পক্ষে এতটা কি সম্ভব?
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, ঠিকই তো।
ঠিক নয়?
চয়ন একটু চুপ করে থেকে বলে, লোকে ভালবাসার জন্য কত কী করে? কোনও মানে হয় না। প্র্যাক্টিক্যাল হওয়াই ভাল।
গাড়িটা আর একবার যেন টাল খেল। হেমাঙ্গ অস্ফুট স্বরে বলল, আপনি খুব ডেঞ্জারাস লোক মশাই।
আজ্ঞে তা নয়।
একটু বিচ্ছু টাইপের কি আপনি! বাইরে থেকে মনে হয়, ভাজা মাছ উলটে খেতে জানেন না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে গভীর জলের মাছ।
চয়ন সভয়ে বলে, না না, আমি আসলে—
হেমাঙ্গ খোলা গলায় হাসল, আপনি কি বলতে চান যে, রশ্মি আর আমার মধ্যে সত্যিকারের ভালবাসা হয়নি?
তা তো বলিনি!
না, তা বলেননি। বিরা অত খোলাখুলি বলেও না।
আপনি ভুল বুঝেছেন।
ঠিক বুঝেছি। কিন্তু তা বলে রাগ করিনি। ভয় পাবেন না। আপনার আই. কিউ. কত?
জানি না তো!
একবার মেপে দেখবেন!
কেন বলুন তো?
মনে হচ্ছে আপনার আই. কিউ. রেটিং বেশ হাই।
চয়ন লজ্জা পেয়ে বলে, আপনি রাগ করেছেন।
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, করিনি। রশ্মি আর আমার ব্যাপারটার মধ্যে রোমান্টিক জিনিসটা ছিল না। আমরা দুজনেই পাক্কা প্রফেশনাল। কী জীবনে, কী কেরিয়ারে। বাট শী ইজ সাচ এ সফটু বিউটিফুল উওম্যান।
চয়ন চুপ করে থাকে।
হেমাঙ্গ নিজেই আবার হঠাৎ বলল, কেন বলুন তো আমি ওর জন্য ঠিক পাগল হতে পারলাম না? পাগল হতে পারলে ও যা চাইছে তা করা শক্ত ছিল না। কেন পারলাম না? কোথায় একটা ক্যালকুলেশন ঢুকে পড়ল আমাদের রিলেশনে?
চয়ন একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ক্যালকুলেশন কেন ঢুকবে?
হেমাঙ্গ গম্ভীর হয়ে বলে, ক্যালকুলেশনই। আমি নানাভাবে নিজেকে পরীক্ষা করেছি, প্রশ্ন করেছি। গাঁয়ে বসে রাতের পর রাত জেগে বসে ভেবে দেখেছি। দেয়ার ইজ এ ফ্লাই ইন দি অয়েন্টমেন্ট। মনে হচ্ছে, এই মাছিটা হল আমার ভিতরকার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টটা।
