যুগ পাল্টে গেছে আপা।
যুগ আবার পাল্টে দেওয়া যায়।
বুবকা বলল, তোমার নিরামিষ গুণ্ডার দলে আমি নেই আপা।
তোমাকে আমি আমার তালিকার বাইরেই রেখেছি বুবকা।
বুবকা হেসে ফেলল, তোমার কি লিস্ট তৈরি হয়ে গেছে?
আপা হাসল না। গম্ভীর হয়ে বলল, হচ্ছে।
কী করবে তারা? মারপিট?
দরকার হলে করবে। কিন্তু মারপিটের চেয়েও বড় কথা, দেশে যে সব অন্যায়, পাপ আর খারাপ ঘটনা ঘটছে তার একটা ছক আছে। ইংরজিতে যাকে বলে প্যাটার্ন।
ইউ মিন নকশা?
হ্যাঁ। এই নকশাটাকে ধরাই সবচেয়ে বেশী দরকার। মানুষ তো যা খুশি করছে। কেন করছে তা না জানলে কিছু করা যাবে না। এই যে গোপালের কথা বললাম, এ কোন সাহসে এরকম কাজ করল। এর পিছনেও একটা নকশা আছে। ও জানে, এরকম একটা অন্যায় করলেও কিছু হবে না। ওর বউ কয়েক দিন কান্নাকাটি করবে, দু-চার দিন হয়তো ওকে একটু বকাঝকা করবে। তারপর মেনে নেবে। তাই না?
বুবকা গম্ভীর হয়ে বলে,এটা হল একটা পারমিসিডনেস। তুমি এটাকে আটকাতেও পারবে না।
আপার ক্লাসেও কি ওরকম হয় না? কত ডিভোর্স হচ্ছে।
সেটা হোক। কিন্তু বউটার মাসোহারা গোপালের কাছ থেকে আদায় করে দাও তা হলে। উঁচু সমাজে বিবাহ-বিচ্ছেদ হলে মাসোহারার ব্যবস্থা থাকে।
বুবকা মাথা নেড়ে বলে, তুমি বেসরকারি গোয়েন্দা আর সৈন্যবাহিনী গড়তে চাইছ কেন? ওকে পুলিশে ধরিয়ে দাও।
চেষ্টা করেছি। হয়নি। আইনে অনেক ফাঁক থাকে অনীশ। সেই ফাঁক দিয়ে অপরাধীরা গলে যায়। তুমি কি জানো শতকরা সত্তর-আশিটা রেপ কেস-এ আসামীর কোনও সাজা হয় না?
আমি অত জানি না।
আমি জানি। পুলিশ কেস সাজায় না, সাক্ষীরা ঠিকমতো সাক্ষী দেয় না, আরও নানারকম ব্যাপার আছে। আইনের ফাঁক দিয়ে যেসব অপরাধী বেরিয়ে আসবে আমার গুপ্তারা তাকেও ধরবে।
ধরে কি করবে আপা?
তাকে দিয়ে অপরাধ কবুল করাবে, ক্ষতিপূরণ আদায় করবে, কৃতকর্মের জন্য তাকে অনুতপ্ত হতেই হবে।
তুমি একটা প্যারালাল গভর্নমেন্ট তৈরি করতে চাও?
ঠিক তাই চাই।
বুবকা আর অভিজিৎ হাসল।
অভিজিৎ বলল, আইডিয়া ইজ গুড।
বুবকা বলে, বাট ইমপ্র্যাক্টিকেব। আপা রবিন হুড হতে চাইছে।
অভিজিৎ বলে, চম্বলের ডাকাতরাও নাকি এরকম সব কী করত। কমন পিপল লাইকড্ দেম।
আপা বিরক্তির সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, ডাকাতের কথা উঠছে কেন?
প্ল্যানটা অনেকটা ওরকম বলেই।
তোমরা আমাকে সমর্থন করছে না তা হলে?
অভিজিৎ বলে, করছি।
বুবকা মাথা নেড়ে বলে, আমি করছি না।
টিফিন শেষ হওয়ায় ক্লাসে ফিরে যেতে হল তাদের। কিন্তু বুকার মাথায় সারাক্ষণ আপার অভুত প্ল্যানটা ঘুরতে লাগল। আপা গুণ্ডাবাহিনী তৈরি করতে চায়, এটা কোনও অদ্ভুত কল্পনা নয়। আপা হয়তো ওরকম কিছু একটা করবে।
রাত্রিবেলা সে তার সবচেয়ে প্রিয় ও বিশ্বস্ত বন্ধু তার বাবাকে কথাটা বলে ফেলল, জানো বাবা, আপা একটা গুণ্ডার দল তৈরি করছে।
গুণ্ডার দল! বলিস কী?
এরা সব ড়ু-গুডার গুণ্ডা। সোস্যাল ইনজাসটিস আর করাপশনের এগেনস্টে লড়বে। শী ইজ অলরেডি ডুয়িং ইট। রিক্রুটমেন্ট শুরু হয়ে গেছে। অভিজিৎ পাণ্ডা আজ আপার গুণ্ডার দলে জয়েন করেছে।
মণীশ একটু হাসল, আইডিয়াটা খারাপ নয়। কী করতে চায় আপা?
বললাম তো, সব অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়।
তোকে রিক্রুট করেনি?
না, আমি বললাম, আমি ওসব পাগলামিতে নেই।
আপাকে বলিস ওর লিস্টে যেন আমার নামটা ঢুকিয়ে নেয়।
বুবকা অবাক হয়ে বলে, তুমি! তুমি আপার দলে জয়েন করবে?
আমার অনেক দিনের ইচ্ছে, পৃথিবীতে যত গুণ্ডামি আর শয়তানি হয় তার বিরুদ্ধে আর একটা গুণ্ডামি গড়ে তুলতে।
তুমি আপাকে সাপোর্ট করছ বাবা?
খুব। হান্ড্রেড পারসেন্ট।
বুবকা খুব হাসল। বলল, আইডিয়াটা আমারও খুব খারাপ লাগছিল না। কিন্তু ও বলছে, ওর গুণ্ডাদের কাছে আর্মস্ থাকবে না। শুধু মর্যাল ক্যারেকটার আর কারেজ।
আপা হয়তো একটু গান্ধীবাদী। কিংবা হয়তো ভাবে আর্মস্ হাতে পেলে এইসব ধৰ্মগুণ্ডারা আসল গুণ্ডা হয়ে যাবে।
আপা আরও গোলমেলে কথা বলছে। ওর ধারণা, আর্মস পেলে মানুষের নাকি মর্যাল ক্যারেকটার নষ্ট হয়ে যায়।
মণীশ হাসল, আর্মসের সঙ্গে লড়তে হলে আমও দরকার। অন্তত প্রাথমিকভাবে। তারপর অস্ত্র সংবরণ করা যেতে পারে।
বুবকা একটু চিন্তিত হল। বলল, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার আগে আপা এসব করে বেড়াচ্ছে, পড়ছে না। কিন্তু পরীক্ষায় দেখো, সবাইকে বিট করবে। এটা আপা কিভাবে পারে বাবা?
শী ইজ পারহ্যাপস এ জিনিয়াস!
আমার ধারণা কী জানো? আপা হায়ার সেকেন্ডারিতে ইচ্ছে করলেই ফাও হতে পারে। কিন্তু পড়েই না। কেবল সোস্যাল ওয়ার্ক করে বেড়াচ্ছে। আমরা ক্যারিয়ারিস্ট বলে ঠাট্টাও করে।
মণীশ বলল, সেটাও হয়তো ওর দিক থেকে ঠিকই করে। কিন্তু তা বলে তুই আবার ক্যারিয়ারের চিন্তা ত্যাগ করিস না। সেটা ঠিক হবে না।
বুবকার ঘুম সাঙ্ঘাতিক। বালিশে মাথা রাখলেই ঘুমিয়ে পড়ে। আজ রাতে ঘুম আসতে পনেরো মিনিট সময় লাগল। কারণ, ওই সময়টায় সে আসার কথা ভাবল। আপা কি ঠিক বলছে? আর সে নিজে কি মস্ত ভুল করছে জীবনে? তার কি ক্যারিয়ারিস্ট হওয়া উচিত নয়? তার কি দরকার আরও সোস্যাল ইনভলভ্মেন্ট?
পরদিন সে আপাকে ফের ধরল টিফিন পিরিয়ডে, এই যে লেডি রবিন হুড।
আপা তার দিকে তাকিয়ে বলল, বঙ্কিমচন্দ্রের দেবী চৌধুরানী পড়নি অনীশ! কী বোকা তুমি আমাকে দেবী চৌধুরানীও তো বলতে পারতে।
