ছাদে পা দিয়েই বলল, কাল একটা থিয়েটার দেখবেন?
থিয়েটার!
কেন, থিয়েটার দেখেন না?
চয়ন খুবই বিব্রত বোধ করল। সিনেমা থিয়েটার জলসায় সে কখনও যায় না, যাওয়ার কথা মনেই হয় না। এন্টারটেনমেন্ট জিনিসটাই তার মধ্যে নেই।
সে মাথা নেড়ে বলল, না। সময়ই হয় না।
কেন, আপনার এত সময়ের টানাটানি কেন হয়? টিউশনি আর এমন কী একটা কাজ?
চয়ন মৃদু একটু হাসল। কিছু বলল না। সত্যি কথাটা বললে মেয়েটা খুব অবাক হবে। সে মৃদু স্বারে বলে, অনেকদিন আগে মাঝে মাঝে সিনেমা দেখেছি। এখন কেন যে ইচ্ছে হয় না।
আপনি অদ্ভুত মানুষ। বাঁচতেই জানেন না। বড্ড শুকনো।
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, তা ঠিক।
কেন এরকম আপনি? আমার তো থিয়েটারের ভীষণ নেশা। কিছু বাদ দিই না। কাল যাবেন? আমার কাছে দুটো কমপ্লিমেন্টারি টিকিট আছে।
এইসব প্রস্তাব মোটেই সুখাবহ নয় চয়নের কাছে। সর্বদাই তার একটা ত্ৰাস, বউদি বা দাদা যদি রেগে যায়? এ মেয়েটা ইদানীং প্রায়ই ছাদে আসে আড্ডা মারতে, মাঝে মাঝে ওদের ঘরে ডেকেও চা খাওয়ায়। ওদের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতাটা চয়ন বজায় রাখতে চায় না। বউদি হয়তো ভাল চোখে দেখছে না। সে চিলেকোঠায় উঠে আসায় এবং ঘরের ভাড়া বাবদ মাসে মাসেবউদিকে কিছু টাকা দিতে শুরু করায় সম্পর্কটা ভাল আছে। কতদিন থাকবে তা বলা কঠিন।
চয়ন একটু অস্বস্তির সঙ্গে বলে, কাল তো সময় হবে না। ছাত্রীর পরীক্ষা চলছে।
অনিন্দিতা গম্ভীর হয়ে বলে, আসলে আপনি আমাকে অ্যাভয়েড করতে চান।
তা নয়। বিশ্বাস করুন।
অনিন্দিতা বিশ্বাস করল না। একটু ম্লান হেসে বলল, এ যুগে এত লজ্জা সংকোচ আর ভয় থাকলে চলে না। এসব ঝেড়ে না ফেললে বাঁচবেন কি করে?
চয়ন চুপ করে রইল।
অনিন্দিতা কি একটু সেজে এসেছে? ঘরের আলোর আভায় তাই যেন মনে হল চয়নের। চুল পরিপাটি করে বাঁধা, মুখে একটু পাউডার এবং হয়তো বা কাজলও। কপালে একটা বড় আর একটা ছোেট টিপ। কে জানে কেন, ব্যাপারটা লক্ষ করে সে অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করল।
আসুন, একটু গল্প করি।
এ প্রস্তাবের মধ্যে প্রত্যাখ্যানের কিছু নেই। অনিচ্ছুক চয়ন তাই বাধ্য হয়ে রেলিঙের ধারে অনিন্দিতার পাশে দাঁড়াল। বেশ একটা সুগন্ধ আসছে অনিন্দিতার গা থেকে।
খুব দুঃখ পেলাম জানেন, একটু ইনসাল্টেড ফিল করছি।
তটস্থ হয়ে চয়ন বলল, কেন?
আপনি রিফিউজ করলেন বলে। ইচ্ছে করলেই যেতে পারতেন। কী এমন টিউশনি করেন শুনি! তারা তো আর মাথা কিনে নেয়নি।
চয়ন কি বলবে তা ভেবেই পেল না। সে কাউকে তোয়াজটাও করতে শেখেনি।
অনিন্দিতা একটু বিষণ্ণ গলায় বলল, আপনার কথা ভেবেই দুটো টিকিট চেয়েছিলাম। অবশ্য আপনার মতটা আগেই জেনে নেওয়া উচিত ছিল।
চয়ন মেয়েটাকে খুশি করতেই বলল, আচ্ছা, আর একদিন যাবো।
অনিন্দিতা মাথা নেড়ে বলে, আপনি যে কখনও যাবেন না তা আমি জানি। আপনার অনেক অজুহাত বেরোবে। আমি ভেবেছিলাম, আপনাকে তো কোনওদিন টিউশনি ছাড়া আর কিছু করতে দেখি না। বড্ড ড্রাই জীবন কাটাচ্ছেন। তাই ভাবলাম, একটা নাটক দেখাই আপনাকে। হয়তো ভাল লাগবে।
চয়ন এ কথায় যথেষ্ট কৃতজ্ঞ বোধ করল। একটা মেয়ের সঙ্গে থিয়েটার দেখতে যাওয়া দোষেরও কিছু নয়। কিন্তু এই ঘটনা থেকে নানা রকম ব্যাখ্যা বেরোতে পারে। ভয়ের সেইটাই।
একটা কথা বলবেন? আপনি সব ব্যাপারেই এত ভয় পান কেন?
আমি ভীষণ ভিতু।
থিয়েটারে যাওয়ার মধ্যে ভয়ের কী আছে? কেউ খারাপ ভাববে? আজকাল আর ওসব কেউ ভাবে নাকি?
সে কথা নয়।
অথচ আপনার কত ফ্রিডম দেখুন। একে তো আপনি পুরুষমানুষ। মেয়েদের তুলনায় পুরুষদের ফ্রিডম অনেক বেশী। আপনার মাথার ওপর কোনও গার্জিয়ান নেই; কেউ শাসন করবে না। এত ফ্রিডম থাকা সত্ত্বেও কেন যে লজ্জা সংকোচ ভয়ে এমন কুঁকড়ে থাকেন।
খুব নিঃশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল চয়ন। তারপর বলল, আমার জীবনটা ঠিক আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক নয়।
অনিন্দিতা তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। বলল, কেন বলুন তো। আপনার এপিলেপসি আছে বলে? ওটা তো অনেকের থাকে! তা বলে সব বিসর্জন দিয়ে বিধবার মতো থাকতে হবে নাকি?
চয়ন বিষণ্ণ নরম গলায় বলল, এই অসুখটা আমার মনের জোর নষ্ট করে দিয়েছে। সব সময়ে একটা অস্বস্তি থাকে মনে।
তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখেন?
চয়ন মাথা নেড়ে বলল, তাই। হয়তো ওটা ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স।
অসুখের চিন্তা করেন কেন? এপিলেপসি একটা পাজি অসুখ। কিন্তু ফ্যাটাল তো নয়। আপনার কতদিন পর পর ওটা হয়?
তার কিছু ঠিক নেই। গত তিন মাস হয়নি। আবার হয়তো পর পর তিন চারদিন হবে। দিনে দু-তিনবারও হয়েছে। রাস্তাঘাটে বিপদে পড়তে হয় মাঝে মাঝে।
গত তিন মাস হয়নি বলছেন! এটা তো ভাল লক্ষণ। হয়তো সেরেই গেছে।
চয়ন হঠাৎ একটু যেন সচকিত হয়ে বলল, সারেনি।
কি করে বুঝলেন?
চয়ন হঠাৎ নাটকীয়ভাবে টের পেল তার চারদিকে একটা কুয়াশার ঘেরাটোপ তৈরি হচ্ছে। চোখে একটা অস্পষ্ট সিগন্যাল দেখতে পায় সে। কুয়াশা ভেদ করে একটা রেলগাড়ি ঝিকঝিক করে এগিয়ে আসছে। তার বুড়ো আঙুল কেঁপে উঠল হঠাৎ।
অস্ফুট গলায় চয়ন বলল, ওই যে!
কী ওই যে! কী হল আপনার?
প্লিজ! বলেই চয়ন দৌড়ে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে কোনওরকমে ছুঁড়ে দিল নিজেকে বিছানায়।
অনিন্দিতা ঘাবড়ে গেল না। দ্রুত পায়ে এসে তার কাছে দাঁড়াল। চয়নের হাত কাঁপছে। শরীর কাঁপছে। ধীরে ধীরে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে আঙুল। সে প্রাণপণে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, কাউকে ডাকবেন না কিন্তু, প্লিজ!
