অনীশ দেবী চৌধুরানী পড়েনি। বইটার নাম অবশ্য শুনেছে। সে লজ্জা পেল। আপাকে ঘিরে এক গাদা ছেলেমেয়ে দাঁড়ানো। তাদের যেন কী একটা বোঝাচ্ছি আপা। সবাই আপার কথা মন দিয়ে শুনছিল। পাগলী আপার কথা যতই অসম্ভব হোক, সবাই শোনে। এমন কি মিসরা পর্যন্ত।
বুবকা বলল, বাবা তোমাকে সাপোর্ট করেছে, জানো তো!
কাকাবাবু সমঝদার মানুষ, তোমার মতো নয়।
ইট সিমস্ সো। এমন কি, বাবা তোমার গ্রুপে নামও লেখাতে চেয়েছে। হি ওয়ান্টস টু জয়েন ইওর গ্রুপ অফ থাগস্।
আপা হাসল, কাকাবাবু খুব ভাল লোক বলো, আমি তাঁর নাম টুকে নিয়েছি।
ছুটির পর আজ আপার সঙ্গেই বেরলো বুবকা। আর কেউ ছিল না সঙ্গে।
বুবকা বলল, তুমি কোথায় থামবে আপা? ইউ আর লিডিং এ ডেনজারাস সাইফ।
আমার বাঁধা জীবনে বিশ্বাস নেই অনীশ। আমি ওরকম ভাবে বেঁচে থাকতেও পারব না। তা বলে ভেবো না আমি। হিংস্রতা পছন্দ করি বা মারধর খেতে ভালবাসি।
তুমি একটি রোগা দুৰ্বল মেয়ে। তুমি ঠিক বিপদে পড়বে।
বোকারাম, দুর্বল আর রোগা আর মেয়ে এই তিনটে কোনও শর্তই নয়। জোর কি শুধু গায়ের? এই যে অভিজিৎ বা অরোরা, ওদের গায়ে তো অনেক জোর। তা বলে কি ওরা সবাইকে হারিয়ে দিতে পারবে? না কি পারবে সমাজব্যবস্থা পাল্টে দিতে? মনের জোরই হল আসল জোর। আমি তো শরীরের শক্তির ওপর ভরসা করিনি।
বুবকা বিবৰ্ণ মুখে বলল, আই অ্যাডমিট দ্যাট। তোমার খুব সাহস। কিন্তু ইউ আর লিভিং এ ডেনজারাস লাইফ আপা। কেউ কেউ তোমার ওপর রেগে যাচ্ছে নিশ্চয়ই।
আমি জানি। আমার যেমন অনেক শক্ৰ আছে, তেমন আবার অনেক বন্ধুও আছে।
বন্ধুরা কি তোমাকে সবসময়ে বাঁচাতে পারবে?
আপা অবাক হয়ে বলে, বাঁচাবে! বাঁচাবে কি করে, তারা তো সবসময়ে আমার সঙ্গে থাকে না। বাঁচানোর দরকারই নেই। আমি যা করতে চাইছি সেটা তারা বুঝতে পারলে আর সমর্থন করলেই যথেষ্ট।
তুমি এই বয়সে এত পাকা হলে কি করে?
আপা হাসল। বলল, আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর। মনে আছে?
বুবকা অবাক হয়ে বলে, তোমারও মনে আছে?
তোমার আঠারো বছর বয়স পেরিয়ে গেল অনীশ, কিন্তু তুমি তো ভয়ংকর হতে পারলে না! কাকাবাবু মিথ্যেই চিন্তা করলেন।
ভয়ংকর হব আপা? সেটা কিভাবে হওয়া যায়? আমি তো পোয়েট্রিটা কখনও পড়িনি।
কেন পড়নি?
কোথায় পাব?
আপা হাসল, থাকগে, তোমার ওসব পড়ার দরকার নেই।
তার মানে আমাকে তুমি পাত্তাই দিচ্ছ না?
আপা হাসল। বলল, হি-ম্যান-এর মতো চেহারা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে আর পরীক্ষায় গাদা গাদা নম্বর পেলেই কি পাত্তা পাওয়া যায়? তোমার গায়ে কতটা জোর বা লেখাপড়ায় তুমি কতটা ভাল তা নিয়ে দুনিয়ার মানুষের তো মাথাব্যথা নেই।
তা হলে কী করব? ভয়ংকর কিভাবে হওয়া যায়?
তোমাকে কেউ ভয়ংকর হতে তো বলেনি। বলেছে, আঠারো বছর বয়সটাই ভয়ংকর। এই বয়সে এসে মানুষ সব কিছু ভাঙচুর তছনছ করে দেয়। এই বয়সে যুবক-যুবতীদের বাঁধ ভাঙার সময়।
আমি ওসব একদম বুঝি না আপা।
অথচ কবিতাটা তোমাকে এক সময়ে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল।
বুবকা একটু হাসল, কবিতাটা আমাকে একবার পড়াবে?
পড়াব। এখন বাড়ি যাও, ভাল ছেলে।
শেষ কথাটা বোধ হয় অপমান। আপা তাকে মাঝে মাঝে মৃদু অপমান করে। করতেই পারে। বুবকা এখনও কত কী জানে না, কত কিছুর খবর রাখে না। এমন কি দক্ষিণ ভারতীয় আপার কাছে বাংলা নলেজেও সে কত পিছিয়ে আছে।
সন্ধেবেলা আজ মাকে বাড়িতে একা পেল বুকা। বাবা ফেরেনি। দিদি বা অনুও নেই।
খাওয়ার টেবিলে বসে পায়েস দিয়ে লুচি খেতে খেতে বুবকা বলল, আচ্ছা মা, তোমরা আমাকে অ্যাডাল্ট হতে দিচ্ছ না কেন বলো তো!
অপর্ণা একটু অবাক হয়ে বলে, ও মা! সে কি কথা?
কথাটা কি ঠিক নয়?
তোকে অ্যাডাল্ট হতে দেব না কেন?
তোমরা যে আমার ওপর অনেক রেস্ট্রিকশন চাপাও, এটা করি না, ওটা করি না, এর সঙ্গে মিশিস না।
আহা, ছেলের ভালোর জন্য সব মা-বাবাই বলে। তাতে তোর অ্যাডাল্ট হওয়া আটকাচ্ছে কিসে?
আপাকে তার বাড়ি থেকে অনেক ফ্রিডম দেয়, তা জানো?
আপা! ওই তোদর সকলের মাথাটা খাচ্ছে। এবার আসুক, খুব বকব। কী বলছে আপা এখন শুনি।
শুনলে তুমি রেগে যাবে।
তবু শুনব।
আচ্ছা মা, আমি তো কখনও দুষ্ট ছেলে ছিলাম না, না? না।
দুষ্ট কেন হতে যাবি?
আমি খুব ভাল ছেলে?
অপর্ণা হাসল, ভালই তো। খুব ভাল।
কেন আমি ভাল ছেলে মা? কেন দুষ্ট নই?
এসব আজ কী বলছিল? কী পোকা ঢুকেছে মাথায়?
ভাল ছেলেগুলো ভীষণ ভ্যাতভ্যাত টাইপের হয়, না মা?
কে বলল ও কথা?
ভাল ছেলেরা খুব আন-ইন্টারেস্টিংও।
তোকে বলেছে!
দেখ মা, সেই ছোট্টো বেলা থেকে আমি ভীষণ শান্ত, সব কথা শুনে চলি, পড়াশুনো করি, ভাল নম্বর পাই, জিনিসপত্র ভাঙি না, মারপিট করি না। সব সময়ে গুড বুক-এ আছি।
ডানপিটে হওয়া কি খুব ভাল নাকি? তোর বাবা অবশ্য খুব ডানপিটে ছিল। খুব সাহসীও। বিয়ের পরও মারপিট করেছে।
ওয়াজ হি ইন্টারেস্টিং?
অপর্ণার চোখে একটু রোমান্টিক ছায়া পড়ল। সামান্য হাসল সে বলল, সবাই কি একই রকম হবে?
আমি বাবার মতো হলে কেমন হত?
তুই তোর মতো হয়েছিস।
বুকা মাথা নেড়ে বলে, না মা, আই অ্যাম নট হ্যাপি উইথ মিসেলফ। আমার নিজেকে ভাল লাগছে না। একদম ভাল সাগছে না।
০৬৭. হেমাঙ্গর দাড়ি ক্ৰমে বেড়ে যাচ্ছে
হেমাঙ্গর দাড়ি ক্ৰমে বেড়ে যাচ্ছে। গোঁফের আড়ালে ঢেকে যাচ্ছে ঠোঁট। মুখময় দাড়ির একটা রাগী ও সতেজ প্রকাশ। কিন্তু দাড়ি-গোঁফ কিছুই ঢাকতে পারে না হেমাঙ্গ। ঢাকা পড়ে না তার বিষাদ, তার নিঃসঙ্গতা। কাজটা কিরকম হল? হতে পারত। অথচ হল না। রশি আর কয়েকদিনের মধ্যেই চলে যাবে ইংলন্ডে। ভীষণ ব্যস্ত সে। এবার তার পাকাপাকি যাওয়া।
