বিষ্ণুপদ সামান্য লজ্জাতুর গলায় বলে, বাপেরটা নিবি না তো!
তা নয়। বাবা। ওরা আমাকে চায় না।
তা বটে। কে যে কাকে চায় আর কে যে কাকে চায় না, আজকাল আর বুঝতে পারি না।
বাড়ি চলুন বাবা।
চল। বলে বিষ্ণুপদ হাঁটতে থাকে।
০৬২. একটা নদী কত কী করতে পারে
একটা নদী কত কী করতে পারে! পালটে দেয় ভূ-চিত্র, পালটে দেয় জীবনের দর্শন, বদলে দেয় মনের অবস্থা। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে চয়ন যে আদিগন্ত বিস্তারকে দেখছিল। তেমনি কলকাতার গলিতে বন্ধ তার আশৈশব জীবনে সে দেখেনি। তার রোগক্লিষ্ট, অভাবতাড়িত জীবনে প্রকৃতির শোভার কোনও স্থানই ছিল না। এক থালা ভাতের শোভা অনেক বেশী প্রয়োজন ছিল তার। একখানা বাড়তি টিউশনি পাওয়াই ছিল জীবনদর্শন। চারুশীলার কল্যাণে এই আঘাটায় এসে বুক ভরে স্বাদুড় পৃথিবীর মহত্ব উপলব্ধি করে সে বুঝল, কলকাতায় এতকাল ধরে যে জীবন সে যাপন করে এসেছে তা হল এক পশুর
হেমাঙ্গর ঘরে একটা পারিবারিক মিটিং বসেছে। তার সেখানে থাকা উচিত নয় মনে করে সে এক ফাঁকে বেরিয়ে এসেছে। নদীর ধারে আত্মবিস্মৃত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদি রুজিরোজগার, জীবন ধারণের সমস্যা ইত্যাদি না থাকত, যদি মাত্র দুটি ভাতের ব্যবস্থা থাকত দুবেলা, তাহলে সেও এরকম একটা জায়গায় বাস করতে এসে।
খুব নরম গলায় কে যেন ডাকল, চয়নবাবু!
চয়ন ফিরে তাকিয়ে ঝুমকিকে দেখে তটস্থ হয়ে বলল, আজ্ঞে।
বেরিয়ে এলেন যে!
চয়ন লজ্জিত হয়ে বলে, ওঁদের সব পারিবারিক কথা হচ্ছে, তাই বেরিয়ে এলাম। আমি বাইরের লোক।
ঝুমকি ঠোঁটের একটি ভঙ্গিমা করল, বোধহয় তাচ্ছিল্যের। বলল, বাইরের লোক তো আমিও। চারুমাসি জোর করে নিয়ে এল বলে এলাম। ওদের কী ব্যাপার বলুন তো! প্রবলেমটা কী?
চয়ন সতর্ক হয়ে গলায় বলে, আমি ঠিক জানি না।
ঝুমকির মুখে যথেষ্ট বিরক্তি ফুটে আছে। সে হঠাৎ বলল, আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে। আপনার পায়নি?
চয়ন একটু হাসল। তার কত খিদে পায় এবং খিদে মরে যায়। সে মাথা নেড়ে বলল, আজ্ঞে না।
ঝুমকি খিদে ভুলে হঠাৎ নদীর দিকে, পরপারের দিকে চেয়ে থেকে বলল, কী সুন্দর জায়গা, না?
যে আজ্ঞে। খুবই সুন্দর।
হেমাঙ্গবাবু বেশ জায়গাটি খুঁজে বের করেছেন। কিন্তু এখানে খুব শীত।
ঝুমকি তার টমেটো রঙের মাফলারটা গলায় ফের ভাল করে পেঁচিয়ে নিল। বলল, আমার খুব ব্ৰংকাইটিসের ধাত। জোলো বাতাসকে ভীষণ ভয় করে।
চয়ন ব্যস্ত হয়ে বলে, আপনি তাহলে ঘরে গিয়ে বসুন না!
ঝুমকি ঠোঁটটা তেমনি তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উল্টে বলল, ঘরে যা সব ন্যাকামি চলছে। অসহ্য, দুজনেরই যদি দুজনকে পছন্দ তো বিয়ে করে ফেললেই হয়।
চয়ন সতর্কভাবেই চুপ করে রইল।
উঁচু পাড় থেকে ঘাটে নামবার পথটা খুবই ভাঙাচোরা। অনবরত লোকজন উঠে আসছে নৌকো বা ভটভটি থেকে। আবার যাচ্ছেও।
চুপচাপ কিছুক্ষণ লোক চলাচল দেখার পর ঝুমকি হঠাৎ স্বগতোক্তির মতো বলল, অথচ দুজনেই ম্যাচিওরাড় শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু বিহেভি করছে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মতো।
চয়ন এ কথাটারও জবাব দেওয়া সমীচীন মনে করল না।
চয়নবাবু, আপনার খিদে পেলে খেয়ে নিতে পারেন। কিন্তু। দেখলাম, মুড়ি, শশা, নারকোল, চানাচুর সব এসেছে। বাইরের টেবিলে সব সাজানো।
চয়ন বলল, আপনি খাবেন না? খিদে পেয়েছে বললেন তো।
ঝুমকি একটু রাগের সঙ্গে বলল, কেউ না খেলে খাওয়া যায়? ওরা কথায় এত ব্যস্ত যে কেউ খাচ্ছে না। তাছাড়া মুড়ি চিবোতে আমার একদম ভাল লাগে না।
চয়ন একটু ব্যস্ত হয়ে বলে, তাহলে কি হবে?
কিছু হবে না। ভাবছি ব্রেকফাস্টটা আজ স্কিপ করব। আচ্ছা, আপনি সাতার জানেন?
আজ্ঞে না।
আমিও জানি না। নৌকো না ভটভটি কি যেন ওটাতে উঠতে খুব ভয় করছিল। কিন্তু বেশ মজাও আছে, না?
আজ্ঞে তা আছে।
ঝুমকি হেসে বলল, আচ্ছা আপনি আমাকে অত আপনি আজ্ঞে করছেন কেন বলুন তো! আমি কি আপনার খুব সম্মানের পাত্রী?
চয়ন লজ্জা পেল। আপনি-আজ্ঞে সে করে অভ্যাসবিশে। পৃথিবীর সব মানুষকেই সে অল্প-বিস্তর সমীহ করে। কেন যে করে তা সে ঠিকমতো ব্যাখ্যা করতে পারবে না। মাথা নিচু করে সে বলল, আমার ওটা একটা অভ্যাস।
ঝুমকি বলল, আচ্ছা নৌকো করে একটু বেড়িয়ে আসা যায় না? যাবেন?
চয়ন আবার তটস্থ হয়, বেড়াবেন?
চলুন না! ততক্ষণে ঘরের নাটক শেষ হোক।
একটু দোনোমোনো করল চয়ন। ঝুমকিকে সে সামান্যই চেনে। এই শ্ৰীময়ী মেয়েটি চারুশীলার খুবই প্রিয়পাত্রী। ওদের বাড়িতে প্রায়ই আসে। শান্ত স্বভাবের রিজার্ভ মেয়ে। এ যখন বেড়াতে চাইছে তখন তারও সঙ্গ দেওয়া উচিত বলেই তার মনে হল।
চয়ন বলল, একবার বলে এলে ভাল হয়। ওরা যদি খোঁজেন?
আমি বাঁকা মিঞাকে বলে এসেছি। ভয় নেই, খুঁজবে না। চারুমাসি এখন নায়ক-নায়িকাদের নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। চলুন তো, অত ভাবতে হবে না।
চয়ন ফের লজ্জা পেল। তার অভ্যন্তরে এক জন্ম-কৃতদাস বাস করে। যে যা বলে, সে তৎক্ষণাৎ তাতে সায় বা সম্মতি দেয়। যে যা হুকুম করে, সে প্রায়শই তা তামিল করতে রাজি থাকে। এই বশংবদ স্বভাবকে সে কিছুতেই টিটি করতে পারেনি।
ঘাটে কয়েকটা ডিঙি নৌকো আছে। খেপ মারবে কি না কে জানে!
সামনে যেটা পেল তাতে একটা সতেরো-আঠারো বছরের ছেলে বৈঠা নিয়ে বসে আছে। ঢেউয়ে টগবগ করছে তার ছোটো নৌকো। সে আধঘণ্টা ঘুরিয়ে আনতে পাঁচটা টাকা চাইল।
টাকাটা কি তারই দেওয়া উচিত? একটু ভাবল চয়ন। আগের বার চারুশীলা তাকে হেমাঙ্গর কাছে আসার বাবদে হাজার টাকা দিয়েছিল। চয়নের খরচ হয়েছিল কুড়ি টাকার মতো। বাকি টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে, চারুশীলা নেয়নি। সুতরাং এ টাকাটা সে দিতে পারবে।
