নপাড়ার ছেলেটা একাই ছিল। দল জুটিয়ে আসেনি। ভাগ্যিস। তাই একখানা ঢিলের ওপর দিয়ে গেছে। পটল নেমে গোপালকে নামাল। তারপর সাইকেলখানা শুইয়ে রেখে পুকুরের জলে মুখের রক্ত ধুয়ে নিল। বনস্পতির বাটিটাও চুবিয়ে নিল জলে। বনস্পতি শক্ত জিনিস। জলে ধুলে ক্ষয় হয় না।
গোপাল তার দুটো অবাক চোখে চেয়ে আছে। গোলগাল, ন্যাদাতেদা ভাইটাকে দেখে বড় মায়া হল এখন। ঢিলটা ওরও লাগতে পারত। ভাগ্যিস হোকরার হাতের টিপটা ভাল, তাই গোপালের লাগেনি।
পটলের রাগ হল না। রাগের চেয়ে অনেক বেশী তার ভয়। এতক্ষণে গোপাল আর সাইকেল সমেত তার জলে হাবুড়ুবু খাওয়ার কথা।
সাপটা খুব দাপাচ্ছে এখনও। মরেনি। এক চুলও এগোতে পারেনি। দাপাতে দাপাতে ওখানেই এক সময়ে মরে পড়ে থাকবে। এই পাপেরই কি নগদ সাজা পেয়ে গেল পটল!
সাইকেল দাঁড় করিয়ে গোপালকে ফের রড়ে তুলে দিল পটল। তার ক্ষতস্থান খুব জ্বালা করছে, ফুলে উঠেছে এর মধ্যেই। চারদিকটা খুব ভাল করে দেখে নিল সে। এ দিকটায় পতিত জমি, আগাছা আর জঙ্গল। গোর্সাইপাড়া আর একটু এগিয়ে। পথটা খুব নির্জন।
কালঘড়ি না কি একটা জিনিস দেখেছে দাদু। সে জিনিস দেখলে লোকে নাকি আর বেশিদিন বাঁচে না। তার বাবা রামজীবনের যত দোষ থাক, কিন্তু নিজের মা-বাপকে বড় ভালবাসে। তাই নিয়ে বাড়িতে নানা অশান্তি হয়। কিন্তু মাবাপের ওপর আর কারও কথাকে গ্রাহ্য করে না রামজীবন দাদু মাঝে মধ্যে নানারকম বায়না করছে আজকাল। দিন তিনেক আগে পুলিপিঠে খেতে চাইল। বর্ষাকালে পিঠে করে না কেউ। তবু হল। আজ সকালে ঠাকুমাকে বলল, দুখানা লুচি করে দেবে। ঠাকুমা ধমক দিয়েছিল, কিন্তু বাবা বলল, না না করে দাও। বুড়ো মানুষ, ভাল-মন্দ কিছু তেমন খাওয়াতে পারি না।
দাদু লুচির জন্য দাওয়ায় বসে আছে। আটা মাখা হচ্ছে। দেখে এসেছে পটল। আর দেরি করা ঠিক হবে না।
পটল সাইকেলে উঠে প্যাডেল মারতে লাগল। পিছনের চয় পাম্প কিছু কম বলে মনে হচ্ছে। গনার দোকানে আগে পাম্প করতে পয়সা লাগত না। আজকাল দশ পয়সা করে নিচ্ছে। একটা পাম্পার হলে…।
না, তাদের অত ফালতু পয়সা নেই।
বাড়ির দাওয়ায় যখন সাইকেলখানা ঠেস দিয়ে দাঁড় করাল পটল, তখন ফের রক্ত পড়ছে। তার খয়েরি জামার বা দিকটায় মস্ত দাগ ধরেছে।
দরজার বাইরে থেকেই রান্নাঘরের ভিতরে বাটিটা ঠেলে দিয়ে পটল বলল, মা, এই যে লুচি ভাজার ঘি।
মা পোঁস করে উঠল, লুচি খাওয়ার ইচ্ছে হলে বড়লোক ছেলের বাড়ি গিয়ে থাকলেই তো হয়। তিন দিনেই তো বড় গিন্নির মেজাজ সপ্তমে উঠেছিল। ঘাড় ধাক্কা দিতে পারলে বাঁচে। উঁচু বাড়িতে থাকলেই হল বুঝি! মনটা উঁচু করতে হয় না।
বড় ঘরের কুলুঙ্গিতে হাতকাটা তেল আছে। শিশিটা নামিয়ে কাটা জায়গায় তেলটা লাগাতে গিয়ে পটল টের পেল, ক্ষতটা বেশ গভীর। বাঁ দিকের গোটা মুখখানাই ফুলে বিষিয়ে আছে।
গোপাল তার হাঁটু ধরে দাড়িয়ে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে দেখছে। সব সময়ে তার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে, সব টের পায়, শুধু কথা কইতে পারে না। শুনতেও পায় না কিছু।
হাঁটু গেড়ে বসে গোপালের করুণ মুখখানার দিকে চেয়ে হেসে পটল বলে, কিছু হয়নি রে। সব ঠিক হয়ে যাবে।
লুচি ভাজার একটা উচাটন গন্ধে চনমন করে উঠল বাতাস। এই কচুঘেঁচুর সংসারে এমন বিদেশী গন্ধ বড় একটা পাওয়া যায় না। নাক উঁচু করে গন্ধটা নিল পটল। গোপাল শব্দ টের পায় না বটে, গন্ধ কিন্তু পায়।
দাদু উদাস মনে দাওয়ায় জলচৌকিতে বসে আছে। লুচি হচ্ছে। কিন্তু লুচির দিকে যেন ততটা মন নেই। সকালে সুচির কথা মনে হয়েছিল, এখন যেন ভুলে গেছে সে কথা। পাকা বাড়ির কংকালটার দিকে চেয়ে আছে।
দাদুর কাছাকাছি গিয়ে দাওয়ায় বসল পটল। কাছ ঘেঁষে গোপাল। লুচির ভাগ তারাও পাবে। সঙ্গে কিছু থাকতে পারে। না থাকলেও কিছু অসুবিধে নেই। শুধু শুধু সুচিও খেতে চমৎকার।
ও দাদু!
কি রে?
সুচির গন্ধ পাচ্ছে।
বিষ্ণুপদ মাথা নাড়ে, পাচ্ছি। হচ্ছে বুঝি?
বাঃ, হবে না! ঘি নিয়ে এলাম বটতলা থেকে।
বেশ বেশ।
তুমি কি এবার মরে যাবে?
আর কি! এবার গেলেই হয়। বাড়িটা হলে বেশ হত।
হবে তো! মিস্তিরি আসবে।
তোকে কে বলল।
শুনেছি।
বিষ্ণুপদ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, পারবে রামজীবন? শেষ অবধি পারবে তো! সাপটা যে ফণা তুলে আছে! কখন ছোবলাবে তার তো ঠিক নেই কিনা।
সাপ! কোন সাপের কথা বলছো?
মরণের কথা রে। যে শালা সারাটা জীবন ফণা তুলে রইল। সাপের ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে আছে আমাদের ওপর। কবে কখন মর্জি হবে, দেবে ছুবলে। তা সেই সাপের ছায়ায় বসে তো, কিছুই নিশ্চয় করে বলা যায় না। মানুষের সব ঠাট-ঠমক তার কাছে বড় জব্দ।
পটল কথাটা ভাল বুঝল না। চুপ করে রইল। সামনেই তাদের পাকা বাড়ি আধখানা উঠে থেমে আছে কবে থেকে। পঞ্চানন ঘোষ আর ইট দেবে কি? সাতশো টাকা এখনও বাকি। তবে কয়েক বস্তা সিমেন্ট এসেছে কয়েকদিন আগে। পটল যতদূর জানে, এ চোরাই সিমেন্ট। বটতলার গিরীনের চায়ের দোকানে কাজ করে পাঁচু। সেই বলেছে, একটা সিমেন্টের ট্রাক সুঠ হয়েছে কদিন আগে। পুলিশ এল বলে।
পুলিশ এখনও আসেনি। আসবে কিনা কে জানে। বাড়িটার ওপর দাদুর খুব টান।
তুমি কী একটা জিনিস যেন দেখেছো দাদু! কালঘড়ি না কী যেন।
কত কী দেখি। মানে বুঝতে পারি না। বুঝলি! তোদের যেমন মানে-বই আছে, শব্দের অর্থ, বাক্যের অর্থ দেওয়া থাকে, ঠিক তেমনি একখানা মানে-বই থাকলে ভাল হত। আজকাল তো কত সরল জিনিসকেও ভারি গোলমেলে লাগে। হ্যাঁ রে, বটতলা থেকে তোর বাবার খোঁজে কারা সব আসে? তারা কি ভাল লোক।
