তা পারছি।
এসব জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে না তোমার?
করলেই বা লাভ কি?
বিষ্ণুপদ হাসিমুখে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, আমারও ইচ্ছে হয়। আমি কি ভাবি জানো? কৃষ্ণর সঙ্গে সঙ্গে আমার সত্তাটাও ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা দেশ।
তুমি বেশ ভাবতে পারো। আমি পারি না।
ওই জন্যই তো কচ্ছপ হওয়া তোমার আর হল না। ওইটে যদি পারতে তবে অনেক অশান্তি থেকে বেঁচে যেতে।
নয়নতারা স্বামীর দিকে চেয়ে বলে, ওইটেই তো তফাত।
বিষ্ণুপদ হাসিমুখে উঠোনের দিকে চেয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, নতুন শুড় ওঠেনি?
না বোধ হয়। উঠলে রেমো ঠিক আনত। কেন, পায়েস খেতে ইচ্ছে যায় নাকি?
তা যায়।
এখানকার বাজারে বোধ হয় ওঠেনি। বলবখন রেমোকে। বললেই এনে দেবে।
বিষ্ণুপদ একটু চুপ থেকে বলল, থাক। বলো না। নিজে থেকে আনলে সেটাই ভাল হবে।
ও মা! ছেলের কাছে সংকোচ কিসের? সে তো ভক্ত হনুমানের মতো তৈরীই আছে।
তা জানি। তবু থাক।
কেন গো?
বিষ্ণুপদ সামান্য সংকোচের সঙ্গে বলল, নোদা জিনিসটা ভাল নয়। ভাবছি জিভকে একটু শাসনে রাখব।
আমার বাপু ওটা সহ্য হবে না। তোমার কিছু খেতে ইচ্ছে গেলে না খাইয়ে আমার শাস্তি নেই।
আবার বেশী বেলে তো টিক টিক করো।
তাও করি। আমি বলেই করি। তোমাকে নিয়ে আর কে ভাববে বলে তো, আমার মতো?
তা বটে।
আজই আনাবো।
বিষ্ণুপদ তবু মাথা নাড়ে, থাকগে। নবুর বাড়িতে অনেক খেজুর গাছ। তারা রস জ্বাল দেয়। করেও ভাল। বললেই দিয়ে যাবে। এখন থাক।
নয়নতারা উঠে গেল। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, রাঙা বউমা আজ রাঁধবে না। অশুচি হয়েছে। কী রাঁধবো বলো তো?
কচু ঘেঁচু যা হয়।
ফুলকপির ঝোল রাঁধি।
রাধো। মাছ নেই বুঝি?
না। ডিম আছে। বাড়ির হাঁসের ডিম।
একটা ভেজে দিতে পারবে। ডালের মুখে খাবো।
দেবোখন।
বিষ্ণুপদ ফের একা হয়ে যায়। একা হয়ে চেয়ে থাকে।
এই বাড়িঘর, বাগান নিয়ে যে এলাকাটুকু, এটার দলিল তার নামে। বামাচরণ সব ভাগজোখ করাল। দখল চাইছে। বাড়িতে বড় অশান্তি হচ্ছে তাই নিয়ে। হোক, যা খুশি হোক। বিষ্ণুপদ আর ভাবে না। সে বরং আমস্টারডামের কথা ভাবে। কৃষ্ণর কথা ভাবে।
এই অন্যমনস্কতার মধ্যেই দুটো সাইকেল এসে থামল উঠোনে। কালো চেহারার দুটো লোক।
একজন একটু হেঁকেই বিষ্ণুপদকে বল, কোন ঘরে বামাচরণ থাকে বলুন তো!
বিষ্ণুপদ তটস্থ হল। বলল, বামা? বামা তো বাড়ি নেই।
সে আমরা জানি। তার বউ আছে তো!
আছে বোধ হয়। কী দরকার?
ডেকে দিন। দরকার আছে।
বিষ্ণুপদ একটু অস্বস্তি বোধ করতে থকে। এরা বোধ হয় রামজীবনের বন্ধুবান্ধবই হবে। কিন্তু মতলব ভাল নয়।
বিষ্ণুপদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, তার বোধ হয় শরীর ভাল নয়।
একজন সাইকেল থেকে নেমে চারধারে চেয়ে দেখে নিয়ে বলল, ওই ঘরটা।
বিষ্ণুপদ সৃভয়ে দেখল, লোকটা এগিয়ে গিয়ে বন্ধ দরজায় দয়া করে একটা লাথি কষাল।
এই, বেরিয়ে আয়!
বামার বউ দরজা খুলল না। কিন্তু ঝাঁপের জানালা তুলে সভয়ে বলল, কে? কী চাই?
তোকেই চাই। বেরিয়ে আয় তো!
জানালার ঝাঁপটা ফেলে দিয়ে বউটা চেঁচাল, বাবা! বাবা! শুনছেন। এরা সব গুণ্ডা। লোকজন ডাকুন…
বিষ্ণুপদ উঠল। হাতপায়ের জড়তা উঠতে দিচ্ছিল না তাকে। তবু উঠল।
কী হয়েছে? আপনারা কারা?
আপনি ঘরে যান। এর সঙ্গে কথা আছে।
গোলমাল শুনে নয়নতারা বেরিয়ে এসেছে রান্নাঘর থেকে। বলল, কী হয়েছে? তোমরা কারা?
আপনারা ঘরে যান।
বিষ্ণুপদ উঠোনে নামতে নামতে বলল, এটা ঠিক হচ্ছে না। এ কাজটা ভাল হচ্ছে না।
লোকটা দমাদম কয়েকটা লাথি দিল দরজায়। সঙ্গে যে সব কথা বলল তা শুনে কানে আঙুল দিতে হয়।
বিষ্ণুপদ এত ভ্যাবাঁচাকা খেয়ে গেল যে, বাক্য সরল না।
লোকটা বলল, এ গায়ের পাট চুকিয়ে তিনদিনের মধ্যে যদি চলে না যায় তা হলে জোড়া লাশ ফেলে দিয়ে যাবো।
শ্যামলী ঘর থেকে চিৎকার করছে, বাবা! আপনি লোক ডাকুন। মেরে ফেলবে যে!
লোকটা আর একটা লাথি কষাল দরজায়, কেন, বুড়ো শ্বরকে যখন ভিটেছাড়া করতে চাও তখন বাবা ডাক কোথায় থাকে রে মাগী? অঁ! এখন নাকী কান্না কাঁদছে, বাবা-বাবা। শালী, যত নষ্টের গোড়া।
শ্যামলী বোধ হয় ভয়ে চুপ করে গেল।
লোকটা ফের সাইকেলে চেপে বলল, বামা আসুক, তার ব্যবস্থা হচ্ছে। শালাকে জানে মেরে দিয়ে যাবে আজ।
লোক দুটো যেমন এসেছিল, তেমনি হুস করে চলে গেল।
বিষ্ণুপদ বিহ্বল দাঁড়িয়ে রইল উঠোনের মাঝখানে। রাঙা ঘর থেকে বেরোলো না। পিছনে দাওয়ায় বসে কাঁদছে নয়নতারা।
দরজা খুলে শ্যামলী বেরিয়ে এল। আতঙ্কিত মুখচোখ।
শুনলেন! শুনলেন আপনি? কী বলবেন এখন? রামজীবনের সঙ্গে সাট নেই আপনার?
আমার!
আপনারা সবাই সমান। সব এক দলে। আমি আজই পুলিশের কাছে যাবো। কোমরে দড়ি পরাবো আপনাদের সবাইকে।
নয়নতারা বলল, ওঁকে কেন বলছে? উনি তো ওদের চেনেনও না।
শ্যামলী মুখ ভেঙিয়ে বলে, চেনেন না! আহা, কী ন্যাকা রে। চেনেন না! ঠিক আছে, চেনেন কিনা তা পুলিশ এলেই বোঝা যাবে।
নয়নতারা বলল, তাই যাও। আমাদের বরং বেঁধে নিয়ে যাক। তাই ভাল।
০৬৯. চারুশীলা যে কেন তাকে এয়ারপোর্টে ধরে এনেছে
চারুশীলা যে কেন তাকে এয়ারপোর্টে ধরে এনেছে তা চয়ন জানে না। চারুশীলার কোনও সিদ্ধান্ত বা কাজেরই যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা করা মুশকিল। তবে তাতে চয়নের একটা লাভ হয়েছে। কস্মিনকালেও সে এয়ারপোর্ট দেখেনি। দেখা হয়ে গেল আজ।
চারুশীলা হুকুম করতে ভালবাসে এবং সেটা তামিল না হলে যে চারুশীলা মানসিক দিক দিয়ে ভেঙে পড়ে এই সূহ্ম ব্যাপারটা চয়ন বোঝ। তাই সে পারতপক্ষে চারুশীলার মতের বিরুদ্ধে কিছু করে না, সামান্য গৃহশিক্ষক হলেও—কে জানে কেন—তাকে ভদ্রমহিলা নানাভাবে নানা বিষয়ে জড়িয়ে দেন। হয়তো ভাবেন, এরকম নানা ব্যাপারে জড়িয়ে থাকলে চয়নের উপকার হবে। উপকার কিছু হয় না, বরং চয়নের অস্বস্তি বাড়ে।
