আজকের ঘটনাটাই যেমন পড়াতে গিয়েছিল চয়ন। চারুশীলা তাকে দেখেই ঘোষণা করল, আজ আর পড়াতে হবে না। রশ্মি আজ লন্ডন চলে যাচ্ছে। সি-অফ করতে আমরা সবাই যাচ্ছি। আপনাকেও যেতে হবে।
বিস্মিত চয়ন বলে, আমি।
হ্যাঁ, আপনিও। ফিরতে অনেক রাত হবে। ডিনার এখানেই করে নিন, আর আমাদের সঙ্গেই ফিরে আসবেন। এখানেই রাতে থাকবেন।
এগুলো কোনও প্রস্তাব বা অনুবোধ নয়, সিদ্ধান্ত এবং ঘঘাষণা।
চয়ন ভেবেচিন্তে কিছু বলতে পারল না। কেবল চারুশীলার কথারই শেষাংশ পুনরাবৃত্তি করল মাত্র, রাত্রে থাকব।
কেন, আপনার জন্য কেউ চিন্তা করবে নাকি?
চয়ন লাজুক মুখে বলে, না, তা কেউ করবে না।
বলেই চয়নের মনে হল, কথাটার মধ্যে একটু মিথ্যে রয়ে গেল। তার জন্য চিন্তা করার লোক এতদিন কেউ ছিল না। আজকাল হয়েছে। অনিন্দিতা আর তার মা। যদিও ওদের উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগ চয়ন এখনও পছন্দ করে উঠতে পারেনি। রাতে না ফিরলে ওরা অবশ্যই টের পাবে। দাদা-বউদিকেও বলতে পারে।
চারুশীলা বলল, তা হলে আর কী?
চয়ন মৃদু একটু হাসল। ব্যক্তিত্বহীন হওয়ার অসুবিধে অনেক আছে, আবার সুবিধেও কি আর কিছু নেই। ব্যক্তিত্বহীন মানুষদের সঙ্গ বেশিরভাগ মানুষই পছন্দ করে। কেনো, তারা সব কথাতেই সায় দেয়, অকারণে অন্যায্য প্রশংসা করে এবং হাবিজাবি কথাও মন দিয়ে শোনে। মানুষ নিজের ইচ্ছেমতো চালানোর জন্য এসব লোককে সবসময়েই সঙ্গী হিসেবে চায়। মানুষের ইচ্ছাপূরণে সাহায্য করে বলেই কিছু দয়া ও দাক্ষিণ্য তারা পেয়ে থাকে।
লোক বড় কম জোটায়নি চারুশীলা। সন্ধের পর একে একে এল রিয়া আর মোহিনী, এল ঝুমকি, এল দাড়িওলা এবং বিষণ্ণ হেমাঙ্গ। আরও জনা তিনেককে চেনে না চয়ন। দেখা গেল, সকলেরই ডিনারের নেমন্তন্ন। খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনও বেশ বিরাট।
সেদ্ধ ভাত খেয়ে খেয়ে চয়নের পেট মরে গেছে। আজকাল সে একদম বেশি খেতে পারে না। বিশেষ করে ঝালমশলার খাবার খেলেই তার পেটের গোলমাল হয়। কিন্তু বোধ হয় তার স্বাহারে চারুশীলা খুশি নয়। তাই ডিনার টেবিলে তাকে নিয়েই পড়ল চারুশীলা, ও কী চয়নবাবু, ওটুকু মাছ নিলেন যে! ভাতটা আরও নিন তো! …আর একটা মুরগির টুকরো নিতে হবে। …হাত গুটিয়ে রয়েছেন যে, পুডিংটা নিন।
হেমাঙ্গ বিরক্ত হয়ে বলল, মানুষকে খাইয়ে মারতে চাস নাকি? এটা বেশি ফুড ইনটেকের যুগ নয়। মানুষ যত কম খাবে তত বেশিদিন বাঁচবে।
চারুশীলা ঈষৎ ব্লগের গলায় বলে, আহা, বন থেকে বেরোলো টিয়ে, সোনার টোপর মাথায় দিয়ে। এসব ফিলজফি কি সুন্দরবন থেকে শিখে এলি নাকি? নিজের চেহারাটা তো চিমসে তালপাতার সেপাই বানিয়েছিল।
সুন্দরবনে শিখবো কেন? তুই মডার্ন ওয়ার্ল্ডের খবরই রাখিস না। বরং সুব্রতদাকে জিজ্ঞেস কর ঠিক বলছি কি না।
সুব্রত শান্ত মানুষ, বেশি কথা বলে না। তর্কবিতর্ক একেবারেই করে না। শাস্ত হেসে বলল, তোমার লাইফ স্টাইলটা খুবই স্পার্টান হয়ে গেছে।
সেটাই কি ভাল নয়?
সুব্রত মাথা নেড়ে বলে, ভালই।
আমাকে ও চিমসে বলছে ব্রতদা, শুনলেন?
শুনেছি। আমার তো মনে হয় তুমি অনেক লিন হয়েছে, আর চটপটে। রংটাও বেশ ট্যান হয়েছে।
চারুশীলা একটু অবাক হয়ে বলে, তুমি এর প্রশংসা করছো? ধন্যি তোমাকে। ওকে চাষা ছাড়া আর কিছু মনে হয় এখন? কী কালো হয়েছে, কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে গেছে, মুখে জঙ্গল।
সুব্রত মৃদু মৃদু হাসতে লাগল। হেমাঙ্গ একটু মাথা তুলে বলল, টুকটুকে ফর্সা নাদুসনুদুস ন্যাদসমার্কা চেহারা বুঝি ভাল?
হাসতে গিয়ে ঝুমকি বিষম খেল। একটু জল চলকে গেল মোহিনীর হাতের গেলাস থেকে।
কিন্তু এইসব হাসিঠাট্টার মধ্যেও চয়ন লক্ষ করছিল, হেমাঙ্গর চোখ আসছে না। একটা গভীর ক্লান্তি, হতাশা এবং হয়তোবা একটা অপরাধবোধে ছেয়ে আছে তার চোখ। হেমাঙ্গ আর রশ্মির ব্যাপারটা চয়ন জানে বলেই আরও ভাল বোঝা গেল।
দুখানা গাড়ি হলেই হয়ে যেত। কিন্তু বন্দোবস্ত হয়েছে তিনখানা গাড়ির। চারুশীলার দুটো, হেমাঙ্গর একটা। চয়ন পড়ল হেমাঙ্গর ভাগে। সামনের সিটে পাশাপাশি বসে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে হেমাঙ্গ বলে, চয়নবাবু গান জানেন?
আজ্ঞে না।
জানলে আপনাকে আজ একটা গান শোনাতে বলতাম।
কী গান?
যখন ভাঙল মিলনমেলা ভাঙল। কাল রাতেও স্টিরিওতে শুনলাম।
আপনার মনটা খুব খারাপ, না?
একটা হাত স্টিয়ারিং থেকে তুলে দাড়ি আঁচড়াল হেমাঙ্গ। তারপর বলল, আমি বোধ হয় একটা ইমবেসাইল। কিন্তু কিছু করার ছিল না।
চয়ন চুপ করে থাকে। এ ব্যাপারে সে কথা বলার অধিকারী নয়।
হেমাঙ্গ বাইপাসের দিকে গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে আয়নায় একবার পিছনের গাড়িগুলো ঠিকঠাক আসছে কি না দেখে নিল। তারপর বলল, অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? উই আর বোথ ইন লাভ উইথ ইচ আদার। কিন্তু কতগুলো মেটেরিয়াল কারণে, মাইনর পয়েন্টে আটকে রইলাম। দিস ইজ দা জোক অফ এ লাইফটাইম!
চয়ন মৃদু অস্বস্তি বোধ করছে। এই কথার মধ্যে সে একটা ভুল ধরতে পারছে। স্পষ্ট নয়, কিন্তু আবছা হলেও সত্যি। সে মৃদু স্বরে বলল, দুঃখের ব্যাপার।
আপনিও তাই মনে করেন?
চয়ন সোজা সামনের দিকে চেয়ে থেকে বলে, তাই তো।
দোষটা কার বলুন তো? আমারই, না?
চয়ন মাথা নেড়ে বলল, না।
তবে কার?
বোধ হয় ঘটনাচক্রের। আপনি তো রাজি ছিলেন।
আমার যে কেবলই মনে হয় আমি ওকে অপমান করেছি।
চয়ন খুব ভয়ে ভয়ে বলে, অপমান! কই, মনে হয় না তো!
কিন্তু প্রত্যাখ্যান মানেই তো অপমান।
