চয়ন বড়ই অস্বস্তিতে পড়ে গেল। তার প্রতি এত সহানুভূতি, এই যত্নতাত্তি কিছুই বউদির কাছে গোপন থাকবে না। ব্যাপারটা বউদি ভাল চোখে দেখবে না কিছুতেই। সে বউদিকে চেনে।
মাথা নেড়ে সে বলল, আমার আর খিদে নেই যে। দুধ খেয়ে পেট ভরে গেছে।
ও মা! খিদের জন্য তো গোটা রাত পড়ে আছে। এখন তো মোটে সাড়ে আটটা বাজে। অনিন্দিতা রইল এখানে, গল্পটল্প করো। সাড়ে নটায় খেও।
গোটা ঘটনাটা ঘটছে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। সে উদ্বেগে, অস্বস্তিতে কাটা হয়ে আছে। অথচ প্রতিরোধের কোনও ক্ষমতাও তার নেই।
অনিন্দিতার মা চলে যাওয়ার পর জায়গাটা নিল অনিন্দিতা নিজেই। বলল, ডাক্তার দেখাবেন?
চয়ন মৃদু হেসে বলে, অনেক দেখিয়েছি। এর তো কোনও চিকিৎসা নেই।
তা জানি। কিন্তু আপনার শরীরটা যদি এমনিতে ভাল হয়ে ওঠে তা হলে অ্যাটাকটা হয়তো কম হবে। আপনাকে এক ফাইল ভিটামিন ক্যাপসুল দেব, রোজ একটা করে খাবেন তত।
তার দরকার নেই।
অত সংকোচ করছেন কেন? আমাকে তো কিনতে হয় না। নার্সিংহোম-এ দেদার ফিজিসিয়ান স্যাম্পল আসে। আমরা ফ্রি পাই।
ও, ভিটামিন খেলে কিছু হয়?
হয়। জীবন থেকে নিজেকে অত সরিয়ে রাখবেন না। নিজের ওপর বিশ্বাস এত কম কেন?
চয়ন চুপ করে রইল। ঘরে একটা ষাট পাওয়ারের বাল জ্বলছে। সেই আশোয় অনিন্দিতাকে তার এখন হঠাৎ দেবী বলে ভ্রম হচ্ছে। শোয়া অবস্থায় এই অ্যাঙ্গেল থেকে সে আগে তো কখনও অনিন্দিতাকে দেখেনি।
কী ভাবছেন?
চয়ন সলজ্জ একটু হেসে বলল, আপনারা আমার জন্য এত করছেন বলে আমার ভীষণ লজ্জা করছে। অভ্যাস নেই তো। যতদিন মা ছিল ততদিন
কথাটা শেষ করতে পারল না চয়ন। মা যতদিন ছিল ততদিন কি সে মায়ের কাছ থেকে অনেক পেয়েছে? না। শেষদিকে মা তো কিছুই পারত না। শুধু শুয়ে থাকত। স্ট্রোকের পর তো সে মনে মনে চাইত, মা তাড়াতাড়ি মরে যাক। এত কষ্ট পাওয়ার চেয়ে সেটাই ভাল। তবু মা যে ছিল সেই থাকাটাই যেন অনেক ফাঁকফোকর, অনেক শূন্যতাকে ভরে রাখত। তখন টের পেত না চয়ন। এখন পায়।
মাকে খুব ভালবাসতেন বুঝি।
চয়ন বলল, সেটা বড় কথা নয়। মা ছাড়া আর কেউ তো ছিল না আমার।
আপনার এক দিদি আছেন না?
আছে। সংসার নিয়ে ব্যস্ত।
দাদা বউদিকে তো দেখছি। ছিঃ ছিঃ।
চয়ন সতর্কভাবে চুপ করে থাকে।
অনিন্দিতা তার মাথায় হাত রেখে নরম গলায় বলে, বাতিটা নিবিয়ে দেব? চোখে লাগছে না তো!
চয়ন আতঙ্কিত বোধ করে বলল, না না, থাক। আমার কোনও কষ্ট হচ্ছে না।
ওঃ তাই তো? আপনার তো শুচিবায়ু আছে। ভুলেই গিয়েছিলাম।
বলেই হাসল অনিন্দিতা। সেই সুন্দর দাঁতের চমৎকার হাসি। মেয়েটা সুন্দরী নয়, কিন্তু ওই হাসিটা যেন অন্য জায়গা থেকে আসে। একটা শুকনো, শ্ৰীহীন মুখকে ক্ষণিক সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত করে দিয়ে কোথায় চলে যায়।
চয়ন লজ্জা পেয়ে চোখ বুজে ফেলে বলে, আপনি আমার সম্পর্কে খুব খারাপ ভাবেন, না?
ভাবলে কি বসে আছি এভাবে?
চয়ন করুণ গলায় বলল, আমাকে নিয়েই আমার যত সমস্যা। আর কেউ নয়, নিজেকে সামলাতেই আমার সমস্যা হয়।
তাই তো বলছিলাম, আপনার মনের জোর নেই।
তা তো নেই-ই।
কেন নেই?
কখনও ভেবে পাই না।
আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? কিছু মনে করবেন না?
না না, আমার মনে করার কিছুই নেই।
আপনার আর্নিং কত?
চয়ন একটু হাসল, তারপর একটু হিসেব করে বলল, হাজার দেড়েক হবে।
খুব খারাপ তো নয়!
না। তেমন খারাপ নয়।
তা হলে এখানে পড়ে আছেন কেন? একটা ছোট ঘড় ভাড়া করলেই তো হয়।
চয়ন মাথা নেড়ে বলল, হয়। কিন্তু ইচ্ছে করে না। এখানে অনেকদিন ধরে আছি তো।
মায়ের স্মৃতি?
তাও হবে হয়তো। আর বউদিকে আমি সামান্য টাকাই তো দিই ভাড়া হিসেবে।
অনিন্দিতা হঠাৎ চোখ বিস্ফারিত করে বলে, তাড়া দেন।
হঠাৎ চয়ন বুঝতে পারল, ভাড়ার কথাটা বলা তার ঠিক হয়নি। সে তাড়াতাড়ি বলল, বউদি বা দাদা ভাড়া চায়নি কখনও। আমি ইচ্ছে করেই দিই। বউদি নিতে চায়নি।
অনিন্দিতা অবাক হয়ে বলল, নেবেই বা কেন? নেওয়ার তো কথাই নয়।
প্লিজ! আপনি কথাটা ভুলে যান। কাউকে বলবেন না।
অনিন্দিতা আবার হাসল। তারপর বলল, অতি ভিতু বলেই আপনার কিছু হয় না। এত ভয় পান কেন?
আমার সব কিছুকেই ভয়।
তার কপালে একটা হাত রেখে অনিন্দিতা বলল, ভাড়ার একটা রসিদ চেয়ে নেবেন এবার থেকে।
রসিদ! রসিদ দিয়ে কী হবে?
ওটা তো আপনার পাওনা।
চয়ন একটু হাসল। বলল, ওরকম সম্পৰ্ক তো নয়। আমি দাদার সংসারে একটু সাহায্য করি মাত্র।
অনিন্দিতা মাথাটা হেলিয়ে তাকে মায়ারা চোখে একটু দেখে নিয়ে বলল, আপনি পারবেন না।
কী পারব না?
আপনি কোনও লড়াই জিততে পারবেন না। বড্ড বোকা।
এটা আদুরে গলায় বলা। চয়ন আদরটা টের পেল। খারাপ লাগল না। কিন্তু তার কেন যেন মনে হল, সে ছোট্ট একটা পোকার মত একটা মাকড়সার জালের মধ্যবিন্দুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অনিন্দিতা একটু বাদে নিচে গিয়ে তার জন্য ভাত নিয়ে এল। এবং আশ্চর্যের বিষয় ভাতের থালা দেখে চয়নের ভীষণ খিদে জেগে উঠল। চেটেপুটে খেল সে। রান্না চমৎকার।
অনিন্দিতা খুশি হয়ে বলে, এবার দরজা বন্ধ করে ঘুমোন।
ঘর অন্ধকার করে ঘুমোবার চেষ্টা করতে গিয়ে চয়ন টের পেল, তার মাথাটা গরম। কেমন একটা অস্থিরতা আর উদ্বেগ। অনিন্দিতা কি কিছু বলতে চাইছে? তাও কি সম্ভব? সে যুবক বটে, কিন্তু যুবকের মতো তো নয়।
০৬৬. একটা গুণ্ডার দল
আমি নিশ্চয়ই একটা গুণ্ডার দল খুলব। যত অন্যায় আর অবিচার আছে আর হচ্ছে সব কিছুকে তরুস্থ করতে হবে।
