অনিন্দিতা ঘরে রাখা ছোটো প্লাস্টিকের বালতিটা থেকে আঁজলায় জল তুলে নিয়ে চয়নের চোখে ঝাঁপটা দিল একবার। এটুকু চয়ন টের পেল। তারপরই তলিয়ে গেল তার নিজের ভিতরে এক অন্ধকারে।
যখন চোখ মেলল তখন তার বুক, মুখ, জামা সব জলে ভেজা। খুব শীত করছে। শরীর অসম্ভব দুর্বল। বিছানার পাশে অনিন্দিতা দাঁড়িয়ে, কিন্তু তাকে সে কয়েক সেকেন্ড চিনতেই পারল না।
কেমন লাগছে এখন?
চয়ন শুধু চেয়ে রইল। মাথা এত সাদা যে কথাটা ভাল করে বুঝতেই পারল না। জবাব দেওয়ার ভাষাটাও খুঁজে পেল না কিছুক্ষণ। অবোধ চোখে শুধু চেয়ে থাকল।
চয়নবাবু! কেমন লাগছে?
চয়নের মাথার অস্পষ্টতা সরছে। মনে পড়ছে। সৌজন্যবোধ তার বড়ই বেশী। মৃদু একটু আসার চেষ্টা করে সে বলল, ভাল।
করুণা আর মায়ায় নরম হয়ে আছে অনিন্দিতার মুখখানা। ছলোমলো চোখে সে বলল, খুব কষ্ট হচ্ছে?
চয়ন তার ঠাণ্ডা দুর্বল শরীর আর ভারী মাথা নিয়ে পাথরের মতো শুয়ে থেকেও মৃদু একটু হেসে বলল, আমার অভ্যাস আছে। এ তো আমার পুরনো বন্ধু।
একটু দুধ এনে দিই? গরম দুধ?
চয়ন আত্মধিক্কার এবং নিজের ওপর ঘেন্নায় মুখখানা সামান্য বিকৃত করল। তারপর খুব মৃদুস্বরে বলল, না। দুধ আমার সহ্য হয় না।
অনিন্দিতা তার মুখের ওপর একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, এ সময়ে দুধ খেতে হয়। আমি নিয়ে আসছি।
অনিন্দিতা চলে গেল। আবার আসবে। চয়ন তার ঘরের সিলিঙের দিকে চেয়ে চুপ করে শুয়ে থাকে। উঠবার সাধ্যই নেই এখন। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে সে উঠতে পারবে। কিন্তু শরীরটা অনেকক্ষণ দুর্বল আর অবশ থাকবে। অনেকক্ষণ ধরে তার শরীরের তীতে তন্ত্রীতে বাজবে ঝিঁঝি পোকার শব্দ। এই শরীর নিয়ে কি বাঁচা যায়?
হাঁ করে খুব বড় বড় শ্বাস নিচ্ছিল চয়ন। ভীষণ শীত করছে তার। গায়ের ভেজা জামাটা বদলানো দরকার। মুখ মাথা আর ভেজা বুক ভাল করে মোছা দরকার। খুব ধীরে ধীরে সে উঠবার চেষ্টা করল। এই চেষ্টাই তার যাবতীয় জীবনগ্রাম। লোকে কিছুতেই বুঝবে না, তার শুধুমাত্র বেঁচে থাকা আর শরীরটাকে টেনে শেষ অবধি নিয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বড় কথা।
সে উঠে বসল। দেখল, জলের ঝাঁপটায় তার বালিশ আর বিছানাটাও অনেকটা ভিজে গেছে। চাঁদরটা পালটালে ভাল হয়। চৌকির নিচে একটা পুরনো সুটকেসে চাঁদর আছে। কিন্তু উবু হয়ে বসে সুটকেস খুলতে এই ছোট ঘরে যে কসরত করতে হয় তা করার সাধ্যই তার নেই। শুধু বালিশটা উল্টে দিল সে। এতেই আপাতত হবে। জামা বদলানো থেকে গা মোছা প্রত্যেকটা কাজই মনে হচ্ছে বেদম পরিশ্রমের ব্যাপার। তার বড় ঘুম পাচ্ছে। আজ রাতে রান্না বা খাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। কিন্তু অনিন্দিতা আসবে বলে সে ঘুমোতও পারবে না এখন। অপেক্ষা করতেই হবে।
শুয়ে গায়ে কম্বলটা টেনে জেগে থাকার একটা অক্ষম চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু অনিন্দিতা আসতে দেরি করছে। ঘুম। তাকে টেনে নিল চুম্বকের মতো।
মাথায় হাতের স্পর্শে ফের জাগল চয়ন। পাশাপাশি অনিন্দিতা আর তার মা দাঁড়ানো।
অনিন্দিতার মা জিজ্ঞেস করল, ঘুমিয়ে পড়েছিলে বাবা? নাকি আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে?
চয়ন মৃদু হেসে উঠে বসবার চেষ্টা করতেই উনি বাধা দিয়ে বললেন, শুয়ে থাকো। উঠতে হবে না।
সে দুধ খায় না। কারণ দুধটুধ খাওয়ার কথা তার মনেও হয় না। তবে প্রতিবাদ করতে গেলে যে শক্তি ক্ষয় হবে তার চেয়ে বিনা প্রতিবাদে খেয়ে নিলে ধকলটা হবে কম। অনিন্দিতার হাতে কাচের গেলাসে দুধটা দেখে ভিতরের অনিচ্ছা চেপে সে ফের উঠতে গেল।
অনিন্দিতা বলল, উঠবেন না। হাঁ করুন, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
চয়ন হাঁ করে এক ঢোক দুধ খেল। সামান্য একটু ঝাঁঝ টের পেল সে।
অনিন্দিতা মৃদু স্বরে বলল, একটু ব্র্যান্ডি মেশানো আছে। তাতে দুর্বলতা কেটে যাবে।
দুধটা খাওয়ার পর সত্যিই তার শরীরটা একটু গরম হল। সে মৃদু স্বরে বলল, আপনাদের কষ্ট দিলাম। এত কিছুর দরকার ছিল না। খানিকটা ঘুমোলেই উইকনেসটা কেটে যায়।
অনিন্দিতার মা তার মাথার কাছটিতে একটু কষ্ট করেই বসলেন। বললেন, কষ্ট কিসের? এটুকু আবার কষ্ট নাকি? তোমাকে তো দেখার কেউ নেই। অসুখ নিয়ে পড়ে থাকে। তোমার তো দেখছি বড় কষ্ট।
এই সহানুভূতি চয়নকে একেবারে কাদামাটির মতো নরম করে ফেলে। সে কৃতজ্ঞ গলায় বলে, কষ্ট করাই যে আমার অভ্যাস। আমার কোনও অসুবিধে হয় না।
তার চারদিকে কত দয়ালু লোক। রাস্তায় ঘাটে কতবার অজ্ঞান হয়ে পড়েছে সে। প্রতিবারই অচেনা মানুষেরা তাকে সেবা দিয়েছে। কেউ কেউ নিজের পয়সায় ট্যাক্সি ভাড়া করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে। সে তাই সকলের প্রতিই একটা বিশ্বজনীন কৃতজ্ঞতা বোধ করে।
অনিন্দিতার মা তার কপালে হাত রেখে বললেন, আমাদের পর ভেবো না বাবা, তোমার বয়সী আমার একটা ছেলেও তো থাকতে পারত।
এ ধরনের কথা চয়ন শরৎচন্দ্রের উপন্যাসেই হয়তো পড়েছে। হয়তো এধরনের কথা বাংলা সিনেমাতেও ব্যবহৃত হয়। কথাটা অর্ধসত্য। ছেলের সঙ্গে ছেলের মতো মনে করেও একটা পার্থক্য থাকেই। পরত্বটা ঘুচতে চায় না। তবু চয়নের বড় ভাল লাগল কথাটা।
তুমি রাতে কী খাও বাবা? ভাত না রুটি?
চয়ন সসংকোচে বলে, ভাতই খাই। কেন জিজ্ঞেস করছেন।
আমি আজ তোমার জন্য ভাত রাঁধবো।
চয়ন খুবই বিব্রত হয়ে বলল, না না, আমি আজ আর কিছু খাবো না।
পাগল! তাই কি হয়! না খেলে আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তুমি ভাল করে খাও না বলেই তো এরকম হয়।
