তিনজন আরও কিছুক্ষণ বসে রইল সজনে গাছের নিচে। ঝিরঝরে ছায়া। শীতের বাতাস। কী ভাল চারদিকটা আজ।
তারপর ভাইপো দুটিকে নিয়ে উঠে পড়ল কৃষ্ণজীবন। আজই ভাগাভাগির কাগজপত্রে সই করে ফিরে যাবে সে। দুদিন বাদেই রওনা হবে আমস্টারডাম। অনেক কাজ বাকি।
বাড়ি ফিরে সে তার বাবার কাছে বসল একটু। একজন উকিল আসবার কথা। এখনও আসেনি।
বিষ্ণুপদ দাওয়ায় রোদে পিঠ দিয়ে বসে নিজের হাত দুখানার দিকে চেয়ে থেকে বলে, এ ভালই হল, কি বলিস বাবা?
অশান্তির চেয়ে তো ভাল।
আমিও তাই বলি। ভাগজোখ হয়ে গেলে যদি ভাব হয়।
আপনি কি তাই ভাবেন?
না বাবা, তা ভাবি না। আশা করি। একটা দুঃখ, তোর কোনও ভাগ থাকল না।
কি করব বাবা ভাগ দিয়ে? আমার তো লাগবে না।
তা জানি। কিন্তু আমার সম্পত্তিতে তোর একটু ভাগ থাকলে তোক আমার ছেলে বলে ভাবতে সুবিধে হয়।
কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসে বলে, ও কি কথা বাবা, ছেলে বলে এমনিতে ভাবতে অসুবিধে কিসের?
তুই যে বড় ওপরে উঠে গেছিস বাবা, আমি যে তোকে আর নাগালে পাই না। নিজের ছেলে তো ঠিকই, কিন্তু ছেলে যখন বড় বেশী কৃতী হয়ে ওঠে তখন যেন ছেলে বলে মনে করতে ভরসা হয় না। যদি এক কাঠা জমিও নিজের নামে রাখতি তবে বুকটা ঠাণ্ডা হত। ভাবতাম, ও তো আমার ওয়ারিশ।
আপনি যে কত অভুত কথা ভাবেন বাবা!
ওটাই তো আমার মস্ত দোষ। অকাজের মাথায় কত উদ্ভট চিন্তাই যে আসে। কি করি জানিস। পটলের ভূগোল বইখানা খুলে ম্যাপ দেখি আর ভাবি, আমার কৃষ্ণজীবন এখন আমেরিকায় আছে। এই ইংলন্ডে আছে, এই অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে। তোর সঙ্গে সঙ্গে আমিও যেন চলে যাই ওসব জায়গায়। ভাবি, কৃষ্ণ তো আমার সত্তারই অংশ, আমিই তো কৃষ্ণজীবন হয়ে জন্মেছি। তাই না?
তাই তো বাবা।
বিষ্ণুপদ খুব হাসে আর মাথা নাড়ে। বলে, এইসব ভাবি আর কি!
বাবা, আপনার কি বিদেশ দেখতে ইচ্ছে করে?
বিষ্ণুপদ সভয়ে বলে, ও বাবা, না।
কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসে বলে, আজকাল যাওয়া কিছু শক্ত নয়। আমি বোধ হয় বছরখানেকের জন্য আমেরিকায় যাবো। আপনি যদি যেতে চান সব ব্যবস্থা হবে।
বিষ্ণুপদ হাঁ করে চেয়ে থেকে বলে, তুই যে বলেছিস এটাই ঢের। আমার অত চাই না।
আজকাল সবাই যায়।
তারা যাক। আমার সইবে না।
কৃষ্ণজীবন চুপ করে রইল। তার বাবা বিষ্ণুপদর পক্ষে যে আমেরিকা যাওয়া ঘটে উঠবে না তা সেও জানে। অত সৌভাগ্য করে আসেনি তার বাবা। কিন্তু বিষ্ণুপদ কি দুৰ্ভাগা? তাও মনে হয় না কৃষ্ণজীবনের। বিষ্ণুপদ বরাবর নিজের দুর্ভাগ্যগুলিকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছে। শান্ত সমাধিস্থ থেকেছে। মনের মধ্যে ড়ুব দেওয়ার কৌশল কি উত্তরাধিকার সূত্রে বিষ্ণুপদর কাছ থেকেই পায়নি কৃষ্ণজীবন।
বাবা, কয়েকদিন কলকাতায় গিয়ে থাকবেন।
বিষ্ণুপদ আবার খুব হাসল। বলল, আজকাল শরীরে নাড়া দিতে ইচ্ছে যায় না। মনে হয়, যত নাড়াচাড়া কম হয় ততই ভাল।
কেন বাবা?
কেমন যেন মনে হয়, শরীরেরও কিছু নালিশ আছে। ছুটি চাইছে। বায়ুপুরাণ পড়িসনি?
পড়িনি, কিন্তু আপনার কাছে শুনেছি।
বইখানা পড়িস। অনেক জ্ঞান হয়।
জ্ঞান তো সবই বই থেকেই হয় বাবা।
তা হয়। তবে বায়ুপুরাণ একখানা বেশ বই। অনেক লক্ষণ চিনিয়ে দেয়।
বাংলাদেশে নিজের গাঁয়ে একবার যাবেন।
কেন, সেখানে কী আছে?
দেশের গাঁ, পিতৃপুরুষের ভিটে দেখতে ইচ্ছে হয় না?
বিষ্ণুপদ হাসে আর মাথা নাড়ে, চোখে দেখে কি সুখ? বরং ভাবলে সুখ হয় একটু। সবই ভাবের জিনিস। নইলে কার মাটি, কার জমি, কার বসত? এগুলো কিছু না। দেশে কি খুব সুখে ছিলাম রে বাবা? খেয়েছি তো সেই কচু ঘেঁচু, বাস করেছি মাটির ভিটির ঘরে। তবু লোকের কেবল মনে হয় দেশে কত সুখে ছিলাম। ওটা হল ভাবের সুখ।
কৃষ্ণজীবন এই সত্যবাদিতায় মুগ্ধ হল। বাবার দিকে মায়াভরে চেয়ে থেকে বলল, বাবা, আপনি বড় ভাল বোঝেন।
বিষ্ণুপদ ঘন ঘন মাথা নাড়া দিয়ে বলে, কিছু না কিছু না। বুঝি কোথায়? এই শেষ বয়সে এসে যেন ফের হামা দিচ্ছি। এই দুনিয়াটা, আর এই আমি, কিছুতেই যেন এই দুইয়ে যোগটা খুঁজে পাই না।
আমিও পাই না বাবা। বোধ হয় কেউই পায় না।
বিষ্ণুপদ তার জ্যেষ্ঠ পুত্রটির দিকে উজ্জ্বল চোখে হাসিমুখ করে চেয়ে থেকে বলল, আমার কী তোকে দিই বল তো! জমি টমি কিছু নিলি না, ওয়ারিশ হলি না।
কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসে বলে, ওগুলো তো বাইরের জিনিস বাবা। আপনার কাছ থেকেই তো সব পেয়েছি। আজই ভাবছিলাম, আপনি যেমন নিজের মনের মধ্যে ড়ুব দিয়ে বসে থাকেন, আমারও ঠিক অমনি স্বভাব। আপনার কাছ থেকে
অনেক পেয়েছি।
বিষ্ণুপদ খুশি হয়ে মাথা নাড়ে খুব। বলে, তা অবশ্য ঠিক। স্ত্রীকে জায়া বলে, তার কারণ স্ত্রীর ভিতর দিয়েই তো পুরুষ আবার জন্মায় তার সন্তান হয়। এ তত্ত্বটা বড় ভাল, ভাবলে একটা বলভরসা হয়।
তাই তো বাবা।
তোর কথা ভেবে খুব তাজ্জব হয়ে যাই মাঝে মাঝে। তোর মাকেও বলি, এই আমরা যেমন, তুই ঠিক সেরকম তো নোস। আমি ভাবি কি, আমার মতো মোটাবুদ্ধি মানুষের ছেলে হয়ে তোর এত বুদ্ধি কেমন করে হল?
কৃষ্ণজীবন খুব হাসল। বলল, বাবা আপনার মোটাবুদ্ধি কে বলে? দেশের গায়ে লেখাপড়ার চাড় ছিল না, চর্চা ছিল না, আপনার তেমন উৎসাহ ছিল না। নইলে হয়তো দেখা যেত আপনি মস্ত মেধারই মানুষ। গায়ে গঞ্জে কত মেধা তো অনুশীলনেরই অভাবে নষ্ট হয়ে যায়।
তা বটে। বলে বিষ্ণুপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, কিন্তু কিছু টের পাইনি কখনও। সারাজীবন একটা কাজই করেছি। ভেবেছি। মেলা ভেবেছি। সবই হাবিজাবি। আর তেমন কিছু করিনি। অবিন্যস্ত চিন্তা। মনে হয় গুছিয়ে ভাবতে পারলে, ভাবনার পরম্পরা ঠিক থাকলেও মানুষ ভেবেই কত কী করতে পারে।
