সে একবার জিজ্ঞেস করল, মনে থাকবে রশ্মি, আমাকে?
সে কথা তার ঠোঁট থেকে কেড়ে নিয়ে গেল লুঠেরা বাতাস। রশ্মির কানে পৌঁছলো না।
আপনমনে একটু মাথা নাড়ে হেমাঙ্গ। মনে রাখার দরকার কী? কেন বন্ধন? কেন মনের বাঁধনে আটকে থাকা? কোনও দরকার নেই তো!
০৬৮. নিজেকে মুক্ত রাখা কি সোজা কথা
নিজেকে মুক্ত রাখা কি সোজা কথা? অনেক কষ্টে কচ্ছপের মতো নিজের ভিতরে গুটিয়ে থাকা শিখেছি।
নয়নতারা পান মুখে দিয়ে বেড়ার গায়ে ঠেস দিয়ে বসে বলল, তোমার মতো কি আমি পারি? আমি হলাম। মেয়েমানুষ।
বিষ্ণুপদ নয়নতারার দিকে চেয়ে একটু হেসে বলে, আজকাল মেয়েরা কিছু কম পারছে নাকি? তোমাতে আমাতে তফাত করো কেন? তফাতটা কম বয়সে ছিল। বুড়ো হলে আর তফাতটাই বা কি?
নয়নতারা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, ও পাপের কথা, মেয়েমানুষে আর পুরুষমানুষে তফাত থাকবে না, তাই কি হয় গো?
বিষ্ণুপদ উঠোনে পড়ে থাকা শীতের রোদের দিকে চেয়ে থেকে বলে, তফাত আছে, প্রকৃতির তফাত। কিন্তু ক্ষমতার নয়।
ওসব কি আমি বুঝি! পুরুষমানুষ চালায়, মেয়েমানুষ চলে—এই তো দেখে আসছি চিরকাল।
তুমি আর দেখলে কতটুকু? ঘরে মুখ খুঁজে পড়ে আছো। আসল কথাটা আমার কি মনে হয় জানো? পুরুষমানুষের মধ্যে যা আছে, মেয়েমানুষের মধ্যে তা নেই। আবার মেয়েমানুষের মধ্যেও এমন কিছু আছে যা পুরুষের নেই। হরেন্দরে দুপক্ষই সমান। যিনি মানুষ তৈরি করেছেন তিনি তো আর আহাম্মক নন, একচোখোও নন। সমান সমানই দিয়েছেন দুজনকে, তবে রকমটা আলাদা।
তোমার সব অলক্ষুণে কথা।
আমি যেমনটা বুঝেছি বললাম। তবে কি জানো, মেয়েমানুষ যদি পুরুষের সঙ্গে গায়ের জোরে পাল্লা দেয় বা পুরুষের যা জন্মগত গুণ সেইটে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, তাহলে তো হেরেই যাবে। আবার মেয়েমানুষের যা বিশেষ গুণ সেখানে পুরুষ ভেড়া। বুঝলে? সৃষ্টিকর্তা দুজনকে দুরকমভাবে গড়েছেন– এইটে বুঝতে লাগবে। নইলে হবে না। তাই বলছিলাম, তোমার সঙ্গে আমার যা তফাত সেটা প্রকৃতিগত।
ও বাবা, ওসব বুঝে আমার কাজ নেই। এ জন্মে আমার যা বুঝ হয়েছে তাই নিয়েই কাটিয়ে যাই।
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলে, পরের জন্মে যদি আমেরিকায় মেম হয়ে জন্মাও তখন কি হবে?
ও বাবা! ওসব খারাপ কথা বলছো যে! তোমার মুখের কথা ভীষণ ফলে যায়, তা জানো?
কেন, আমি কোন বাকসিদ্ধাইটা?
আছো একটু। দেখেছি তো, যা বলো তাই হয়।
তাহলে এটাও হোক।
নয়নতারা হেসে ফেলল, বাব্বা, রক্ষে করো, ফ্ৰক পরে, গা দেখিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারব না মরে গেলেও। কথা ফিরিয়ে নাও বলছি।
বিষ্ণুপদ খুব মজার হাসি হেসে বলে, খারাপ কি? তুমি মেম হয়ে জন্মালে আমিও না হয় সাহেব হয়ে জন্মাবো।
নয়নতারা চোখ কপালে তুলে বলে, তোমারও জন্মানোর দরকার নেই বাপু। গরুট খায় ওরা। কত অনাচার করে।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, তা বললে চলবে কেন? সাহেবরা যদি খারাপই হবে তবে দুনিয়াটা চালাচ্ছে কি করে?
আমার দুনিয়ার খবরে কাজ নেই বাপু।
বিষ্ণুপদ খুব হাসল। মাথা নেড়ে বলল, কাজ নেই বললেই হয়? তোমার বড় ছেলে সারা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে, তুমি তার মা হয়ে একটু ভূগোল না জানলে লোকে বলবে কি?
নয়নতারা হেসে ফেলে বলে, এই বুড়ো বয়সে কি আমার ওপর মাস্টারি করবে নাকি? ভূগোল শিখে এখন আর কী হবে?
দুনিয়ার হালচাল একটু জানা ভাল। চাল ডাল তেল নুন ছেলেমেয়ে স্বামী এসব নিয়ে তো কম ভাবো না। আর একটু বড় করে ভাবলে দেখো ভালই লাগবে।
নয়নতারা একটু দোক্তাপাতা ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বলে, এই চিন্তাতেই বলে সময় পাই না। বামা আর রেমোতে কেমন লেগে যাচ্ছে দেখছো তো! কুরুক্ষেত্র হবে এইবার। ভয়ে মরি।
বিষ্ণুপদ হাসি-হাসি মুখ করে বলে, সেইজন্যই তো কচ্ছপের মতো হতে বলি।
তুমি পারো। আমি পারি না। বাড়ি ভাগ বাটোয়ারা হবে, তবে তার আগেই কিরকম লেগে যাচ্ছে দুভাইয়ে। বামা তো বোজ আমাকে ঘর ছেড়ে দিতে বলছে।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, আমাকেও বলছে। ভাগের কাগজপত্র তৈরি হবে, আদালতে যাবে, তারপর তো! তাছাড়া বামা ভুলেই যাচ্ছে যে, বাড়ি জমি আমার নামে, আর আমি এখন বেঁচে আছি। বামাকে নিয়ে ওইটেই মুশকিল। ওর তর সয় না।
নয়নতারা একটু চারদিকে চেয়ে দেখে নিল। রামজীবন বা বামাচরণ বাড়িতে নেই। বউরা যে যার নিজের ঘরে। গোপালকে নিয়ে পটল গেছে খেলতে। পটলের বইখাতা এখনও বিষ্ণুপদর সামনে পাতা মাদুরে ছড়ানো। নয়নতারা হামাগুড়ি দিয়ে একটু কাছে এসে বল। তামাকপাতার হেঁচকি তুলে বলল, আর জন্মে সাহেবদের দেশেই জন্মবো দুজনে চলে। যদি তাতে একটু শান্তি পাই।
বিষ্ণুপদ হাসিমুখে বলে, শান্তি কি ভাল জিনিস?
নয়নতারা অবাক হয়ে বলে, নয়?
সবসময় নয়। শান্তিতে থাকলে মানুষের চনমনে টগবগে ভাবটা থাকে না। পান্তা ভাতের মতো হয়। এই যে সংসারে নানা উপসর্গ নিয়ে আছো, এসবও জীবনের ঝাল-নুন। সবই দরকার হয়। সাহেবরাও যে শান্তিতে থাকে এমন নয়। ও জিনিস দুনিয়ার কোথাও নেই।
ভয় কি জানো? এরপর বামা না আমাদের জোর করে ঘর থেকে বের করে। তাহলে রেমোর সঙ্গে ওর লাগবে। রেমো তো ঘরখানা শেষ করতে পারল না। আমাদের রাখবেই বা কোথায়?
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, ওসব নিয়ে ভেবো না।
সবসময়ে যে মাথায় দুশ্চিন্তা, ভাবতে ভাবতে মাথাটা এমন করতে থাকে।
বিষ্ণুপদ নিচু হয়ে খুঁজে পটলের ভূগোল বই আর অ্যাটলাস তুলে নিয়ে বলল, কৃষ্ণ কোথায় আছে এখন জানো?
