ঝুমকি এক মুটো মুড়ি-মাখা আর শশার টুকরো নিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল, একটা লোক ব্যাচেলর থাকলে কী এমন ক্ষতি হত বলো তো!
ব্যাচেলর থাকবে? তাই কি হয়!
কেন হয় না?
দূর পাগল! এখন আমার তর্ক করতে ইচ্ছেই করছে না। তবে ব্যাচেলর থাকা ভাল নয়।
এ সবই অনুধাবন করে চয়ন, কিন্তু অংশ নেয় না। কত মানুষের কত বড় বড় সমস্যা থাকে, কত অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে। তার তো তা নয়। তার সমস্যা সবই সাদামাটা। টিকে থাকা, শুধুমাত্র বেঁচে থাকা ছাড়া আর তো কোনও সমস্যার কথা মনে হয় না। তার।
অনেকক্ষণ বাদে যখন রশ্মি আর হেমাঙ্গ ফিরল। তখন দুজনকে অনুধাবন করল চয়ন। এদের সমস্যাটা কী? একজন সুদৰ্শন পুরুষ, আর একজন সুন্দরী রমণী। দুজনের কারোই ভাত-কাপড়ের অভাব নেই। প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশীই হয়তো আছে। এদের সমস্যা কি এদের এই প্রাচুর্যই?
দুজনের মুখই বেশ হাসিখুশি। দেখে মনে হয় যেন, দুজনের সমস্যা কিছুই আর নেই। সব মিটে গেছে। কিন্তু চয়ন তার মধ্যেও একটু ছায়া দেখতে পায়। মুখে হাসি, কিন্তু হেমাঙ্গর চোখে যেন ক্লান্তি!
দুপুরে বাঁকা মিঞা গন্ধমাদন এনে ফেলল। ভাত, ডাল, তরকারির সঙ্গে দুরকম মাছ আর মুরগি। এলাহি ব্যবস্থা। গরম গরম খেয়ে নিন, গরম গরম খেয়ে নিন বলে তাড়া দিতে লাগল সবাইকে। সেই তাড়া খেয়ে কুপকাপ বসেও পড়ল সবাই। টেবিল সরিয়ে বারান্দায় টানা শতরঞ্চি পাতা হল। শাল পাতার ওপর কলাপাতা বিছিয়ে দিব্যি ব্যবস্থা।
চয়ন এমন সুখাদ্য জীবনে খুব কমই খেয়েছে।
খাওয়ার পরই ফেরার পালা। তাড়াতাড়ি না ফিরলে অন্ধকার হয়ে যাবে। প্ৰচণ্ড শীত পড়বে। কলকাতায় চারুশীলার বাচ্চারা অস্থির হবে, ঝুমকির বাবা-মা চিন্তা করবে।
হেমাঙ্গও ফিরল তাদের সঙ্গে। একটু চুপচাপ, একটু লজ্জিত।
এদিকের ঘাটে দুটো গাড়ি ছিল। দ্বিতীয় গাড়িটায় উঠল। হেমাঙ্গ আর রশ্মি। ওদের বাড়ি কাছাকাছি। কি কারণে কে জানে হেমাঙ্গ হঠাৎ বলল, চয়ন, আপনি এ উঠুন। ও গাড়িটা একটু ক্রাউডেড।
সংকোচে চয়ন এতটুকু হয়ে গেল। সে ওদের প্রাইভেসি থাকবে না।
চারুশীলাও বলল, না না, এ গাড়িতে অনেক জায়গা। আমরা তো মোটে তিনজন। আমি ঝুমকি আর সুব্ৰত। তোরা যা না।
না, আমি চয়নকে ওর বাড়িতেই ছেড়ে দিয়ে আসব। উঠুন তো।
চয়ন বলল, আমি বরং বাসে বা ট্রেনে—
দুর পাগল! উঠুন।
চয়ন উঠে ড্রাইভারের পাশে সসঙ্কোচে বসল। তার মতামতের কোনও দাম নেই। সে আর কীই বা করবে?
গাড়ি হু হু করে যখন কলকাতার দিকে এগোচ্ছিল তখনও ফটফটে দিনের আলো। চয়ন নিবিষ্ট মনে সামনের দিকে প্রিয় ভুকুড়ি এবং দৃশ্যে শতকরা একশভাগ মনোযোগী থাকতে চেষ্টা করছিল। তবু দুএকটা কথা উড়ে আসছিল কানে। পছন থেকে।
কথাটা জানতে পারলে চারুদি শকড্ হবেন।
হেমাঙ্গ হাসল, তা হবে।
তুমিও একটু অদ্ভুত। কেন যে সহজ হতে পারো না।
হেমাঙ্গ ফের হাসল।
অনেকক্ষণ চুপচাপ রইল। ওরা।
তারপর রশ্মি হঠাৎ বলল, সামারে এসো। কিন্তু। আমি গ্ৰীনফোর্ডের বাড়িটা কিনে ফেলছি। আমার ওখানেই উঠবে। মা তো থাকবেই এখন কিছুদিন।
ঠিক আছে।
এলে পরে একটা প্যারিস ট্রিপ করা যাবে।
হু হু করে বাতাস আসছে বলে জানালার কাচ তুলে দিতে হয়েছে। তাই কথাগুলো স্পষ্ট কানে আসছে। চয়নের। সে এমন কিছু জেনে যাচ্ছে যা আর কেউ জানে না।
সারা রাস্তা ওরা আরও নানা বিষয়ে কথা বলল। তার মধ্যে পেইন্টিং, মিউজিক, সিনেমা এবং সাহিত্যও ছিল। কিন্তু আর বিশেষ কিছু নয়।
কলকাতায় পৌছোনোর আগেই অন্ধকার হয়ে গেল। কুয়াশা জমল। মনটা কেমন নির্বিকার হয়ে গেল তার।
আপনাকে আমার গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে আসি।
চয়ন আতঙ্কিত হয়ে বলল, এখন মোটে সন্ধে। কলকাতায় গাড়িঘোড়া চলছে। আমি ঠিক চলে যাবো।
আমার যে কথার খেলাপ হবে।
একটুও না। তাছাড়া আমি এখনই বাড়ি ফিরব না। ভাবছি, এক ছাত্রকে একটু পড়িয়ে যাবো।
তা হলে আসুন, এক কাপ চা খেয়ে যান।
চয়ন রাজি হল।
গরম চা নিয়ে দোতলার ঘরে মুখোমুখি বসে হেমাঙ্গ বলল, আপনার নিশ্চয়ই আমার সম্পর্কে কৌতূহল হচ্ছে–
চয়ন সংকুচিত হয়ে চুপ করে রইল।
হেমাঙ্গ একটু হেসে বলল, যেটা হওয়ার নয় সেটা আঁকড়ে থেকে লাভ নেই। আমি যে বনবাসে গিয়েছিলাম তার কারণ ছিল ওই একটাই। ভাল করে ভাবলাম। ভেবে দেখলাম, আমি কারও প্রেমে পড়িনি। কাজেই আজ রশ্মির সঙ্গে একটা মীমাংসা হয়ে গেল। আমরা বিয়েটা করছি না।
ও।
তবে আমরা বন্ধু থাকিব, যেমন ছিলাম। আমি রশ্মিকে নানা কারণে পছন্দ করি। শী ইজ এ নাইস পারসন।
চয়ন মাথা নেড়ে জানাল, সে বুঝেছে।
হেমাঙ্গ হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আজ খুব রিলিভড় বোধ করছি। কিন্তু একটা কথা।
বলুন।
এখনই চারুদিকে ব্যাপারটা জানাবেন না। প্লীজ।
আচ্ছা।
ও কিন্তু আপনাকে জিজ্ঞেস করবে।
কী বলব তাহলে?
বলবেন আমরা গাড়িতে খুব গল্প করছিলাম। বেশ ঘনিষ্ঠভাবে। ওকে এখনই হার্ট করতে চাইছি না। রশ্মি চলে যাক, তারপর জানতে পারবে।
ও। বলে চুপ করে থাকল চয়ন। এ তার গল্প নয়। এ তার জীবনের ঘটনা নয়। এ বড় দূরের কাহিনী। হৃদয় বিনিময়ের দুরূহ কথা। এ সবের সঙ্গে তার সম্পর্কই নেই। তবু সে চুপ করে গম্ভীর মুখে বসে রইল।
০৬৩. এরা মাটি ভাগ করতে চায়
এরা মাটি ভাগ করতে চায়, ভিটে ভাগ করতে চায়, বাড়ি ভাগ করতে চায়। ভাগাভাগির একটা হাওয়াই এখন বইছে পৃথিবী জুড়ে। দুনিয়াকে যে কত ভাবে, কত ভাগে ভাগ করতে চায় মানুষ! এভাবে কি ভাগ হয়? গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন কৃষ্ণজীবন তার দুটি ভাইপোকে নিয়ে ক্ষেতের ধারে ধারে মন্থর পায়ে হাঁটছে। শীতের বাতাস আর রোদে মাখামাখি আজকের এই সকাল তাকে কোন শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে আজ। সামনের ক্ষেতটুকু তাদের। আজ এর অনেক ভাগীদার। এই ক্ষেতটুকু আর ভিটেটুকু আঁকড়ে ধরে তার বাবাকে সে কঠিন বেঁচে থাকার লড়াই করতে দেখেছে। ঘাড়ে তখন অনেক পুষ্যি। দেশ ভাগের পর আত্মীয়স্বজন জ্ঞাতি কত মানুষ একে একে এসে তাদের আশ্রয় নিয়েছিল। একখানা বড় খোভড়া ঘরে তখন গাদাগাদি করে থাকা হত। ক্ষেত থেকে ছমাসের খোরাকির ধানও উঠত না। তার বাবা বিষ্ণুপদ বির ঘোরাঘুরি করে অনেক দূরের এক গায়ের প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারি জুটিয়ে নিয়েছিল। বেতন সজ্জাজনক। এই ক্ষেত আর ওই চাকরি যেন ফুটো নৌকোয় দরিয়া পাড়ি দেওয়া। অসুখ হলে ডাক্তার-বদ্যি ছিল না, ওষুধও না। টোটকা সম্বল। বিনা চিকিৎসায় কৃষ্ণজীবনের একটা ভাই আর দুটো বোন মারা যায়। আগ্রাসী দারিদ্রের সেই নগ্ন চেহারাটা বামাচরণ বা রামজীবন তেমন দেখেনি। ওরা তখন খুব ছোট।
