বিচ্ছেদটা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না হেমাঙ্গ। সে রশিকে প্রত্যাখ্যান করেনি। সেই সাধ্যই ছিল না তার। সে প্রত্যাখ্যান করেছিল স্থায়ী বিলাত-বাসকে। রশ্মিকে বলেছিল, আমি পারব না রশ্মি। আমি বড় হোম-সিক, এই দেশে, এই কলকাতায় আমার বড় মায়া। আমি পারব না।
রশি নরম প্রকৃতির মেয়ে, কিন্তু ভাবপ্রবণ নয়, তার আবেগও তাই বেশি নয়। একটু ভেবে বলেছিল, আমি তা জানি হেমাঙ্গ। মানুকে ট্রানপ্ল্যান্ট করা বেশ কঠিন, যদি তার নস্টালজিয়া স্ট্রং হয়। আমি হয়তো স্বাৰ্থপরের মতো তোমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। যাকগে।
হেমাঙ্গ অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করেছে, তাহলে?
রশ্মি একটু সাদা, একটু উদ্ভ্রান্ত মুখে বলেছিল, তুমি ভেবো না, আমি এটা সয়ে নেবো।
আমি কি তোমাকে অপমান করছি রশ্মি? আমি-আমি সত্যিই তোমাকে এত ভালবাসি, থাকতেই পারব না।
রশ্মি কিছুক্ষণ তার বিষাদমাখা মুখখানা আকাশের দিকে তুলে রেখেছিল। নৌকো দুলছিল। ঢেউ ভাঙার গভীর শব্দ হচ্ছিল নৌকোর গায়ে। রশ্মি চোখ নামিয়ে বলেছিল, আমাকে তুমি এ দেশে থাকতে বলছো?
প্লিজ, রশ্মি! প্লিজ! থাকো।
রশ্মি দাঁতে ঠোঁট চেপে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, দেখ হেমাঙ্গ, শুধু বিয়ের জন্য যদি থাকি সেটা আমাকে আর তোমাকে পরে যন্ত্রণা দেবে। কোনও সময় হয়তো মনে হবে, আমরা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমার এখনও অনেক কাজ পড়ে আছে ওখানে। এ দেশে কিছু হওয়ার নয়, তুমিও তো জানো।
খানিকটা জানি। কিন্তু কেন তুমি ফিরে আসবে না।
ফিরে আসব না, বলিনি। কিন্তু ততদিনে হয়তো বয়স থাকবে না, মনটা অন্যরকম হয়ে যাবে। বাঁধাবধির দরকার কি বলো? মা-বাবা এবার চেয়েছিলেন আমি বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে বিলেত যাই। সেটা সম্ভব হত, তুমি রাজি থাকলে। তুমি যেতে চাইলে না, আমাকে একাই যেতে হবে কিন্তু তোমাকে কেন কতগুলো কডিশনে বেঁধে যাবো? সহ্য করা কঠিন হবে, কিন্তু তবু কন্ডিশন না থাকাই ভাল।
কেন ভাল?
রশ্মি খুব গম্ভীর মুখ করে বলল, এটা তো সেই আগের যুগ নয়, হৃদয়ের ব্যাপারটা নিয়ে যখন বাড়াবাড়ি হত। এখন আরও কত দিক আছে জীবনের।
যদি আমি অপেক্ষা করি? কেন করবে?
তুমি রাগ করছো রশি?
রশ্মি মাথা নেড়ে বলে, রাগ নয়, অভিমান নয়, অপমানও নয়। আমার বরং একটু একা লাগছে! তুমি কেন যেতে চাও না, তা আমি বুঝেছি। আমি ইকনসিডারেট নই।
শোনো রশ্মি, আমার বিয়ে করার কোনও ইচ্ছেই ছিল না। তোমাকে দেখে সেটা হয়েছিল। কিন্তু আর নয়। এবার আমি একাই থাকব। অপেক্ষা করব।
রশ্মি একটু চুপ করে থেকে বলল, নিজেকে মুক্ত রাখো হেমাঙ্গ! ওরকম শর্ত নিয়ে থেকে না। আমরা অ্যাডোলেসেন্সএর সময়টা পার হয়ে এসেছি! তাই না?
হেমাঙ্গ চুপ করে থাকে।
রশ্মি খুব নরম করে বলে, এ-দেশে কেউই কেন যে সময়মতো অ্যাডাল্ট হয় না, বহুদিন অবধি ছেলেমানুষ থেকে যায়! তুমিও ছেলেমানুষ।
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলে, তা নয় রশ্মি। আমি হয়তো একটু আবেগপ্রবণ। কিন্তু তোমাকে যে মনেপ্রাণে চাই।
রশ্মি তার দিকে একটু মায়াভরে চেয়ে থেকে বলেছে, আমিও তো তোমাকে চাই। কিন্তু আমি অন্য সব ব্যাপারগুলোকেও উপেক্ষা করতে পারি না। সেন্টিমেন্টাল হলে কি লাভ বলে। বিয়ের পরই পুরুষ আর মহিলাদের প্রেম একটু একটু করে নেমে আসে। দেখছে না, জোয়ারের জল সরে গেলে কেমন থিক থিক করে কাদা।
যাঃ, কী বিচ্ছিরি উপমা।
রশ্মি হাসল না, গম্ভীর মুখেই বলল, বিয়ের পর হয়তো আমাদের নানারকম ক্যালকুলেশন আসত। তার চেয়ে বরং লেট আস কুইট অ্যাজ ফ্রেন্ডস্।
যেরকম সাহেবদের দেশে হয়?
সাহেবরা খারাপ লোক নয় হেমাঙ্গ। অনেক প্র্যাকটিক্যাল যে।
এইভাবেই এক দেশী নৌকোয় দোল খেতে খেতে মাঝদরিয়ায় তাদের সম্পর্ক শেষ হল।
আবার হল না। হেমাঙ্গর কোনও কাজে মন নেই। পার্টনারদের হাতে অফিস ছেড়ে দিয়ে সে এই শীতে চলে গেল। রানিক্ষেত। সেখানে চুপচাপ হোটলে বসে রইল কিছুদিন। তাতে শান্ত হল না। ফিরে এল।
কিন্তু নদীর ধারের কুটিরটি তাকে আকর্ষণ করতে লাগল ভীষণভাবে। টানা প্রায় একমাস হেমাঙ্গ রয়েছে এখানে। ঘুরে বেড়ায়, নৌকোয় চেপে বেড়িয়ে পড়ে, বইয়ে ড়ুব দিয়ে বসে থাকে। কেউ তার যোজ করে না। সে বাড়িতে জানিয়েই এসেছে।
বাঁকা মিঞা রোজ হাজিরা দেয়। টেনে নিয়ে গিয়ে মাঝে মাঝে দাওয়াত খাওয়ায়।
হেমাঙ্গর কাছে পৃথিবীটা অনেকটাই বিবর্ণ এবং জীবন অর্থহীন হয়ে গেছে। সেটা প্রেমের চেয়েও বেশি পাপবোধে। সে কি আঘাত করল রশ্মিকে? সে কি ভুল করল ওর প্রস্তাবে রাজি না হয়ে?
আজকাল নিজের বিছানায় একটানা অনেকক্ষণ ধ্যানন্থের মতো বসে থাকে সে। বাইরেটা স্থির, কিন্তু মনের মধ্যে ঝড়ের বাতাস বয়ে যায়।
বাঁকা মিঞা এক সকালে এসে তাকে ধরল, কী হয়েছে বলুন তো? না বললে ছাড়ছি না। আমার তো ভয় হচ্ছে, মনে কথা চেপে রাখতে রাখতে আপনি না পাগল হয়ে যান।
হেমাঙ্গ একটু হেসে বলে, পাগল বলেই ধরে নাও না কেন?
ধরে নিলেই হল নাকি? আমরা চাষাভুষো যাই হই, তবু অনেকটা পথ তো পার হয়েছি জীবনে। বোকা নই। একটু খুলে বলুন তো। খুন-খারাপি তো করে আসেননি। ব্যাপারটা কী?
এক রকম খুনই।
এই তো হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে।
হেঁয়ালি একটু রাখতে হচ্ছে। সব কথা খুলে বলা যায় না।
বাঁকা মিঞা একটু লজ্জা-লজ্জা ভাব করে বলে, সেই বিয়ের ব্যাপারটা নাকি?
হেমাঙ্গ মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
