কৃষ্ণজীবন হাসতে হাসতে বলল, এই যে বলছিলেন আপনার মোটাবুদ্ধি! মোটাবুদ্ধির মগজ থেকে কি এসব কথা বেলোয়?
শোন, আমার তো বিশেষ কিছু নেই। একটা মাদুলি আছে। আমার মাদুলি। তোর ঠাকুমা কোথা থেকে এনে পরিয়েছিল আমায়। কোনও কাজ হয়েছিল কি না জানি না। তবে অনেকদিন আমার হাতে বাঁধা ছিল। এই বছরখানেক হল তাগা ছিঁড়ে যাওয়ায় আর পরিনি। আমার খুব ইচ্ছে হয়, ওটা তোকে দিই।
মাদুলি দিয়ে কী করব বাবা?
বিষ্ণুপদ সলজ্জভাবে মাথা নেড়ে বলে, কিছু করবি না, তোর কাছে রাখবি। এইটেই তোকে দিলাম ওয়ারিশ হিসেবে।
কেন বাবা?
মাদুলি সামান্য জিনিস, ওর সঙ্গে স্বার্থ বা লোভের সম্পর্ক নেই। একটা কিছু দেওয়াও হল, পাঁচজনের চোখ টাটাল না, নিবি কৃষ্ণ।
কৃষ্ণজীবন দুটি হাত পেতে বলল, দিন বাবা। তাই দিন।
বিষ্ণুপদ উঠে ঘরে গেল। বাক্স খুলে একটা কৌটো বের করে আনল। কৌটোর ভিতর থেকে কালপ্রাচীন মাদুলিটি বেরোলো। মাদুলির তাম্রাভ বর্ণ কালচে হয়ে গেছে, ঘেঁড়া তাগাটা তেলচিটে।
অপ্রতিভ বিষ্ণুপদ দ্বিধান্বিত করতলে মাদুলিটা নিয়ে বলল, এটাই। নিবি বাবা? ঘেন্না করবে না তো!
কৃষ্ণজীবনের চোখে জল এল। মাথা নেড়ে বলল, না বাবা। ঘেন্না কেন করবে?
বড় নোংরা হয়ে আছে। পুরোনো তো?
ওইরকমই থাক বাবা। এতে একজন সৎ মানুষের স্পর্শ আছে। দিন।
বিষ্ণুপদ মাদুলিটা তার হাতে দিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসল, মনে মনে ভাবছিলাম, তোকে কী দিই! কাল রাতে হঠাৎ স্বপ্ন দেখলাম, তোক এই মাদুলিটা দিচ্ছি। স্বপ্নের তো মাথামুণ্ডু থাকে না। তবু ভাবলাম, তা হলে দেওয়াই ভাল।
মাদুলিটা পকেটে রেখে কৃষ্ণজীবন বলল, এটা কি পরতে হবে বাবা?
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, না না। পরতে হবে না। তোর বাড়িতে রেখে দিস কোথাও। ওর কোনও ক্রিয়া নেই। শুধু একটা চিহ্ন।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ।
বিষ্ণুপদ হঠাৎ বলল, হ্যাঁ রে, ইনঅ্যানিমেট যা সব আছে, সেগুলো কি সত্যিই ইনঅ্যানিমেট? তুই তো অনেক জানিস, তোর কি মনে হয়?
কৃষ্ণজীবন একটু অবাক হয়ে বলে, ইনঅ্যানিমেট তো জড়বস্তু।
বিষ্ণুপদ খুব লজ্জার হাসি হেসে শিশুর মতোই বলে, কি জানিস, যখন ছোট ছিলাম তখন কিন্তু মনে হত, সব জড়বস্তুই যেন জীয়ন্ত। প্রাণ কি না জানি না, কিন্তু আমাদের সবই ওরা দেখে, বুঝতে পারে, টের পায়। এখনও ঠিক সেরকম মনে হয়।
কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসে বলে, তাতে দোষ কি বাবা? সেরকম হতেও পারে। বিজ্ঞান দিয়ে আমরা আর কতটুকু জানতে পেরেছি।
তোর ওরকম মনে হয় না, না? না বাবা।
ওই যে মাদুলিটা নিলি, কত আদর করে নিলি, ওটা তো ইনঅ্যানিমেট। তাই না? আমার কেন যে মনে হয়, এই মাদুলিটার মধ্যে আমার একটু তরঙ্গ, একটু স্পন্দন রয়ে গেল। জড় বটে, কিন্তু তবু যেন পুরোপুরি জড় নয়।
কৃষ্ণজীবন স্মিত মুখে চুপ করে রইল।
বিষ্ণুপদ বলল, কত কী মনে হয়। গরুটা, কুকুরটা, ছাগলটা, গাছটা সব কিছুকেই যেন মনে হয়, মানুষের মতোই। হয়তো তেমন বুদ্ধি নেই, ক্রিয়া নেই, তবু যেন সবই মানুষ। সবই আমাদেরই ভিন্নরূপ।
এরকম হলে তো ভালই বাবা।
বিষ্ণুপদ খুশি হল। খুব হাসল। দুলে দুলে।
উকিল এল একটু বেলায়। বামাচরণই নিয়ে এল। রামজীবন, বামাচরণ, বিষ্ণুপদ আর কৃষ্ণজীবন মিলে একটা ভাগাভাগির বৈঠক বসল। ঝগড়া-কাজিয়া হল না। শান্তভাবে একটা মুসাবিদা করা হল। নিজের ভাগের সম্পত্তি দানপত্ৰ করে দিল কৃষ্ণজীবন। সবই কাঁচা চুক্তি। পরে আদালত থেকে পাকা হয়ে আসবে। সাক্ষী সাবুদও জুটে গেল কয়েকজন।
বিকেলে অবসন্ন মনে ফেরার ট্রেন ধরল কৃষ্ণজীবন। একা। বড়ই কঁকা ট্রেন। এই একাকিত্ব কৃষ্ণজীবনের আশৈশব সঙ্গী। বাইরে বন্ধুবান্ধব ছিল, আত্মীয়স্বজন ছিল, তবু সকলের মাঝখানে থেকেও কৃষ্ণজীবন মনে মনে ছিল একা, সঙ্গীহীন। বরাবর। বিয়ের পরও। আজ অবধি সেই একাকিত্ব কখনও ঘোচেনি তার। কিন্তু ঘুচবেই বা কেন? সে তত এই একাকিত্বকে আদ্যন্ত উপভোগ করে।
ঠিক একাও নয়। সে যখন একা হয় তখন গোটা বিশ্বজগৎ নিয়ে তার প্রিয় চিন্তা এক রূপকথার জগৎকে উন্মোচিত করে দেয়। সীমাহীনতা, সময়হীনতা পরিব্যাপ্ত হয়ে যে চরাচর, তার রূপ ও অরূপ, তার আলো ও অন্ধকার ভরে রাখে তার মাথা।
একা প্ৰায়ান্ধকার ট্রেনের কামরায় জানালার পাশে বসে সে আজ উপভোগ করছিল এই একাকিত্বকে। বিশাল বিশ্বজগতের কথা যখনই সে ভাবতে শুরু করে তখনই তুচ্ছ হয়ে যায় তার সব প্রিয়জন, তার চাকরি, সাফল্য, প্রতিষ্ঠা। এক দিশাহীন অতল অন্ধকারে আচ্ছন্ন অসীম আর মহাকাল যার শুরু নেই, শেষও নেই—তাকে এসে সন্মােহিত করে দেয়।
পকেট থেকে আনমনে বাবার দেওয়া মাদুলিটা বের করল সে। চেয়ে রইল। কেন বাবা মাদুটিা তাকে দিল তা অন্যে হয়তো বুঝবে না। কিন্তু সে বোঝে। সে বুঝেছে। বাবা এই সামান্য মাদুলিটি হয়ে তার সঙ্গে লেগে থাকতে চায়। বিষ্ণুপদ এর বেশী আর কিছুই চায়নি তার কাছে।
» ০৬৪. নিরঞ্জনবাবুর কাছে বসে থাকলে
নিরঞ্জনবাবুর কাছে বসে থাকলেও কত জ্ঞান হয়। পাকা মানুষ, কত অভিজ্ঞতা। আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, কাছাড় থেকে বিহার অবধি কত ঠিকাদারি যে করেছেন একটা জীবনে তার হিসেব নেই। টাকা কামাতেই বটে, কিন্তু কাজটাও বড় ভালবাসেন।
একটু রাতের দিকে নিরঞ্জনবাবুর কাছে এসে বসে নিমাই। কখনও গান শোনায়, কখনও বসে বসে কথা শোনে। আগে সন্ধের পর একটু-আধটু মদ খেতেন, সিগারেটেরও নেশা ছিল। ডাক্তারের বারণ বলে ছেড়েছেন। এত খাটুনিও ডাক্তারের বারণ। এ বারণটা শোনেননি।
