না তো! কোথায়?
বিষ্ণুপদ অ্যাটলাস খুলে ইউরোপের ম্যাপখানা বের করে দেখাল নয়নতারাকে, এই দেশ, এ হল হল্যান্ড। সমুদ্রে বাঁধ দিয়ে জল সরিয়ে জমি বের করে করে তবে দেশটা হয়েছে।
ও বাবা!
বিষ্ণুপদ হাসল খুব। বলল, ময়দানবের কাণ্ডকারখানা। বিশ্বকৰ্মার সঙ্গে পাল্লা টানছে। এই জায়গাটা হল আমস্টারডাম। কৃষ্ণ এখন এইখানে।
এখান থেকে কত দূর হবে?
পাঁচ হাজার মাইলের কাছাকাছি হবে।
বাবা গো! ভাবলেই কেমন করে, না?
আজকাল আর দূর বলে কিছু নেই। কলকাতা থেকে উড়ে দিনকে দিন পৌঁছে যাচ্ছে। এরোপ্লেন এক আজব জিনিস। এ জীবনে আর চড়া হল না।
আমাকে মেরে ফেললেও আমি এরোপ্লেনে চড়তে পারব না। হ্যাঁ গো, কৃষ্ণ নাকি তোমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল আমেরিকায়।
তা চেয়েছিল। খুব ইচ্ছে, আমাকে একটু দুনিয়াটা দেখায়।
তুমি কী বললে?
বিষ্ণুপদ হেসে বলল, কী আর বলব? ছেলে হিসেবে সে চায় বাপকে একটু ঘুরিয়ে আনে। কিন্তু বড় থচ। কৃষ্ণ হয়তো পিছপা নয় তাতে। কিন্তু ভাবি, বউমা রয়েছে, বাচ্চা-কাচ্চা রয়েছে, আমার জন্য এত খরচ করলে তাদের হয়তো ভাল ঠেকবে না। কি দরকার শেষ বয়সে অত খরচপত্র করে বাইরে যাওয়ার!
নয়নতারা বলল, সে ভাল করেছে। বড় বউমা লোকও খুব সুবিধের নয়। আর তোমাকে আমি যেতে দিতাম নাকি?
বিষ্ণুপদ নয়নতারার দিকে চেয়ে বলে, আটকে রাখতে নাকি?
নয়নতারা চোখ বড় বড় করে বলে, তোমাকে অতদূরে ছেড়ে দেবো? পাগল হয়েছে নাকি।
বিষ্ণুপদ খুব হাসতে লাগল, দুলে দুলে।
হাসছো কেন গো? হাসির কথা কী বললাম?
ভাবলাম, কতদিন আটকাবে! না ছেড়ে উপায় আছে! একদিন এরোপ্লেন ছাড়াই তো ফুরু করে উড়ে যাবে। কত দূরে যাবে তার ঠিকানাই নেই।
নয়নতারা আজ একটু হাসল। বলল, অত সোজা নয়। বেকেনবাবু সেদিন কী বলল জানো? বলেছে, আমি সধবা মরব।
বিষ্ণুপদও হাসল, সধবা মরে যে কী সুখ কে জানে! তবে বলি কি মমরি নিয়ে ভেবে লাভ নেই। ও কেউ দুদিন এগিয়ে আনতে পারবে না, পেছিয়েও দিতে পারবে না। দিনটা ঠিক করাই আছে। তবে আমাদের জানা নেই, এই যা। অদৃষ্ট মানে যা দৃষ্ট নয়, গোচর নয়। তা সে-ই ভাল। জানা থাকলে কি ভাল লাগত।
নয়নতারা আর একটু তামাকপাতা মুখে পুরে বলল, হ্যাঁ গো, তোমাকে যে কৃষ্ণ কত জিনিস এনে দিয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করো না কেন? খেউড়ি হওয়ার কি সব এনে দিল না।
ওঃ, সে আর এক কাও। কৌটোর মধ্যে সাবানের ফেনা পোরা আছে। ওপরে একটা জায়গায় চাপ দিলেই ভস ডস করে এত বেরিয়ে আসে। কৃষ্ণ শিখিয়ে পড়িয়েও দিয়ে গিয়েছিল সব। হল কি জানো, টিপতেই সে এমন ফেনা বেরুলো যে গালের ওপর গন্ধমাদন দাঁড়িয়ে গেল। এই এত ফেনা। তারমধ্যে নিজের গালখানাই খুঁজে পাই না। তারপর থেকে আর ব্যবহার করি না। চাকা সাবানই ভাল।
নয়নতারা হেসে ফেলল। বলল, হাসাতেও পারো বাপু। আর ওই সুন্দর গন্ধওলা জিনিসটা।
ওটা কামানোর পর লাগায়। আফটার শেভ লোশন। কেটেকুটে গেলে ওটা লাগালে আর বিষিয়ে যায় না।
তা লাগাও না কেন?
গন্ধ মেখে হবেটা কি? ফিটকিরিতেই কাজ হয়ে যায়। আছে জিনিসটা থাক।
বড় হিসেব করো তুমি। এনে দিয়েছে, ব্যবহার করলেই তো হয়।
বিষ্ণুপদ নয়নতারার দিকে চেয়ে বলল, আর তোমাকে যে ফোল্ডিং ছাতা, ব্যাগ, শাড়ি এনে দিয়েছে তা ব্যবহার করা কি?
রেখে দিয়েছি। পটলের বউ এসে ব্যবহার করবে।
আমারটাও পটলকেই দিয়ে যাবো।
ম্যাপটা খুলে বিষ্ণুপদ দেখছি, বলল, তোমার একদম মনোেযোগ নেই। আমস্টারডামটা কোথায় এবার দেখাও তত। ভুলে গেছ?
নয়নতারা আঙুল বাড়িয়ে দেখিয়ে দিল, এইখানে তো!
ওঃ, পেরেছে তো, দশে দশ।
নয়নতারা হাসল, আর আমার ওপর মাস্টারি ফলাতে হবে না।
বিষ্ণুপদ একটু আনমনা হয়ে বলল, কৃষ্ণ এখন এইখানে। বুঝলে! হল্যান্ড। সমুদ্রে বাঁধ দিয়ে, জল হেঁচে তবে মাটি বার করা হয়েছে। সেখানে চাষবাস হয়, বাড়ি ঘর করে লেকে থাকে, গাড়ি চলে। বাঁধ ভেঙে গেলে দেশ ভেসে যাবে চোখের পলকে। কিন্তু ডাঙে না। শয়ে শয়ে বছর ধরে দিব্যি আছে।
হা গো, এই যে সমুদ্রকে হটিয়ে দিচ্ছে, এতে মানুষের পাপ হয় না? এ যে খোদার ওপর খোদকারি।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, তা কেন? মানুষকে যে এত বুদ্ধি, এত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে না। আমার মতো ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকবে সবাই? সে দেশে মাটির অভাব। সেই অভাব পুষিয়ে না নিলে চলবে. কেন? মাটির জন্যই দেখ না, এত ঝগড়া-কাজিয়া, মারপিট, আইয়ে ভাইয়ে মুখদর্শন বন্ধ।
নয়নতারা ফের সাদা পাতা ছিঁড়ছিল।
বিষ্ণুপদ একটু লক্ষ করে বলল, ডোজটা যেন বেশ বেড়েছে মনে হয়?
ময়নতারা লজ্জা পেয়ে বলল, এবারের পাতাটায় কটা যেন কম।
তা নয়, তোমার নেশাও বাড়ছে। অত খেও না। অম্বল হবে। আর অম্বল!
মনটাই ভাল নেই।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্যাপ দেখতে লাগল। কৃষ্ণ এখন আমস্টারডামে। কবচখানা সঙ্গে নিয়ে গেছে কি? না নি, তাতে কিছু নয়। কৃষ্ণ তো তারই ছেলে। ছেলের মধ্যে বাপের অস্তিত্ব থাকেই। কৃষ্ণের মধ্যে বিষ্ণুপদও কি একটু নেই? আছে বোধহয়।
কী ভাবছো?
এই নানা কথা। উল্টো-পাল্টা। ঠিক থাকে না।
ভূগোল বইটা একটু আমাকে পড়ে শুনিও তো।
তুমি নিজেও তো পড়তে পারো।
অক্ষর চিনবো কি? ভুলে-টুলে গেছি বোধ হয়।
ভোলোনি। চেষ্টা করলেই পারবে।
তুমিই শুনিও।
বিষ্ণুপদ হল্যান্ডের বিবরণ একটু পড়ে শোনাল নয়নতারাকে! বলল, বুঝতে পারছে?
