পচতে চাইছিস কেন?
মনো চুপ করে ইটের ওপরে বসে থাকে। মাথা নিচু করে কাঁদেও কিছুক্ষণ। ঘর বলতে সামন্যই একখানা খুপরি। সেখানে তার ছছাট্টো একটা মেয়ে ঘুমাচ্ছে। ঘরে তালা দিয়ে মনে চলে আসে রোজ।
দেখ মনো, তোর জন্য আমাকে না এ জায়গা ছাড়তে হয়। যদি জ্বালাতন করি তবে আমি এখানকার পাট তুলে চলে যাবে কিন্তু।
পাঁচটা টাকা দেবে?
পরশু তো দিয়েছি।
পরশুর টাকা আজ অবধি থাকে। পাঁচ টাকায় কী হয় বলো!
এরকম করে যদি রোজ চাস তাহলে আমার চলে কি করে?
তোমার আবার অভাব! দিব্যি তো লুটেপুটে পাচ্ছে। দাও না পাঁচটা টাকা। দোকানে যে আর ধার দেয় না।
কাজে লেগে যা-না।
কাজ কি করি না নাকি? তিন বাড়ি ঝি খাঁটি। তাতে হয়? নন্দ ঘরভাড়া দেওয়া বন্ধ করেছে, হাতে একটা পয়সা দিচ্ছে না।
ও কি কাউকে পুষছে?
তা আবার নয়? পরশু তো তাই নিয়ে কুরুক্ষেত্র হল। আর আসবে না।
সেবা-টেবা ঠিকমতো করতি?
কম করিনি গো। মদের পয়সা কম জুগিয়েছি? নিজের রোজগারের পয়সা ভাঙত নাকি? শুধু ঘরভাড়া দিত আর বাজারটা করত আর মেয়ের খরচটা।
তবে তো মেলাই দিত।
ছাই।
শোন মনো, পুরুষ মানুষকে একটু তোয়াজে রাখলে সে তো পাপোশ। নন্দ লোক খারাপ নয়। ইলেকট্রিকের ভাল কারিগর। একা হাতে নিরঞ্জনবাবুর দুটো গোডাউনের লাইন করেছিল।
তাতে কী হল বলে তো! ভাল কারিগর মানেই কি ভাল মানুষ নাকি?
তা নয়, তবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার মতো তো নয়। তু
মি আর ধান ভানতে শিবের গীত গেও না তো! বলতে আসি এক কথা, উনি শোনান আর এক কথা।
কী শুনতে আসিস মনো? যা শুনতে চাস সেই বাক্য তো আমার মুখ দিয়ে বেরোবে না।
তুমি খুব সাধুপুরুষ!
তা নই। তবে ভিতু।
ভয়টা কাকে? আমাকে? না সমাজকে?
সবাইকেই।
ওটা কোনও কথা হল? আমি কি তোমার ক্ষতি করব বলে আসি?
নিমাই চুপ করে থাকে। এ কথার জবাব দিতে গেলে মনো খুব দুঃখ পাবে।
মনো নিজের মনেই বলে, তোমার হোটেলেও তো ঝি লাগে। সেই কাজটাই না হয় দাও আমাকে। তোমার দুটো ভাতও ফুটিয়ে দেবো। আমার ঘরভাড়া আর খোরাকিটা দিয়ে দিও।
মনো, তুই আর কাউকে দেখ।
ইস, আমি যেন ওরকম। একটা না একটা ধরলেই হল বুঝি? তোমার কাছে আসি কি এমনি? ভাল লাগে বলেই না!
আমাকে তোর ভাল লাগে কেন?
লাগলে কি করব?
তোর মাথাটাই গেছে। আমি হলাম একেবারে অপদার্থ লোক। কড়ে আঙুলের মতো মানুষ।
ওই ডাইনি তোমার মাথাটা চিবিয়ে রেখেছে গো! কিছুতেই আর তোমার অন্য দিকে নজর পড়ছে না। তা হ্যাঁ গো, নিমাইদাদা, পুরুষ মানুষের কি একজন নিয়ে চলে? কত পুরুষ দেখলাম।
দেখেছিস। ভাল।
অমন ফাঁকা গলায় কথা কইছে কেন? ওই যে নিরঞ্জনবাবু, কতটা চেনে ওঁকে? যখন আগেরবার এখানে ঠিকাদারি নিয়ে এলেন তখন দেখেছি, রাতে ফুলিয়া বলে একটা কামিনকে রোজ ঘরে নিত।
জানি।
জানো?
জানব না কেন? সবাই জানে। ওটা হল দুপক্ষের বন্দোবস্ত। এরও দরকার, ওরও দরকার।
তোমার বুঝি দরকার নেই?
নিমাই মাথা নাড়ে, না। তুই ঘরে যা।
ঘরে যায় বটে মনো, কিন্তু দুতিন রাত্তির পর ফের আসে।
কয়েকটা টাকা দাও নিমাইদাদা, শোধ দিতে পারব না। অন্য দিকে পুষিয়ে দেবো।
ও সব বলতে নেই রে।
তুমি কী বলো তো!
আমি একটা কিছু না। বুঝতে তোর দেরি হচ্ছে কেন?
তোমার বদনামের ভয় তো! এখানে কে তোমার বদনাম করবে? সবকটাই তো বদমাশ।
সবাই বদমাশ হলে কি চন্দ্ৰ সূৰ্য উঠত? সবাই বদমাশ যদি বা হয় তাতেই কি আমাদেরও সব বাঁধ ভেঙে দিতে হবে?
আচ্ছা লোক তুমি মাইরি।
শুয়ে থাকগে মনো। মাথা ঠাণ্ডা কর গে।
টাকা দেবে না?
শুধবি কি করে?
ঠিক শুধবো।
ও হয় না রে। আমাকে টাকার ফেরে ফেলিস না। আমি বড় গরিব।
মনো কাঁদে। হার মানে। শেষে বলে, মোটে বিশ-বাইশ বছর বয়স আমার, এই বয়সেই সব চলে গেল। তোমার মায়া হয় না।
দুর পাগল! মায়া হবে না কেন? মায়া হলেই কি ঘর করতে হয় নাকি?
মনে চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, মেয়ে হয়ে জন্মালে বুঝতে পারতে কেমন ঘেন্নার জীবন আমাদের। একটা পুরুষ মানুষ না হলে আমাদের সব নেতিয়ে পড়ে। সেই পুরুষ আমাকে পছন্দ করবে কিনা, আমাকে রাখবে কিনা তাই নিয়েই সারাক্ষণ বুকের মধ্যে ধুকুপুকু। মেয়েমানুষের বেঁচে থাকাটাই কত ঘেন্নার কথা।
তুই অমন অস্থির হচ্ছিস কেন? ধৈর্য ধরে দেখ কী হয়।
উপদেশ দিও না গো। সব জানি। আমাদের আবার কী হবে। লেখাপড়া জানি না, রূপ নেই, টাকা নেই। আমাদের মতো মেয়েদের গতি কি হয় জানোনা? শেষ অবধি গিয়ে ভাগাড়ে পড়তে হবে। শেয়াল-শকুনে ছিঁড়ে যাবে। মা গো!
উঃ! ও সব কথা বলিস না মনে। বলব না।
চোখের সামনে যা সব দেখছি।
ব্যথিত, দুঃখিত নিমাই চুপ করে বসে থাকে। সে তো আর অন্ধ নয়। মেয়েমানুষের মাংস নিয়ে ব্যবসা সে কিছু কম দেখেনি।
তুমি লোক বড় ভাল গো, নিমাইদাদা। আমার একটা গতি করে দাও। নইলে কিন্তু কপালে আমার লাইনে নামাই আছে।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মনোর গতি সে কি করে করবে বুঝতে পারে না। তার ছোট্টো কারবারে তো বেশি লোক লাগে না। তার চেয়ে বড় কথা, মনো কাছাকাছি থাকলে তার বিপদের ভয়টাও থেকে যাবে।
মনে চলে যাওয়ার পরও নিমাই বসে বসে অনেকক্ষণ মেয়েমানুষ নিয়ে ভাবে। বীণাপাণিও মেয়েমানুষ। যখন বিয়ে হয়ে কিশোরী বীণাপাণি এল তখন ভিতু, ছোটোখাটো, অভিমানী, সোহাগী মেয়েটা যেন নিমাইয়ের অন্ধকার জীবনটাই আলোয় ভরে দিয়েছিল। বীণাপাণি আজও নিমাইয়ের কাছে পুরোনো হয়নি। আজও রোজ, সর্বদা মনের মধ্যে বীণাপাণির যাতায়াত। কিন্তু বীণাপাণি নিমাইয়ের কাছে যা, অন্যের কাছে তো তা নয়। সে যাত্রার নটী, একা, অভিভাবকহীন। সেও
