একটা সজনে গাছের তলায় তিনজন দাঁড়াল পাশাপাশি।
পটল, এই ক্ষেত এখন কে চাষ করে জানিস?
জানি জ্যাঠা। বদরুদ্দিন চাচা।
সে ধানটান ঠিকমতো দেয়?
বেশী দেয় না।
বৰ্গা রেজিস্ট্রি হয়েছে কিনা জানিস?
না জ্যাঠা। ওসব বাবা জানে।
বহুকাল কৃষ্ণজীবন আর খবর রাখে না। এ জমি সে নিজে চাষ করেছে। তার বড় মায়া।
আয়, এখানে একটু বসি।
ঘাসের ওপর, সজনের ঝিরঝরে ছায়ায় বসল তিনজন। গোপাল কথা কইতে পারে না বটে, কিন্তু সে যে তার জ্যাঠাকে পছন্দ করে এটা সে নানাভাবে বুঝিয়ে দেয়। খুব ঘেঁষ হয়ে সে জ্যাঠার সঙ্গে লেগে বসে রইল। কৃষ্ণজীবনের বা ধারে পটল। আজকাল কৃষ্ণজীবন যখনই আসে এ দুটি তার সঙ্গে এঁটুলির মতো সেঁটে থাকে। তার তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে একমাত্র দোলনই যা তার ন্যাটা, অন্য দুজন নয়।
গোপালকে এক হাত দিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে কৃষ্ণজীবন বলল, পটল, তুই কখনও লাঙল চালিয়েছিল।
না জ্যাঠা।
কেন চালাসনি। ইচ্ছে হয় না?
ক্ষেত তো বদরুদ্দিন চাচা চাষ করে।
সে করে, কিন্তু তোর ইচ্ছে হয় না?
পটল কি বলবে ভেবে পেল না।
কৃষ্ণজীবন মৃদু তদ্গত গলায় বলে, লাঙল চালালে কি হয় জানিস? মাটির ওপর মায়া হয়, ভালবাসা হয়। এই মাটির মধ্যে, চাষবাসের মধ্যেই আছে মানুষের প্রাণভোেমরা।
পটল একটু উত্তেজিত হল। জ্যাঠার সব কথাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সে বলল, সত্যি জ্যাঠা?
সত্যি।
তুমি নিজে চাষ করেছে, না জ্যাঠা?
হ্যাঁ। তোর মতো বয়সেই শুরু করেছিলাম। লাঙল চেপে রাখা খুব শক্ত। এবড়োধেবড়ো মাটিতে লাঙল যখন চলত, আমি লাঙলের মুঠ ধরে ঝুলে থাকতাম। কতবার পড়ে গেছি। হাতে ফোসকা পড়ত। তবে হাল ছাড়িনি। রোজ অভ্যাস করতে করতে দিব্যি পারতাম।
আমাদের যে হাল-বলদ নেই জ্যাঠা।
তখনও ছিল না। হাল বলদ ধার করে আনতে হত। সেও বড় কষ্ট। যার হাল বলদ সে তো আর আমার সুবিধেমতো দেবে না, তাই হাঁ করে তার দয়ার জন্য বসে থাকতে হত। অপমানও হতে হত খুব। তবে গায়ে মাখতাম না।
দাদু বলে, তোমার নাকি খুব রোখ ছিল।
কৃষ্ণজীবন একটু উদাস হাসি হাসল। বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, রোখ ছিল, সাহস ছিল।
আমার সাহস নেই জ্যাঠা। আমি খুব ভীতু। নপাড়ার একটা ছেলে এই সেদিন আমাকে রথতলায় একা পেয়ে মেরে দিল। আমি কিছু করতেই পারিনি।
মারল কেন?
ওদের সঙ্গে পাড়ার ঝগড়া। একদিন গোপালকে সাইকেলে বসিয়ে আসছিলাম, একটা ছেলে এমন ঢিল মারল, আর একটু হলে আমার চোখ কানা হয়ে যেত। আর ঢ়িলটা গোপালের লাগলে মরেই যেত বোধ হয়। ইয়া বড় একটা পাথর।
নপাড়ার ছেলেরা বরাবরই একটু গুড়া।
তুমি কখনও মারপিট করেছে জ্যাঠা?
কৃষ্ণজীবন একটু হেসে বলল, সে অনেক করেছি। রিলিফ নিয়ে, ডোল নিয়ে, জমির দখল নিয়ে কত হাঙ্গামা হত তখন। গায়ের কয়েকটা খারাপ লোকও আমাদের পিছনে লেগেছিল। সে একটা বিশৃঙ্খলার সময়। তখন মার খেতাম, আবার উঠে মারতামও। নইলে দখল থাকত না। দখল রাখাটাই অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় কথা। দখল রাখতে মানুষ সব করতে পারে। এই যে জমিটুকু, বাড়িটুকু, এটুকু রাখতেই আমাদের প্রাণান্ত হওয়ার জোগাড়। তার মধ্যে আবার আমাদের ঘাড়ে বসে যারা খেত, সেইসব আত্মীয় আর জ্ঞাতিরাও এসবের ভাগ চাইতে শুরু করেছিল। সে খুব জটিল কাহিনী। আজ সেই জমি আর বাড়ি ভাগ হচ্ছে।
ভাগ হলে কী হবে জ্যাঠা?
কিছুই হবে না। বামাচরণ তো চাষ করবে না, তার ভাগের জমি বেচে দেবে। রামজীবনও বোধ হয় তাই করবে। সরস্বতী আর বীণাপাণি কি করবে কে জানে! বোধ হয় দাদাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভাগ ছেড়ে দেবে। ওরা তো জানে না, এই সম্পত্তি আসলে একটা ইতিহাস। ওরা টাকাটাই চেনে।
পটল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার খুব ইচ্ছে করে, গোপালকে নিয়ে এ বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই।
পালাবি! কেন রে, পালাবি কেন?
আমার এখানে ভাল লাগে না, বড় ঝগড়া, অশান্তি।
তাই বলে পালাবি কেন? নিজের কাজ নিয়ে ড়ুবে থাকবি। দুনিয়াতে পালিয়ে যাওয়ার আর জায়গা নেই। পালাতে হলে নিজের মধ্যে পালাবি।
সেটা কেমন জ্যাঠা?
মানুষের পালানোর সবচেয়ে ভাল জায়গা হল তার মন। যদি সেখানে ঢুকে কপাট বন্ধ করে দিতে পারিস তা হলে আর কেউ তোর নাগাল পাবে না।
সত্যি জ্যাঠা?
খুব সত্যি। আমি যখন দিনের পর দিন খিদেয় কষ্ট পেতাম, তখন খিদে ভুলতেও মনের মধ্যে ড়ুবে যেতাম। খিদের কথাও আর মনে পড়ত না। এরকম কতদিন গেছে। মনটাই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। যে মনটাকে সই করে নিতে পারে তার মার নেই। চারদিকে যা খুশি হোক, তুই নিজের কাজ নিয়ে, নিজের ভাবনা নিয়ে থাক, দেখবি কিছুই তোকে ছুঁতে পারবে না।
তুমি কাছে থাকলে আমার খুব ভাল হয় জ্যাঠা।
কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসে বলে, আমি কাছে থাকলে তোর সবসময়ে আমাকে নকল করতে ইচ্ছে হবে। সেটা ভাল না। আমি দূরে থাকি বলেই আমার ওপর তোর টানটাও আছে। আমার মতো হওয়ার ইচ্ছাটাও আছে। এরকমই ভাল। আর একটু বড় হ, তখন দেখতে পাবি, পৃথিবীতে নিজের মতো হয়ে ওঠাটাই সবচেয়ে বড় কথা।
পটল গম্ভীর হয়ে বসে জ্যাঠার কথাগুলি বুঝবার চেষ্টা করতে লাগল। আজকাল সে সব কিছু বুঝবার চেষ্টা করে।
তুই ইংরিজিতে কেমন?
গত পরীক্ষায় একটু ভাল পেয়েছি। তাও বেশী নয়। দাদুর কাছে পড়ছি বলে একটু ভাল হচ্ছে।
বাবা তাকে পড়ায় নাকি? খুব ভাল। বাবা তোর গোড়াটা বেঁধে দিতে পারবে। ইংরজি আর অঙ্কটা খুব দরকার। আর দরকার শক্ত মন। খুব কঠিন হবি, সাহসী হবি। হিংস্র নয়, কিন্তু সাহসী। বুঝেছিস।
