সেই কথাই বলছিলেন, এখন কাজকর্ম ছেড়ে যদি ঘর-বসা হয়ে যাই তাহলে আর কদিন বাঁচবো? ডাক্তাররা বুঝতে চায় না, কাজই হল মানুষের আসল ওষুধ। কাজ বন্ধ করলেই আদি-ব্যাধি এসে ধরে।
নিরঞ্জনবাবু চৌকিতে বিছানায় চাদুরমুড়ি দিয়ে বসা। মুখামুখি একখানা টুলে নিমাই। নিমাই মাথা নেড়ে বলে, ডাক্তাররা শরীর চেনে, রোগ চেনে, গোটাগুটি মানুষটাকে তো বুঝে উঠতে পারে না। মনটায় যদি অশান্তি হয়, যদি ছটফট করে তবে কি দেহে শান্তি হয়?
তবেই বোঝে। আমার দুই ছেলে, ছেলেদের মা, বউমারা, মেয়েরা সবাই এমন গাজি গাজি করে ধরল, কিছুতেই কাজে বেরোতে দেবে না। তাদের ধারণা, টাকা রোজগার তো মেলা হল, এবার ঘরের সুখ ভোগ করলেই হয়। ঘরের যে কী সুখ তা তো আমি জানি। ছেলেদের দুটো দোকান করে দিয়েছি। একখানা রং আর হার্ডওয়্যারের, অন্যখানা পাম্পসেট আর ইনজিনিয়ারিং। চলছেও ভাল। টাকার অভাব নেই। কিন্তু বাড়ির মধ্যে দেখবে দিনরাত মাথা গরম, দিনরাত ঝগড়াকাজিয়া। ছোটোখাটো ব্যাপার থেকে কুরুক্ষেত্র হয়ে যায়। আমার যখন প্রথম স্ট্রোকের মতো হল কদিন বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। বাড়ির আবহাওয়ায় আমার ফের স্ট্রোক হওয়ার জোগাড়। শেষে একটা নার্সিংহোম-এ গিয়ে পালিয়ে বাচি। এই বেশ আছি বাবা। কাজ করতে করতেই একদিন ফুটুস করে মরে যাবো, সেই ভাল।
মরার কথা বলেন কেন? সে যখন আসার আসবে। বেঁচে থাকার কথা ভাবাই তো ভাল। বাঁচার ইচ্ছেটা জোরদার থাকলে তার জোরে আয়ুও খানিকটা বেড়ে যায়।
আমিও তাই বলি। চিরকাল মাঠে-ঘাটে কাজ করে করে আমার মনটা কেমন সবসময়ে উড় উড় থাকে। ঘরসংসারের বাঁধা পড়লেই যেন ওসব মরুনে চিন্তা পেয়ে বসতে থাকে। এই যে শখানেক লোকের গ্রাসাচ্ছাদন হচ্ছে, একটা কিছু তৈরি করছি—এ সবের কি আনন্দ নেই?
দুজনেই খানিক চুপ করে থাকে।
নিরঞ্জনবাবু হঠাৎ বলেন, তোমার কথা তো কিছুই খুলে বললে না আমায়? এ কবছর করলেটা কী?
নিমাই একটু হেসে মাথা নিচু করে বলে, সে এক লজ্জার কথা।
কেন, লজ্জার কী?
বিয়ে বসে প্রায় ঘরজামাই হয়েছিলুম। কটা বছর নষ্ট করলুম। না হল সংসার, না কাজকর্ম।
ঘরজামাই ছিলে! সে আবার কেমন?
ঘরজামাই যাকে বলে তা নয় অবিশ্যি। তবে বউয়ের পয়সায় দিন গুজরান হত।
বউ কোথায়?
সে আমাকে ত্যাগ দিয়েছে।
বউকে ত্যাগ করা মহা পাপ, তা জানো?
আমি ত্যাগ করার কে? বউই আমাকে একরকম ঘাড় ধাক্কা দিল যে।
বলো কি! এ তো ঘোর অন্যায়। কেন, তোমাকে তার পছন্দ নয়?
সে জানি না। ছিম তো একই সঙ্গে। তবে অন্য একটা বখেরা জুটল, সেটাই কাল হল।
অন্য কোনও ছেলেছোকরা নাকি?
না। সেটা বলা যাবে না।
যাত্ৰাদলে নেমেছে সেটাও ভাল কথা নয়। যাত্ৰা-থিয়েটার বাইরে থেকেই ভাল, ভিতরে নালী ঘা।
তা বটে।
তুমি চেপে বসে থাকো। ব্যবসাটা বাড়াও! বউ যদি কখনও নিজের ভুল বুঝতে পারে তাহলে নিজেই ফিরবে। জীবনের ভুলগুলো মানুষ যতদিন নিজে না বুঝতে পারে ততদিন তাকে ফেরাতে চেষ্টা করে লাভ হয় না। ওটা হল নিশির ডাকের মতো।
তা বটে। ব্যবসার কথা কিছু ভাবছো? ক্যাটারিংটা ভালই চলছে।
দুর বোকা! ওটুকুতে আটকে থাকলে চলবে কেন? একখানা দোকানঘর দেখ। তোমার ব্যবসার মাথা আছে, রান্নার হাতও খুব ভাল। তার ওপর তোমার স্বভাবখানা নরম। তোমার হবে। শুধু দেখো, বাকি-বকেয়ার ফেরে পড়ে যে না। ধার-বাকির পাল্লায় পড়েই অধিকাংশ দোকান লাটে ওঠে।
যে আজ্ঞে।
দুপাঁচ হাজার টাকা আমার কাছে সব সময়েই পাবে। তোমার কাছে আমার টাকা কখনও মার যাবে না। দুচারটে লোককে যদি মরার আগে দাঁড় করিয়ে দিয়ে যেতে পারি তাহলেই আমার সুখ।
নিরঞ্জনবাবুর দিকে চেয়ে চোখে জল আসতে চায় নিমাইয়ের। সে মাথা নেড়ে বলে, দোকানই দেবো।
দাও। বেশ গোড়া বেঁধে লেগে যাও। ব্যবসার পিছনে যেন একটু সেবাবুদ্ধি থাকে। বেশির ভাগ ব্যবসাদাররাই চায় লোকের ঘাড় ভেঙে পয়সা লুটতে। ওরকম মন থাকলে হয়ও না ভাল। তোমার মনটা হবে অন্যরকম। ব্যবসার পিছনে লোককে সেবা করার মতলব যদি থাকে, তাহলে দেখো কি থেকে কি হয়ে যাবে। একটু কম লাভ রেখো, আর লাভের অর্ধেক ব্যবসাতেই লাগাবে। তাতে ব্যবসা বাড়বে।
নিমাই এ সব কথা রাত জেগে জেগে বসে ভাবে। নিরনবাবু বড় খাঁটি লোক।
নন্দর বউটা ইদানীং বড় ঘুর ঘুর করছে। লক্ষণ সব চেনে নিমাই। নন্দ বেশি পাত্তা দিচ্ছে না বউকে। ইদানীং ভাতকাপড়ও বন্ধ করেছে। বউটা এখন আতান্তরে। তার এখন একজন পুরুষ চাই। এমন পুরুষ যে রাখবে। রাতের দিকে এসে আজকাল পাশটিতে বসে পড়ে, তারপর রাজ্যের কথা ফাঁদে।
ও নিমাইদাদা, অমন গোমড়া মুখ করে থাকো কেন গো?
মেয়েটার জন্য নিমাইয়ের কষ্ট হয়। সে তো জানে, মনন শরীরের টানে তার কাছে আসে না। আসে পেটের টানে। দুমুঠো ভাত, মাথার ওপর চাল, দুচারখানা কাপড়, কয়েকটা টাকা এই হলেই বাধা মেয়েমানুষ।
নিমাই বলে, ঘরে যা মনো, শুয়ে থাক গে।
ঘুম আসে না বলেই তো আসি। রাতটা যে কাটতে চায় না।
এত রাতে এই যে আসিস, এটা ভাল দেখায় না।
খারাপেরই বা কি বলে? আমাদের তো দুকান কাটা। লজ্জা কাকে? তোমার বউ তোমাকে কাঁচকলা দেখিয়েছে আর আমার বর আমাকে নেয় না। তো কাকে আর পরোয়া?
ওরকমভাবে বলতে নেই, ভাবতেও নেই।
তুমি বড্ড ভিতু মানুষ গো।
খুব ভিতু। আমাকে দিয়ে তোর কিছু হবে না।
কেন হবে না শুনি? নন্দ নেয় না বলে তো আর পচে যাইনি।
