জিজ্ঞেস করতে লজ্জা হয়। তবু বলি, ব্যাপারটা কেঁচিয়ে দিলেন কেন? মেয়েটা দেখতে তো পরীর মতো। তার ওপর কত লেখাপড়া জানে। অবশ্য আমাদের মতো গেরস্তর ঘরে ওসব মেয়ে অচল। কিন্তু আপনার তো তা নয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হেমাঙ্গ বলল, ঠিকই বলেছে। বড় ভাল মেয়ে। অত ভাল আমার সইল না।
তাই ঘরে বসে বসে কেবল বড় বড় শ্বাস ছাড়ছেন। আপনার মতো ছেলের কি মেয়ের অভাব হবে?
তা নয় বাঁকা, মনটা খারাপ।
এখন উটুন তো। চলুন একটু ঘুরেটুরে আসবেন।
আমার যে একটু চুপচাপ থাকতে ইচ্ছে করছে! নড়তে চড়তে ভালই লাগছে না।
পাগল নাকি? শরীর বসিয়ে রাখলে নানা আধিব্যাধি হয়। মনটাও একটু ফুর্তিতে রাখা দরকার।
কোথায় যাবো?
চলুন আজ গোসাবার দিকে যাওয়া যাক। একটা মোচ্ছব আছে। কীৰ্তন-টির্তন হবে। বড় গানাদাররা আসছে।
হইচই ভাল লাগবে না বাকা! বরং জঙ্গলের দিকে যাই চলো।
তাই চলুন।
গেল হেমাঙ্গ, নৌকোয় করে নদী আর খাল ধরে বিস্তর ঘুরল। বাঘা-জঙ্গলের ধারেকাছেও ঘোরাফেরা হল। কিন্তু মনের মেঘ কাটল না। এত বিবৰ্ণ এত নিস্তেজ তার কখনও লাগেনি চারপাশটাকে। তবু এ জায়গা বলে রক্ষা। কলকাতা হলে সে পাগল হয়ে যাবে বোধহয়।
অনেক রাত অবধি বাঁকা আজ রইল তার কাছে। বেশি কথা বলল না। তবে একবার বলল, বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়।
হেমাঙ্গ জবাব দিল না। নদীর ঢেউ আর বাতাসের শব্দ শোনে। একঘেয়ে, একটানা, ছেদহীন। ধ্যানস্থের মতো বসে থাকে। রুজি-বোজগার, উন্নতি, সাফল্য, প্রতিষ্ঠা সব বৃথা মনে হয়। বেঁচে থাকাটাও কত দুর্ব, কত অর্থহীন।
বাবু, মেয়েটাকে কি আপনার খুব পছন্দ ছিল?
হেমাঙ্গ একটু হাসল, অপছন্দের কিছু আছে?
তবে হল না কেন?
সে অনেক কথা বাঁকা।
কথা বলে খোলসা হচ্ছেন না কেন? বাঁকা মিঞা তো পাঁচকান করবে না।
হেমাঙ্গ আবার একটু হাসল, তুমি সাদা লোক। কিন্তু দুষ্টবুদ্ধিতে কিছু কম নও। চারুদিকে খবর দিয়ে আনিয়েছিলে।
সে আপনার অবস্থা দেখে।.এখন তো অবস্থা আরও খারাপ দেখছি।
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, এ সমস্যার সমাধান বাইরের কেউ করতে পারবে না বাঁকা।
তা হলে আপনিই করুন না কেন?
কী করব?
একটা ভাল দেখে বিয়ে করে ফেলুন।
হেমাঙ্গ হাসিমুখে বাকার দিকে চেয়ে রইল। বাকার কোনও হৃদয়ঘটিত সমস্যা হয়নি কখনও। হবেও না। বাঁকা সব সমস্যার সহজ সমাধান করে ফেলতে পারে। হেমাঙ্গ পারে না। দুজনের এই ব্যবধানটাকে সে কিছুক্ষণ মেপে দেখতে চেষ্টা করল।
বাঁকাও তার দিকে চেয়ে ছিল। বলল, মেয়েমানুষ নিয়ে অত ভাববার কী আছে? আমরা তো অত ভাবিটাবি না।
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, তা নয় বাঁকা, মেয়েটার বোধহয় অপমান হল।
বাঁকা একটু শব্দ করেই হাসল, তাহলে বিয়েটা করলেই তো পারতেন। আপনি নিজেই তো গিট পাকিয়ে তুলছেন। সেইজন্যই তো ভাবনা।
তুমি বুঝবে না বাঁকা। আমার মনটা বড় খারাপ।
কাল রাতে একটা যাত্রা দেখতে যাবেন। নতুন দল। বনগাঁ থেকে এসেছে।
হেমাঙ্গ মাথা নাড়ল, ইচ্ছে করে না যে!
দেখুন না, ভালও লেগে যেতে পারে। কোরাকাঠিতে হচ্ছে। বেশী দূরও নয়। বিশ্ববিজয় অপেরার এখন বেশ নাম।
হেমাঙ্গ চুপ করে রইল। কোনও আমোদ-প্রমোদই তার ভাল লাগছে না। কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। এমনকি সকালের বেড়ানোটা পর্যন্ত ক্লান্তিকর মনে হয়।
বাঁকা চলে যাওয়ার পর অনেক রাত অবধি জানালার কাছে বসে রইল সে। অসহ্য শীত। জল-ছোঁয়া বাতাসে হাড় অবধি অবশ হয়ে যেতে চায়। তবু বসে রইল। ঘুম আসতে চায় না।
শশাওয়ার আগে তার হঠাৎ মনে হল, আজ কী বার? ঘরে কোনও ক্যালেন্ডার নেই। পত্রিকা আসে না। রেডিও বা টেলিভিশন নেই। অটোমেটিক ঘড়িটা হাতে দেয় না বলে বন্ধ হয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ ভাবল সে। আজ কী বার? কত তারিখ? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হল, কী হবে জেনে? একটা দিন গেল—এই মাত্র।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল মেঘলা আকাশের ছায়ায়। আজকের দিনটা ভাল যাবে না মনে হল হেমাঙ্গর। খুব হাওয়া দিচ্ছে। ভঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। শীত আরও বাড়বে। নিজে এক কাপ কফি করে নিয়ে ঘরে বসল হেমাঙ্গ। আজ কিছু করার নেই।
একটু বেলার দিকে দৃষ্টিটা রইল না। তবে মেঘলা ছাড়েনি। হেমাঙ্গ বাইরে বেরিয়ে দূরের আকাশের দিকে চেয়ে রইল। কাজের মেয়েটা কদিন আসছে না। জ্বরে পড়ে আছে। তাতে কোনও অসুবিধে নেই হেমাঙ্গর। সে ঘর ঝাঁট দেয় না। সামান্য কয়েকখানা বাসন নিজেই মেজে নেয়। বাঁকা মিঞা টের না পেলে না-বেঁধে এবং না-খেয়েও কেটে যায় এক-আধ বেলা।
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাটের দিকে চোখ নেমে এল তার। একখানা ভটভটি এসে ঘাটে লাগল। লোক নামছে। তাদের মধ্যে একজনকে দেখে চমকে উঠল সে। যার কথা আজকাল দিন-রাত ভাবে সে। ভেবে মন খারাপ হয়। সে-ই। পিছনে চারুশীলার বর সুব্ৰত।
খুব আস্তে আস্তে উঠে এল রশ্মি। একটু রোগা হয়েছে কি? একটু উসকোখুসকো?
ফটকের কাছে এগিয়ে দাঁড়াল হেমাঙ্গ। বুকটা থরধর করছে। হতাশা আর বিহ্বলতায় নিজের বশে থাকছে না সে।
ঘাট থেকে ওপরে উঠে ডানদিকে তার বাড়িমুখো মোড় নিতেই একটু দূর থেকেই তাকে দেখতে পেল রশ্মি। একটু হাস। হাসিটা কি খুব বিষয় অন্তত প্রাণহীন।
ফটকটা খুলে দিয়ে হেমাঙ্গ বলল, এসো।
কী চেহারা হয়েছে তোমার! চেনাই যায় না যে!
দাড়িটা কাটছি না।
চুলও আঁচড়াও না বোধহয়! বাবরি রাখছে?
একটু তফাতে সুব্রত। ধীরে হাঁটছে। তাদের একটু সুযোগ দিতে চাইছে হয়তো।
