নৌকোয় ওঠার পর্বটা বেশ ঝামেলার হল। ঝুমকি যত বার উঠতে যায় ততবার দুষ্ট নৌকো একটু টাল খায় এবং সরে যায়। আতঙ্কে ঝুমকি চেঁচায় আবার হাসেও, অবশেষে মাঝি ছেলেটা নেমে নৌকো টেনে ধরে রইল, তারপর ঝুমকি উঠল। কিন্তু ওঠাটাও আর এক পর্ব। ছোটো নৌকো, একটুতেই টাল খায়।
মাঝি ছেলেটা অবশ্য বেশ চালাক-চতুর। ঝুমকি যতক্ষণ না বসল। ততক্ষণ নৌকো ধরে রইল। চয়নের অবশ্য তেমন অসুবিধে হল না। সব অবস্থায় মানিয়ে নেওয়াই তার অভ্যাস।
ডিঙিতে পাটাতন বলে কিছু নেই। প্রায় সবটাই খোল। দুটো আড় কাঠ পাতা আছে। দুটোতে মুখোমুখি বসল। তারা। ঝুমকির মুখে আতঙ্ক মেশানো হাসি।
কী রিস্কি জিনিস, তাই না?
চয়ন মৃদু স্বরে বলে, তা বটে। তবে সহজে ডোবে না। ভয় পাবেন না।
ঝুমকি হিহি করে হেসে বলে, একটু ভয় না করলে মজাই হয় না।
নৌকোটা বড় গাঙের দিকে গেল না। খালের ভিতরে ঢুকে এগোতে লাগল। চওড়া নয়, বেশী ঢেউও নেই। মাঝি ছেলেটা চালাক। আনাড়ি দেখে বড় গাঙের দিকে নেয়নি।
ঝুমকি কিছুক্ষণ এই জলযাত্রাকে উপভোগ করল বটে, কিন্তু কেমন যেন শান্ত হতে পারছে না মেয়েটা। হঠাৎ চয়নের দিকে চেয়ে বলল, মেয়েটা একটু কেমন যেন, না?
চয়ন অবাক হয়ে বলে, কোন মেয়েটা?
রশ্মির কথা বলছি।
ও। বলে চয়ন সতর্কতা অবলম্বন করল। বলল, আমি ওঁকে সামান্যই চিনি।
বড্ড গায়ে-পড়া।
তাই নাকি?
হেমাঙ্গবাবু যখন বিয়ে করতে রাজি হচ্ছেন না। তখন হামলে পড়ার কী আছে বলুন! তাই না?
তা তো বটেই। সঙ্গে সঙ্গে চয়ন একমত হয়।
মেয়েদের আর একটু সেলফ রেসপেক্ট থাকা উচিত।
তা তো ঠিকই।
ঝুমকি আবার কিছুক্ষণ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখল। খালের ভিতপ্রে অবশ্য দৃশ্য বিশেষ নেই। দুদিকে উঁচু পাড়। দীন-দরিদ্র চেহারার কুটির, কিছু বাড়িঘর আর অজস্র আগাছার জঙ্গল। घूभा
ঝুমকি হঠাৎ বলল, আপনার কি মনে হয় ওদের বিয়ে হবে?
চয়ন কঠিন সমস্যায় পড়ে গেল। বিয়ে হবে কি হবে না, তা সে জানে না। কিন্তু কোনটা বললে ঝুমকি খুশি হবে সেটা নির্ধারণ করাই কঠিন।
সে বলল, কিছু বলা যায় না।
আমার মনে হয়, হবে না।
সেটাও সম্ভব।
সম্ভব নয়। হবেই না। যদি হয় তাহলে ডিভোর্স হয়ে যাবে।
তাই নাকি?
ঝুমকি বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, লোকটা যে বিয়ের ভয়ে পালিয়ে আছে সেটা তো আর বুঝতে কারও বাকি নেই। না?
চয়ন একটু ভীত হয়ে বলে, আমি অত ভেবে দেখিনি।
ঝুমকি তার মস্ত খোঁপা ঠিক করল। তারপর হঠাৎ একটু হাসল। ভারী সুন্দর দাঁতের পাটি তার। বলল, রংটাই যা ফর্সা। মুখখানা এমন কিছু নয়।
চয়ন সভয়ে চুপ করে থাকে। তার কিছু বলার নেই।
ঝুমকি এর পর সম্পূর্ণ অন্যমনস্ক হয়ে গেল। নৌকাযাত্রা বা প্রকৃতি কোনওটাই তাকে আর স্পর্শ করল না। অনেকক্ষণ। কথা যত না বলে ততই বোধহয় চয়নের পক্ষে ভাল। কারণ সে এসব বিপজ্জনক কথাবার্তার শরিক হয়ে থাকতে চায় না।
ঝুমকি দেবী, ঘাট এসে গেছে।
ঝুমকি ঘোর অন্যমনস্কতা থেকে জেগে উঠে বলল, ও মা!
যখন তারা ফিরল। তখন ঘরে পারিবারিক মিটিং শেষ হয়েছে। বারান্দায় চারুশীলা আর সুব্রত বসে চা খাচ্ছে। তাদের দেখে চারুশীলা বলল, একি, তোমরা আবার কোথায় গিয়েছিলে?
ঝুমকি বলল, একটু ঘুরে এলাম মাসি। তোমরা যা ব্যস্ত ছিলে!
চারুশীলা অসহায় মুখ করে বলল, যা একখানা পাগল ভাই আমার। ওকে নিয়ে আমিও পাগল হয়ে গেলাম। এই তো দুটিকে পাঠালাম একটু ঘুরে আসতে। কী কাণ্ড বলো তো! সব ঠিক আছে, তবু কোথায় যেন আটকাচ্ছে।
মৃদুভাষী সুব্রত কথার চেয়ে হাসে বেশী। মুখখানা সবসময়েই হাসিতে মাখানো। চায়ের কাপ থেকে মুখ তুলে বলল, ওদের আর একটু সময় দেওয়া উচিত ছিল। তুমি বড্ড তাড়া দিচ্ছে ওদের।
চারুশীলা কেন কে জানে, তার মৃদুভাষী স্বামীটিকে একটু সমীহ করে। অন্য কেউ কথাটা বললে চারুশীলা পাত্তাই দিত না। কিন্তু সুব্রত বলায় চারুশীলা তাঁর দিকে চেয়ে বলল, কী করব বলো তো! আমাদের হাতে কি সময় আছে?
সুব্রত একটু মাথা নেড়ে বলল, ওরা খুব ভাল বন্ধু। কিন্তু বন্ধুত্বকে ম্যাট্রিমনিতে কনভার্ট করাটাই প্রবলেম হচ্ছে বলে আমার ধারণা। মানসিক চেঞ্জটার জন্য সময় দরকার ছিল।
না। সুব্রত। ও প্রবলেমটা শুধু হেমাঙ্গর। রশ্মির কিন্তু ওটা নেই। ও বিয়ের কথা ভেবেছে, মনকেও তৈরি করেছে। হেমাঙ্গর আরও একটা প্রবলেম হল, ও ইংল্যান্ডে থাকতে চাইছে না।
ওয়াইজ অফ হিম।
তার মানে?
ইংল্যান্ডে থাকতে যাবে কেন?
করুণ গলায় চারুশীলা বলে, তাহলে বিয়ে হবে কি করে?
কেন, তোমরা রশ্মিকেই এদেশে থাকতে রাজি করাও।
তাই কি হয়? ওরা কত প্রসপেক্ট ওখানে।
সুব্ৰত মৃদু মৃদু হাসতে লাগল। তারপর বলল, তাহলে চালমাত।
তার মানে?
কোনও হেডওয়ে হওয়া মুশকিল।
চারুশীলা বলল, আহা, দেখলে তো, দুজনেই দুজনের প্রতি বেশ ইন্টারেস্টেড। ওদের মধ্যে ভাব ভালবাসা খুব আছে।
তাহলে ঘটকালির দরকার হচ্ছে কেন?
কি করব বলো, হেমাঙ্গটা যে পাগল।
সুব্ৰত মৃদু মাথা নেড়ে বলে, একটুও পাগল নয়। মেন্টালি হয়তো স্ট্রং নয়। বাট হি ইজ এ পারফেক্ট জেন্টেলম্যান।
চারুশীলা হতাশা মাখা মুখে ঝুমকির দিকে চেয়ে বলল, কি যে হবে!
কেন ভাবছো মাসি? সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে।
ওমা! খাবারের অভাব নাকি? কত মুড়ি রয়েছে, শশা, নারকোল। এসো, বসে যাও। চয়ন আপনিও আসুন তো! আমার মনের যা অবস্থা, কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।
