আসুন সুব্রতদা।
তুমিই হেমাঙ্গ নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম কোনও চাষীর বাড়িতে ভুল করে ঢুকে পড়ছি।
চাষীই তো! চাষী হওয়ারই চেষ্টা করছি।
সুব্রত ঘরে ঢুকতে চাইল না। বলল, তোমরা ভিতরে গিয়ে একটু কথা বলে নাও। আমি বাইরে বসছি।
হেমাঙ্গর বুকটা কাঁপছিলই। কাপন দ্রুততর হল মাত্র। রশ্মিকে নিয়ে ঘরে ঢুকে সে অপ্ৰতিভ বোধ করতে লাগল। একটা প্রত্যাশা জাগছিল মনে। হয়তো–
রশ্মি মৃদু স্বরে বলল, কাল চলে যাচ্ছি। তোমার সঙ্গে দেখা করে যেতে এলাম।
বোসো রশ্মি। একটু বোস।
রশ্মি বসল। বলল, তোমার বাড়িতে ফোন বেজে যায়, কেউ ধরে না। চারুদি বললেন, তুমি কলকাতায় যাচ্ছোই না আজকাল। শুনে ভীষণ খারাপ লাগল।
তাই এলে?
আর দেখা হবে কি না কে জানে? আমি জানতে এলাম, এরকম করছে কেন? কী হয়েছে তোমার?
স্পষ্ট করে বলব?
কেন বলবে না?
আমার কেবল মনে হচ্ছে, তোমার প্রতি বড় অন্যায় করেছি।
রশ্মি হাসল, একটু ফ্যাকাশে হাসি। মৃদুস্বরে বলল, আমি তা মনে করি না।
তোমাকে আমি অজান্তে অপমানও করেছি হয়তো।
এসব ভেবেই সন্ন্যাস নেওয়ার চেষ্টা করছো?
না রশ্মি তোমাকে ভুলতে পারছি না। কেবল মনে হচ্ছে, ভুল করলাম।
শোনো, ভুল করলে তার সংশোধনের উপায় আছে। ইচ্ছে করলেই তুমি সাতদিনের মধ্যে ইংল্যান্ডে গিয়ে হাজির হতে পারো। তাই না?
গেলে তুমি খুশি হবে?
হবো না। কিন্তু সেটা করার আগে একটু ভেবো। তুমি ভীষণ ভদ্রলোক, তাই তোমার কেবল মনে হচ্ছে আমার প্রতি অন্যায় করেছে! তা তো নয়। অকপট হওয়াই তো ভাল।
হেমাঙ্গ লজ্জায় রশ্মির মুখের দিকে তাকাতে পারল না। নতমুখ হয়ে বলল, আমার একটা আত্মগ্লানি হচ্ছে। আমি তোমাকে ভালবাসি রশ্মি।
আমি জানি। কিন্তু এরকমভাবে নিজেকে শাস্তি দিচ্ছে কেন? তোমার আপনজনদেরও কষ্ট দিচ্ছে। আমাকেও।
হেমাঙ্গ মৃদু হেসে বলে, এখনও অ্যাডাল্ট হইনি যে!
সেটা বুঝতে পারছি। তুমি এরকম করলে আমারও খুব মনটা খারাপ লাগবে। এমনিতেই লাগছে।
বিয়েটা হচ্ছে না বলে তোমার বাড়িতেও নিশ্চয়ই কথা হচ্ছে।
আমার বাড়িতে কেউ অবুঝ নয়। প্রবলেমটা সবাই বুঝতে পারছে, তাই সিচুয়েশনটা মেনে নিয়েছে। যদিও তোমাকে সকলেরই খুব পছন্দ ছিল। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল বাধাগুলোকে তো অস্বীকার করা যাবে না।
হঠাৎ হেমাঙ্গ একটু ঝুঁকে রশ্মির একখানা হাত স্পর্শ করে বলল কেন যাচ্ছে রশ্মি? কেন যাচ্ছে? আরও বড় হয়ে কী করবে।
রশ্মির চোখ দুটো এ-কথায় ছলছল করে উঠল। সামান্য বিষাদ-মাখা গলায় বলল, আমি কিভাবে বড় হয়েছি তা তো তুমি জানো। আমার ধারটাই যে অন্যরকম। কাজ আর পড়াশুনো ছাড়া আমার কাছে অন্য সবকিছুই আনইস্পটেন্ট। তুমি বিশ্বাস করবে না আজ অবধি তুমি ছাড়া আমার জীবনে কোনও পুরুষই ওয়েলকাম ছিল না। দো দেয়ার ওয়্যার অফারস অ্যান্ড সোপোজাল। কিন্তু ভেবে দেখেছি, এটা আমি সয়ে নিতে পারব। কোনও অসুবিধে হবে না। তুমিও এরকম ভেঙে পড়ে না। বলছি তো, যদি তোমার মন বদলায়, সত্যিকারের বদলায়, তাহলে চলে যেও।
হেমাঙ্গ করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে রশ্মির দিকে।
রশ্মি মৃদু গলায় বলল, এবার ওঠো! আমি তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। কলকাতায়।
যাবো! কিন্তু ইচ্ছে করছে না যে!
প্লিজ। কাল এয়ারপোর্টে আমাকে সি-অফ করতে হবে। আমি তোমার হাসিমুখ দেখে চলে যেতে চাই।
হেমাঙ্গ তবু ঝুম হয়ে বসে রইল।
একটু গলা খাঁকারি দিয়ে সুব্রত ঘরে এল। বলল, চলো হেমাঙ্গ! তোমার চারুদি দিনরাত তোমার কথা বলছে ইন ফ্যাক্ট সে-ও খুব আপসেট।
কেন?
তোমাদের ঘটকালি তো চারুই করেছিল। চলো।
চারুদির কোনও দোষ নেই।
সেটা তাকে তুমিই বুঝিয়ে বলো। বিডন স্ট্রীটেও খুব ঝামেলা হচ্ছে। তোমার ওল্প ম্যান আর ওন্ড লেডি দুজনেই খুব আপসেট। তাদের ধারণা, তোমার আইবুড়ো অপমান আর ঘুচবে না।
যেতেই হবে?
রশ্মি বলল, হ্যাঁ। একা থাকছো বলেই তোমার মন ভার হয়ে থাকছে। নরম্যাল জীবনে ফিরলেই দেখবে, সব ঠিক, হবে যাবে। ওঠো। আজ ওয়েদার ভাল নয়। আমরা তাড়াতাড়ি ফিরব।
একটা কথা জিজ্ঞেস করবো রশ্মি?
বলো।
তুমি নিজের গরজে এসেছে, না চারুদি পাঠিয়েছে?
রশ্মি অবাক হয়ে বলে, কেন বলো তো!
এমনি।
কোনটা শুনলে খুশি হবে?
যেটা সত্যি, সেটা।
রশ্মি একটু হাসল। বলল, বড্ড সেন্টিমেন্টাল হয়েছে তো তুমি! সত্যি কথা হল, চারুদির কাছে শুনে আমি নিজেই এসেছি। চারুদি বরং আসতে বারণ করেছিল। বিশ্বাস হল?
একটা গভীর স্বস্তির শ্বাস ফেলে হেমাঙ্গ বলল, হল। মন থেকে একটা ভার নেমে গেল।
সেটাই বা কেন?
তুমি নিজের টানে এসেছে, এটা কত ভাল লাগবে ভাবতে। তাই না, বলো!
তবে কি ভেবেছিলে টান সব ছিঁড়ে ফেলেছি।
তোমার কথা দিনরাত ভাবছি, তুমিও যে একটু ভাবো এটা জেনে এত ভাল লাগছে!
একটু! কী অদ্ভুত লোক তুমি বলো তো!
এই সময়ে সুব্রত নিঃশব্দে ফের বাইরে গেল।
রশ্মি বলল, তোমার কথা ছাড়া কিছুই ভাবিনি কদিন। অন্তত বিশ বার ফোন করেছি। হাতে সময় থাকলে আরও কয়েকদিন আগেই চলে আসতাম। আজও কত কাজ ফেলে এসেছি।
হেমাঙ্গ উঠল। চারদিকে চেয়ে বলল, আমার কিছু গোছানোর নেই। শুধু পোশাকটা পাল্টানো দরকার। লুঙ্গি পরে তো যাওয়া যায় না।
রশ্মি একটু হেসে উঠে বাইরে গেল।
খুব ধীরে ধীরে পোশাক বদলায় হেমাঙ্গ। যদি এই পোশাক বদলের মতো মনটাকেও বদলে ফেলা যেত।
ভটভটিতে রশ্মির কাছাকাছি বসে রইল সে। কিন্তু কথা আসছিল না। কথা হারিয়ে বসে আছে সে। মেঘলা ময়লা আকাশের নিচে ম্লান চরাচর, জল আর ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস। এ সবের মধ্যে একটা শীতল সমাপ্তির আভাস রয়েছে।
