না দাদু। খুব হেক্কোড় মানুষ সব।
কথাটা কী বলি? হেক্কোড় না কি? ওটার মানে কি?
সবাই বলে ওরা সব হেক্কোড়। খারাপ লোক।
কিসের খারাপ করে তারা?
কে জানে! চাউনি দেখলে ভয় ভয় করে।
তা হবে। আগে দুনিয়ায় এত খারাপ লোক ছিল না। এখন খুব হয়েছে, না রে?
পটল মাথা নেড়ে বলে, সবাই ওদের খুব ভয় খায়। খাতির করে চলে।
বিষ্ণুপদ একটা শ্বাস ফেলে বলে, ওই বাস রাস্তাটা না হলেই ভাল ছিল। যতদিন হয়নি ততদিন গণ্ডগোল ছিল না। যখন প্রথম এসেছিলাম দেশ থেকে তখন কেবল চাষাভুষোর রাজত্ব। এক পাল এসে এখানে সেখানে বাঁশ গেড়ে বেড়া তুলে বসে গেলাম। ক্রমে জমিজিরেত একটু হল। কষ্ট ছিল, কিন্তু তেমন ভয়ডর ছিল না।
চোর ছিল না?
খুব ছিল। চোর ডাকাত সব ছিল। তবু ভয় ছিল না। কেন জানিস? এমন মদ আর জুয়ায় ছয়লাপ ছিল না চারদিকে। চোর ডাকাত বাইরে থাকবেই। সে থাকুক। ভয়টা হল, চোর ডাকাত যখন ভিতরে হয়ে ওঠে।
সেটা কেমন?
বললেই কি বুঝতে পারবি? চোর ডাকাতেরা আগে বাইরে থেকে আসত। আজকাল সব গা ঘেঁষেই বসত করে। এমন কি আমাদের মধ্যেই গজিয়ে ওঠে।
মেজো বউ রাঙা লুচির থালা নিয়ে বিরক্ত মুখে দাওয়ায় উঠে এসে বলল, লুচি খাবেন তো! বসুন।
বিষ্ণুপদ একটু অবাক হয়ে বলল, অবেলা হয়ে যাবে না।
খেতে চাইলেন যে!
কটা বাজে জানো?
নটা বাজে বোধ হয়। নিন, গরম আছে।
বিষ্ণুপদ তবু হাত গুটিয়ে থাকে। আমতা আমতা করে বলে, তোমার শাশুড়ি কোথায় গেল?
দোকানে পাঠিয়েছি। ফোড়নের সর্ষে আনতে গেছে। থালাটা ধরুন, আমার মেলা কাজ পড়ে আছে।
ওদের দেবে না?
ওরা সকালে ভাত খেয়েছে।
দুখানা করে দাও। এখান থেকেই দাও। এ তো মেলা লুচি দেখছি, একটা পল্টনের খোরাক।
আপনার ছেলে হুকুম দিয়ে গেছে যেন সাধ মিটিয়ে খাওয়াই। কম করতে ভরসা হয়নি, তাহলে তো এসে কিলোবে। বিষ্ণুপদ লুচির থালাটা ধরে থাকে। রাঙা চলে যাওয়ার পরও ধরে থাকে। খায় না। ইচ্ছেটা মরে গেছে।
ও দাদু, খাও।
কি জানি কেন, খেতে ইচ্ছে যাচ্ছে না। তোর ঠাকুমাকে ডাকবি একটু?
লুচি দেখেই বোধ হয় একটু চঞ্চল হয় গোপাল। ঘন ঘন ঘোৎ ঘোৎ শব্দ করে। ওই শব্দ ছাড়া আর কিছু জানে না। মাতাল রামজীবন মাঝে মাঝে মধ্যরাত্রে ছেলেটাকে ঘুম থেকে তুলে বড় মারে। মারে আর বলে, কথা ক হারামজাদা, কথা বের কর মুখ থেকে। বোবা হয়ে আমাকে জব্দ করবে ভেবেছো শালা? মারের চোটে তোরমুখ দিয়ে কথা বের করে ছাড়বো।
তারপর পেটায় আর পেটায়। কেউ থামাতে পারে না। সারা বাড়িতে হুলুস্থল পড়ে যায়।
আর অত মারের চোটেও কাঁদতে পারে না গোপাল। শুধু গোঁ গোঁ শব্দ করে, আর ফোপায়। আর কাঁপে। থরথর করে কাঁপে।
মাও মারে। যখন তখন মারে। গোপালের কোনও বায়না নেই। তবে খিদে আছে। খিদে পেলে জিনিস ভাঙে। লাফায়। ছোটাছুটি করে বিপদ ডেকে আনে। তখন মারে মা।
গোপালকে বোঝে শুধু পটল। আর কেউ নয়। বড় হলে সে গোপালকে নিয়ে দূরে গিয়ে থাকবে। এ বাড়িতে থাকবে না। এদের সঙ্গে থাকবে না।
দাদু লুচি ভাগ করে দিল দুজনকে। দুটো করে।
দুপুরে রামজীবন ইরফান মিস্ত্রিকে নিয়ে ফিরল। খুব কথা হচ্ছিল দুজনে। ইরফান পাকা ঘরখানা ঘুরে ফিরে দেখছে।
কত দিনে পারবে ইরফান?
বাদলাটা না ছাড়লে তো কঠিন হবে রামজীবন।
তাই যদি হবে তো তোমাকে ডাকলুম কেন? তুমি ওস্তাদ লোক, খাড়া করে দাও।
ভারী জল না হলে হয়ে যাবে। নইলে বালি সিমেন্ট সব ধুয়ে যাবে। পয়সা বরবাদ।
হবে না কিছুতেই?
ইরফান দোনোমোনো করে বলে, ডবল খাটনি না পড়ে যায়। বালি সিমেন্ট সব রেডি আছে?
এনে ফেলব।
ইট ভিজিয়ে রাখবেন। রবিবার এসে হাত লাগাব। একটু কাগজ-কলম দিন। ইট সিমেন্ট আর বালির হিসেবটা লিখে দিয়ে যাই। লোহার শিক, বাঁশ এসবও লাগবে।
সে তো খোকাটিও জানে! লেখো, লিখে দিয়ে যাও।
রামজীবন চান করতে গেল। পটল দুনিয়া ভুলে ইরফানের কাছ ঘেঁষে বসে রইল।
মাটি থেকে ইট। ইট সাজিয়ে বাড়ি। একটা থেকে আর একটা, তা থেকে আর একটা কেমন হয়ে ওঠে। পটলের বড় ভাল লাগে। মাটি থেকে ইট। ইট থেকে বাড়ি।
আবার সেই বাড়িও পুরনো হয়। ভেঙে ভেঙে পড়ে। মাটিতে মেশে। মাটি হয়ে যায়। আবার মাটি থেকে ইট। ফের ইট সাজিয়ে বাড়ি।
০০৭. পৃথিবী কি দাড়ি কামায়
পৃথিবী কি দাড়ি কামায় বাবা?
না না, পৃথিবী মোটেই তার খোঁচা খোঁচা দাড়ি কামাতে চায় না। কিন্তু মানুষ বারবার জোর করে তার খেউরি করে দিচ্ছে। পৃথিবীর দাড়ি হল সবুজ। যদি আকাশের অনেক ওপরে কোনও স্যাটেলাইটে বসে দেখ, তাহলে দেখবে ওই সবুজ কত সুন্দর! গ্লোরিয়াস গ্রিন। আর কোনও গ্রহই এত সুন্দর নয়।
তুমি কি করে দেখতে পাও বাবা?
আমি চোখ বুঝে ভিসুয়ালাইজ করি। আমাদের মোটে দুটো চোখ, তা দিয়ে তো অত দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু কল্পনাশক্তিও আর একরকম চোখ। তা দিয়েও দেখা যায়। কিরকম জানো? কালো মিশমিশে আকাশে সবুজ আর নীলে মেশানো একটা স্নিগ্ধ মুখ। মাথায় বরফের সাদা চুল, গলায় বরফের সাদা একটা বো।
চোখ বুজলে আমিও দেখতে পাবো?
নিশ্চয়ই পাবে। তুমি তো ছোটো, তোমার ইমাজিনেশন আরও ভাল। তুমি সহজেই পারবে।
কিন্তু পৃথিবীর দাড়ি কামানোর কথাটা বললেনা!
পৃথিবীর দাড়ি হল তার গাছপালা, শস্যক্ষেত্র। একমাত্র পৃথিবী ছাড়া দৃশ্যমান কোনও গ্রহে প্রাণের লেশমাত্র নেই। তাই পৃথিবী তুলনাহীন। প্রাণহীন নিথর সৌরমণ্ডলে শুধু এই একটা গ্রহেই গাছ জন্মায়, জীবজন্তু ঘুরে বেড়ায়, মানুষ কথা বলে। কিন্তু এই গ্রহের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীটিই সবচেয়ে বেশী বোকা। সে পৃথিবীর সবুজ দাড়ি কামিয়ে দিতে চাইছে। আর ডেকে আনছে সর্বনাশ। সে ব্রাজিলের রেন ফরেস্ট থেকে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল সব জায়গা থেকেই কেটে নিচ্ছে গাছ। গাছ কেটে বসতি বানাচ্ছে, কলকারখানা সাচ্ছে, কাঠ পুড়িয়ে আগুন জ্বলছে, কাঠ দিয়ে আসবাব আর ঘরবাড়ি বানাচ্ছে। গাছ কাটছে, কিন্তু সেই পরিমাণে গাছ বসাচ্ছে না। এইভাবে চলতে থাকলে একদিন স্যাটেলাইট থেকে দেখা যাবে, কালো আকাশে যে সুন্দর ঢলঢ়লে নীলচে সবুজ হাসি-হাসি মুখখানা ভেসে থাকত সেটা একেবারে পশুটে হয়ে গেছে। বুঝতে পারলে?
