নপাড়া যেমন ভয়ের তেমনই আরও কিছু ভয়-ভীতির জায়গা আছে তার। ওই যে পঞ্চাননের ইটভাটি। ও রাস্তাটা তাকে এড়িয়ে চলতে হয়। পঞ্চানন ঘোষের কাছে ইট বাবদ এখনও সাতশো টাকা বাকি। পটলকে দেখলেই ডেকে তার বাপের উদ্দেশে খারাপ খারাপ কথা শোনায়।
এ সব এড়িয়ে, চোখ কান খোলা রেখে চললে এ জায়গা যে কত সুন্দর তা জানে পটল আর গোপাল। গোপাল কখনও মুখ ফুটে বলতে পারবে না, কত সুন্দর এই গ্রামখানা। গোপালের চোখ থেকে সেটা বুঝে নেয় পটল। গোপাল পাখির ডাক শুনতে পায় না, ঝিঁঝির ডাক শুনতে পায় না, সাইকেলের ঘন্টি শুনতে পায় না। তার বোবা আর কালা পাঁচ বছর বয়সী এই ভাইটি তবু অনেক কিছু টের পায়। সবচেয়ে বেশী টের পায় বিপদ। তাদের দুই ভাইয়ের ঘরে আর বাইরে অনেক রকমের বিপদ থাকে বোজ। মায়ের মেজাজ বিগড়োলে, বাবা মাতাল হয়ে ফিরলে, কাকীমার সঙ্গে মায়ের ঝগড়া লাগলে, কাকার সঙ্গে বাবার লেগে গেলে তাদের দুই ভাইয়ের ওপরেও কিছু ঝাল ঝাড়া হয়ে থাকে। ইদানীং বটতলার কয়েকটা লোক বাবার বন্ধু জুটেছে। সেটাও এক বিপদ, কারণ লোকগুলো এলেই তাকে বাবার খোঁজে বেরোতে হয়, নয়তো নিতাইকাকাকে গিয়ে খবর দিতে হয়। নিতাইকাকা হল এ গায়ের গান্ধীবাবা। সকলের ভাল করে বেড়ায়, ঝগড়াকাজিয়া থামায়, সবাইকে ভাল হতে বলে। নিতাইকাকা গাঁটগচ্ছা দিয়ে অন্যের সাহায্য করে, মড়া পোড়াতে যায় আর বক্তৃতাও দেয় মাইকে। তবু নিতাইকাকার মতো লোক থাকতেও বটতলায় বদমাইশি বাড়ছে, মদের টেক হচ্ছে, নপাড়ার ছেলেরা কলোনিতে ঢুকে মারপিট করে যাচ্ছে, চুরি ডাকাতি হচ্ছে, ব্ল্যাক হচ্ছে।
গান্ধীবাবাই কি পেরেছিল? এই যে দেশ ভাগাভাগি হল বলে তাদের যে সোনার দেশ ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল, তখন গান্ধীবাবা কাদেনি? আর সুভাষ বোস? আর শ্যামাপ্রসাদ। আরও কে যেন। সব ঠিকঠাক জানে না পটল। তবে এরকমই সে শুনেছে বটে তার ঠাকুর্দা আর বাবার কাছে।
তবে সাইকেল চালানোর সময় বেশী ভাবতে নেই। ভাবলেই বিপদ। চোখ কান একেবারে সজাগ রাখতে হয় রাস্তার দিকে। এ গায়ের রাস্তাঘাট সব তার চেনা। সবসময় রাস্তা ধরে সাইকেল চালায় না পটল। তাতে অনেক ঘোরা পড়ে যায়, আর তাতে বাহাদুরীও নেই। বটতলার পাণুর দোকান থেকে কেনা বনস্পতির বাটিটা তার বাঁ হাতে ধরা, ডান হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল, রডে গোপাল শক্ত হয়ে বসে আছে দুহাতে হ্যাভেল ধরে। এই অবস্থায় সে বটতলার শীতলার থানের। বাঁ দিকের রাস্তা ছেড়ে ঘোষপাড়ার মাঠে নেমে পড়েছে। চষা ক্ষেতের মতো উঁচু-নিচু আর ঢিবিতে ভর্তি মাঠ। বর্ষার জলে হড়হড়ে হয়ে আছে কাদা। চাকা বসে যায়, এক জায়গায় ঘুরতে থাকে। কত কী হয়। পটল বলেই পারে। গোসাইপাড়ায় ঢুকবার মুখে দুধারে দু-দুটো পুকুর, মাঝখানে ক্ষয়া, পিছল, সরু একখানা রাস্তা। খুব ওস্তাদ সাইকেলবাজও এ রাস্তায় চালাবে না। নেমে হেঁটে পার হবে। পটল ঠিক পেরিয়ে যায়।
আজও পেরোচ্ছিল। কাল থেকে বৃষ্টি হয়নি। তবে আকাশ মেঘলা হয়ে থম ধরে আছে। ফ্যাকাসে মেঘ। কতকাল রোদের দেখা নেই। একটা দিন বৃষ্টি হয়নি বলে কাদাটা আঁট হয়ে আছে। আঁট কাদা আরও বিপদের জিনিস।
বা ধারের পুকুর থেকে একটা সাপ উঠে ডানধারের পুকুরে নামতে যাচ্ছে। সেটা দেখতে পেয়েই বোধ হয় গোপাল গলায় একটা ঘোৎ ঘোৎ শব্দ তুলে সাবধান করছে তাকে। গোপাল ওভাবেই জানান দেয় বিপদের কথা, খিদের কথা, আনন্দের কথাও। ওই শব্দটাই তার সম্বল।
সাপকে বাঁচিয়ে চলার কোনও ইচ্ছেই নেই পটলের। সাপগুলো মহা খচ্চর। দু-দুটো পুকুর ভর্তি হাজারো জলচেঁড়া চারাপোনা আর ছোটো মাছ সব খেয়ে ফেলে। গায়ের লোক সাপ মারে না বলে ঝড়েবংশে সাপগুলো বেড়েছে কম নয়। একটা দুটো মরলে কি যায় আসে। তাছাড়া হঠাৎ ব্ৰেক কষলে সাইকেল উস্টে দুজনকে নিয়ে পুকুরে পড়বে। পটল ভ্যাক করে সাপের পেটের ওপর দিয়ে পেরিয়ে গেল। পিছু ফিরে দেখার উপায় নেই, সামনে সরু রাস্তা। এক চিলতে জায়গা দুদুটো চাকাকে সমান রেখে পেরোতে হবে। পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটা।
সমস্ত চৈতন্য আর চোখ আর মন একাগ্র রেখে রাস্তাটা শেষ করে এনেছিল প্রায় পটল। কিন্তু গোপাল তবু অফুট শব্দটা করে যাচ্ছে। ঘোৎ ঘোৎ। অন্য কেউ হলে গোপালের ওই বোবা শব্দকে গ্রাহ্যই করত না। কিন্তু পটল জানে, তার এই অবোধ ভাইটাকে লোকে যা ভাবে তা নয়। সে চোখ রাস্তা তুলে এক ঝলক সামনের দিকটা দেখবার চেষ্টা করল।
দেখল, নীল শার্ট পরা কে একজন দাঁড়িয়ে আছে পথের শেষ দিকটায়। কচুবনের আড়ালে তার নিচের অংশ ঢাকা। তার মুখটা দেখতে পেল না পটল।
কিন্তু শক্ত আর জোরালো ঢিলটা সোজা এসে তার বা চোখের নিচে লাগতেই মাথা অন্ধকার হয়ে গেল তার। সাইকেল টলে গেল।
পুকুরেই পড়ত পটল। সাইকেলের সামনে চাকা ডাইনে বায়ে ভয়ংকর মোড় খেল। কিন্তু মাথার অন্ধকারটা এক আঁকিতে কাটিয়ে নিল পটল। তারপর প্রাণপণে প্যাডেল মারল। দুটো গর্তের মতো উঁচু-নিচু জায়গা ঝাং ঝাং করে পার হয়ে সোজা নীল জামার দিকে সাইকেলখানা বাড়িয়ে দিল সে।
হুড়মুড় করে কচুবনে গিয়ে আটকাল তার সাইকেল। ততক্ষণে নীল জামা পরা হোকরাটি হাওয়া হয়েছে। আর বা চোখের কোলথেকে টপটপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে জামায়, বনস্পতির বাটিতে।
সাইকেলটা কাত হয়ে থেমেছে। বাঁ পা বাড়িয়ে পড়ে যাওয়া আটকেছে পটল। ভয় খাওয়া মুখটা তার দিকে ফিরিয়ে চেয়ে আছে গোপাল।
