তো লোভী পুরুষের চোখে নারীমাংস ছাড়া আর কিছু নয়।
বুকটা বড় ব্যথিয়ে ওঠে নিমাইয়ের। বুকের মধ্যে যেন এক শূন্য প্ৰান্তরে শুকনো বাতাস হু হু করে বয়ে যায়। আজও বীণা তার খোঁজ নেয়নি। বছর ঘুরতে চলল।
পতিতপাবন দত্ত মশাইয়ের তুলো আর তোশক-বালিশের কারবার উঠে যাচ্ছে। দোকানখানা বন্দোবস্তে নিয়ে ফেলল নিমাই। নিজের টাকাতেই কুলিয়ে গেল। তবে দোকান নিলেই তো হল না। চেয়ার টেবিল, বেসিন, কল, বাসনপত্র নিয়ে মেলা খরচ।
নিরঞ্জনবাবু বললেন, টাকা দিচ্ছি। সব দিক সামলে ভাল করে দোকান দাও। হিসেবটা ঠিকমতো রেখো। হিসেবের ব্যাপারে তোমার গাফিলতি আছে। আর চৌকিদারের চাকরিটাও তোমাকে করতে হবে না। আমি অন্য লোক দেখে নিচ্ছি।
নিমাই হাতজোড় করে বলে, আজ্ঞে না। ওটা ছাড়ব না। বেতন দিতে হবে না, ওটা আমি বেগার খেটে দেবো।
কোন দুঃখে।
ওটা আমার পয়া চাকরি।
নিরঞ্জনবাবু হাসেন, পাগল আর কাকে বলে! রাত জাগলে দোকান করবে কি করে?
আজ্ঞে পারব।
এত খাটলে শরীর ঠিক রাখতে পারবে?
শরীরের কথা ভাবলেই শরীর বেগড়াই করে। ভগবান শরীর দিয়েছেন খাটানোর জন্য, বসিয়ে রাখার জন্য তো নয়।
তাহলে করা। বেতনও পাবে। কলিকালে সৎ আর সাধুদের তো কলকে নেই। তা তোমার যদি এই ঘোর কলিকালে কিছু উন্নতি হয় তবে বুকে বল ভরসা পাবো। সাধু সজ্জনদের আজকাল বড়ই দুর্গতি।
আমাকে সাধু বলবেন না। তাতে সাধুদের অপমান।
খুব খাটুনি গেল দিন কতক। দোকান ঝাড়পপাছ করা, রং লাগানো, সবই নিজের হাতে করতে হল তাকে। মিস্ত্রি মেলা পয়সা চায়। আর নিজের হাতে করলে যে সুখটা হয় তা মিস্ত্রিকে দিয়ে করালে হয় না।
দোকানটা দাঁড়াল মন্দ নয়। সাইনবোর্ডের কথা একবার ভেবেছিল সে। তারপর ভাবল, চেনা বামুনের পৈতে লাগে না।
পালপাড়া থেকে মা-বাপকে আনাল নিমাই। নদেরাদ এল সঙ্গে। পূজো-টুজো দেওয়া হল দোকানে। খাওয়া-দাওয়া হল।
ও নিমাই, এ কি আমাদের হোটেল? সত্যি?
হ্যাঁ মা, এ নির্যস আমাদেরই হোটেল।
সোনার চাঁদ রে, কি করে করলি বাবা? এ যে বিশ্বাসই হয় না। চেয়ার টেবিল আলো দিয়ে এ যে অশৈলী কাণ্ডকারখানা!
মা-বাপের মুখে হাসি ফোঁটাতে পারা সৌভাগ্যের কথা। কটা ছেলে করতে পারে তা? নিমাইয়ের বুক ভরে উঠল। একখানা লড়াইতে সে হেরে গেছে বটে, কিন্তু ভগবান তাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেননি।
মাকে বলল, আর পালপাড়ায় পড়ে থাকার দরকার কী মা? হোটেলের পিছন দিকে ঘর আছে। সেখানেই থাকতে পারবে।
মা বলে, তা তুই যা বলিস। তবে সেটা নিজেদের বাড়ি তো। এ হল ভাড়ার ঘর।
নদে মাথা নেড়ে বলে, ও কাজ করতে যেও না নিমাইদা। পালপাড়ার ঠেকটা রেখো। আমি বলি কি একটু চাষের জমিও কিনে রাখো গাঁয়ে। জমির মতো জিনিস নেই।
নিমাই দোনামোনা করে বলল, তাহলে তাই হোক।
দিন যায়। ভালই যায়। হোটেল চলছে রমরম করে। সারাটা দিন শ্বাস ফেলার সময় থাকছে না নিমাইয়ের। নানারকম নতুন নতুন খাবারের কথা মাথায় ঘোরে তার। গোটা কয়েক রন্ধনপ্রণালী কিনে ফেলল সে। দুটো বিয়েবাড়ির অর্ডার পেয়ে মোটা লাভ হল তার। নিরঞ্জনবাবুর টাকা শোধ করতে তিন-চার মাসও লাগল না।
কিন্তু মাঝে মাঝে দুপুরের সামান্য ফাঁকে যখন একটু ঘুমিয়ে নিতে যায় নিমাই বা রাত জেগে গুদাম পাহারা দেয় তখন মনে হয়, এই যে তার এত হচ্ছে-টচ্ছে, এ সব তত বীণা দেখছেও না, জানছেও না। আহা বীণা যদি একবার দেখত। তার মুখে যদি একটু অবাক-হাসি আর সোহগের ভাব ফুটত দেখে। এত পরিশ্রম সার্থক হত তাহলে।
কী নিমাইদা! চিনতে পারছো?
নিমাই অবাক হয়ে দেখে ছেলেটাকে। তারপর আহ্রাদের গলায় বলে, পল্টু! আরে এসে এসো।
পর বনগাঁয়ের লটারির দোকানে অনেক বসে থেকেছে নিমাই। ভাল ছেলে।
তোমার দোকানের কথা শুনেছিলাম। এদিকে এসেছিলাম একটা কাজে। বোনের জন্য সম্বন্ধ দেখতে। তাই এখানে একটা ঢুঁ মারলাম।
ভাল করেছ। বোস।
বসব! কোথায় বসব? তোমার দোকানে তো দেখছি গিজগিজ করছে খদ্দের।
তা একটু হয়। ওরে, এখানে কাউন্টারের পাশে একটা চেয়ার দে তো।
পল্টুর জন্য এক প্লেট মাংস আর পরোটার অর্ডার দিয়ে নিমাই বলল, তারপর ওদিককার খবর কী বলো!
বীণাদির খবরও চাও নাকি?
বীণা ভাল আছে?
ভালই তো। বিশ্ববিজয় অপেরার তো এখন খুব নাম। বীণাদিরও হাল ফিরেছে।
থাক। ভাল থাকলেই ভাল। ঘরখানা কি পাকা করেছে?
তা জানি না। তবে পথে-ঘাটে দেখি, চেহারা ভাল হয়েছে।
নিমাই চুপ করে থাকে। বীণা ভালই আছে। তার মানে তাকে ভুলেছে বীণা। মুছে ফেলেছে জীবন থেকে।
কাকা কেমন আছে পল্টু।
আছে, ভালই আছে। সব ঠিক আছে। একবার যেও বনগাঁয়ে। তোমার কথা খুব মনে হয়। এখানে এসে খুব ভাল করেহ নিমাইদা। তোমার অবস্থা তো দেখছি ফিরে গেছে।
ভগবানের দয়া।
গিয়ে বীণাদিকে সব বলবখন। অবশ্য বীণাদিও খবর রাখে।
রাখে?
খুব রাখে। আমাকে একদিন বলছিল, জানো তো সেই নেমকহারাম লোকটা আমাকে ছেড়ে গিয়ে হোটেল খুলেছে!
বলছিল?
কী বলছিল সেটা বড় কথা নয়। বলছিল যে সেটাই বড় কথা।
০৬৫. জ্যোৎস্না রাতে ছাদের রেলিং-এর ধারে
জ্যোৎস্না রাতে ছাদের রেলিং-এর ধারে পাশাপাশি দুজন দাঁড়ানো। দৃশ্যটা আপাতদৃষ্টিতে বেশ রোমান্টিক। চয়ন তো বয়সে একজন যুবকই। এবং অনিন্দিতাও কি যুবতী নয়?
যদিও এটা শীতকাল। তবু আজ কলকাতায় শীত একদম নেই। একটু আগে চয়ন ফিরেছে। নিচে গিয়ে চৌবাচ্চায় হাত মুখ ধুয়ে যখন ওপরে আসছে তখন অনিন্দিতা পিছু পিছু এল।
