আপার এই ঘোষণা শুনে খুবই অবাক হয়ে গেল বুবকা আর অভিজিৎ। বুবকা বলল, গুণ্ডার দল খুলবে। আপা, তোমার মাথাটাই গেছে।
আপা একটু উত্মার সঙ্গে বলল, তোমাদেরও মাথা আমার মতোই খারাপ হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তোমাদের কোনও ইনভলভূমেন্ট নেই বলে হচ্ছে না। তোমরা আছ নিজের ধান্ধায়। নিজের উন্নতি, নিজের ভবিষ্যৎ। আমার মতো যদি দুনিয়াটাকে দেখতে তো বুঝতে।
তা বলে গুণ্ডার দল।
আমাদের পিছনের বস্তি থেকে একটা লোক তার বউ আর তিনটে বাচ্চাকে রেখে আর একজনের বউ নিয়ে পালিয়ে গেছে। সেই লোকটাকে আমি অন্তত দশ জায়গায় খুঁজেছি। তারপর ধরেছি গোবিন্দপুর বস্তিতে। লোকটা আমার চেনা, পাম্প আর পাইপ সারাত। নাম গোপাল। যখন ধরলাম তখন আমাকে তেড়ে এল, জানো? সঙ্গে আরও দশ-বারোটা লোক আর সেই ভেগে আসা মেয়েটা! আমাকে হয়তো মারধরও করত! কী গালাগাল!
অভিজিৎ অবাক হয়ে বলে, তুমি গেলে কেন? লোয়ার ক্লাসের লোকদের তো ওরকম কত হয়।
আপা অভিজিতের দিকে ভর্ৎসনার চোখে চেয়ে বলল, লোয়ার ক্লাস বলে উপেক্ষা করলে চলবে? ওই লোকটার বউ ডলি আমাদের বাড়িতে এক সময়ে ঘরের কাজ করত। গোপাল পালিয়ে যাওয়ার পর তিনটে বাচ্চা নিয়ে ভীষণ বিপদে পড়েছে। দুবেলা খাওয়া জুটছে না।
অভিজিৎ বলল, তুমি পুলিশকে জানালে পারতে। ইটস্ এ কেস অফ বাইগ্যামি। পুলিশ যা করার করত।
তুমি বড্ডই ভাল ছেলে অভিজিৎ। বাইগ্যামি হল ভদ্রলোকদের টার্ম, নিচুতলার লোকদের কাছে ওসব শব্দ অচেনা। পুলিশের কথাও আর বলো না। আমাদের পাড়ার একটা ফ্ল্যাটবাড়ির পাম্পসেট চুরি গিয়েছিল। থানায় কি বলল জানো? বলল, কারা চুরি করেছে তা আমরা জানি, কিন্তু কিছুই করার নেই। করলেই এক ঘণ্টার মধ্যে পাঁচশো লোক এসে থানা ঘিরে ফেলবে। তাই আমি পুলিশের কাছে যাইনি। নিজেই গিয়েছিলাম, যদি লোকটাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করাতে পারি।
বুবকা বলল, অ্যান্ড ইউ ওয়্যার টট এ লেসন।
আপা একটু হেসে বলল, আমাকে অত সহজে শিক্ষা দেওয়া যায় বলে তুমি বিশ্বাস করো?
তা হলে তুমি এখন কী করবে?
আমি লোকটাকে জোর করে ধরে আনব। বউটাকেও। ওদের এরকম কাজ করার অধিকার নেই।
জোর করবে? তার জন্যই তোমার শুণ্ডা দরকার?
আপা মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ। তবে প্রফেশনাল গুণ্ডা নয়। তারা লোভী, অন্যায়কারী। আমার শুণ্ডারা হবে অন্যরকম। সমাজের ভালোর জন্য তারা সব করতে প্রস্তুত থাকবে। ঘাড় ধরে লোককে দিয়ে যেটা ভাল তা করিয়ে নেবে। কোনওভাবেই তাদের চরিত্র কেউ নষ্ট করতে পারবে না।
বুবকা খুব গম্ভীর গলায় বলল, আপা, তুমি যে একটু পাগল তা কি তুমি জানো?
জানি। আমার মতো পাগলই এখন দরকার। প্লিজ অনীশ, তুমিও একটু পাগল হও।
দেখ আপা, তোমার জন্য একবার আমিও পাগলামি করেছি। ড্রাগ পেডলাররা যখন তোমাকে অ্যাটাক করেছিল তখন জীবনে আমি যা করিনি—তাও করেছি। একজনকে ধরে বেধড়ক ঠেঙিয়েছি। মনে আছে?
আছে। সেই জন্য আমি তোমাদের ওপর রেগেও গিয়েছিলাম। ওদের মারাটা আমার প্রোগ্রামে ছিল না। কাজটা মোটই ভাল করনি।
অ্যান্ড ইউ আব নট ইভ গ্রেটফুল।
কেন হব? তোমাদের বলেছিলাম লোকগুলোকে চিনে রাখতে। তোমরা ওদের মেরে তাড়িয়ে দিলে। ওদের আর পাত্তাই পাওয়া গেল না।
তা হলে ওরা তোমাকে মেরে ফেললেই ভাল হত নাকি?
মারলে মারত। কত লোক তো রোজ কত কারণে মারা যাচ্ছে। ওটা কোনও ঘটনাই নয়। আমি চাইছি এসব জিনিসকে একদম উপড়ে ফেলতে। তার জন্য এখন আমার সত্যিই একটা গুণ্ডা-বাহিনী দরকার।
অভিজিৎ ওয়েট লিটার। সে রীতিমতো ব্যায়াম করে এবং বিভিন্ন কম্পিটিশনে নামে। বিস্তর প্রাইজও পেয়েছে। সে বলল, আমি তোমার দলে নাম লেখাতে রাজি আছি। কিন্তু এটা তো জানো, এ যুগে শুধু গায়ের জোরে গুণ্ডামি চলে না, ইউ মাস্ট হ্যাভ আর্মস্। তোমাকে পিস্তল জোগাড় করতে হবে, সাব মেশিনগান, চপার।
আপা হতাশভাবে বলল, ওঃ! বুদ্ধ আর কাকে বলে। ওসব দরকার হয় মানুষকে মারার জন্য। আমি তো তা করব না। আমি শুধু ফোর্স করব। ফোর্স করে লোককে অন্যায় কাজ থেকে সরিয়ে আনব।
অভিজিৎ মাথা নেড়ে বলে, তুমি ইমপ্র্যাকটিক্যাল। শুধু ঘুষি দেখে আজকাল খুব কম লোকই ভয় পায়। টিফিন পিরিয়ড চলছে। স্কুলের কম্পাউন্ডে অনেক ছেলেমেয়ে। তারা একটু তফাতে, একটা গাছের তলায় বসে। আপা ঠোঁট উল্টে বলে, যাদের হাতে আর্মস্ থাকে তাদের কিন্তু নৈতিক জোর থাকে না। তার মানে?
আপা একটু হেসে বলে, তোমরা আমাকে পাগল বলে। তা আমি একটু তো পাগলই। আমার মনে হয় মানুষ যখন হাতে কোনও মারণাস্ত্র পায় তখন তার নৈতিক সাহস আর দৃঢ়তা খানিকটা চলে যায়। ওই অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে
পড়ে সে। অক্সটা ব্যবহারের একটা অজুহাত খোজে সে।
বুবকা হেসে বলে, ওঃ, ইউ আর রিয়েলি ইমপসিবল।
আপা করুণাভরে বুবকার দিকে চেয়ে বলে, শোনো বুদ্ধ, আমি যে গুণ্ডাদের কথা বলছি তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে। নৈতিক চরিত্র আর ব্যক্তিত্ব। সেটাই মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
ওসব কথা বইতে লেখা থাকে আপা। প্র্যাকটিক্যাল কথা ওটা নয়। আজকাল মর্যাল কারেজের কোনও দামই নেই। একটা বোমা মেরে সব কারেজ-ফারেজ উড়িয়ে দেবে।
দিক না। একবার দুবার পাঁচবার দেবে। তারপর দেখো, চাকা ঘুরে যাবে উল্টোদিকে। মানুষের হাতে বরাবরই তো অস্তু ছিল, তাই বলে কি সাহসী লোকেরা নিরস্ত্র অবস্থায় ভাল কাজ করেনি কখনও?
