কৃষ্ণজীবন তা হলে আসুক।
আমি অফিসে বেরোচ্ছি। আজ তাড়াতাড়িই ফিরব। ফেরার সময় পঞ্চায়েতের বাঞ্ছারামকেও নিয়ে আসব। তার সঙ্গে কথা হয়েছে। দাদার সঙ্গে যা কথা হবে তার একজন সাক্ষী থাকা ভাল। রামজীবনকেও থাকতে বলবেন।
জীবন তার ভাগ নেবে না? তোকে তাই লিখেছে?
নিয়ে করবে টা কি? এ বাড়িতে তো সে থাকতে আসবে না!
কৃষ্ণপদ একটু অসহায়ভাবে চারদিকে চাইল। তারপর খুব মিয়োনো গলায় বলল, সে কিন্তু অন্যরকম বলেছিল।
কি রকম?
কৃষ্ণজীবন বলেছিল, সে ফিরে আসবে। চাষবাস করবে। গাছপালা করবে।
তার চিঠি আমার কাছে আছে। সে লিখেছে বাড়ির ভাগ তার চাই না।
দুই হাত উল্টে বিষ্ণুপদ বলল, কি জানি কেন লিখল!
শহরের লোকেরা ওরকম বলে। গায়ে এসে থাকবেই বা কেন? কোন মধু আছে এখানে?
তা তো জানি না। তবে বলেছিল কিন্তু।
সে তো আসছে। কথা কয়ে পরিষ্কার করে নেবেন সব।
তাই হবে বাবা। তুই গিয়ে তাড়াতাড়ি আয়।
ভাগজোখ মিটিয়ে ফেললে আমিও পাকা বাড়ি তুলব। অফিস থেকে লোন দেবে। কিন্তু জমির দলিল জমা না দিলে হবে না। কত অসুবিধে করে আছি দেখছেন তো!
বামাচরণ নতুন সাইকেল কিনেছে। বেশ বাহারী জিনিস। সেইটে চালিয়ে চলে গেল। তার বউ দরজার আড়াল থেকে সব শুনছিল বোধ হয়। এইবার বেরোলো। হাতে হাঁড়িকুড়ি। পুকুরে যাবে।
উনুন ধরানোর কাঠাকুটো কুড়িয়ে আনতে বাগানে গিয়েছিল নয়নতারা। এক বোঝা ডালপালা নিয়ে এসে বারান্দার কোণে ফেলে বলল, ওগো, করছোটা কী?
বিষ্ণুপদ–একবার নয়নতারার দিকে চেয়ে দেখল। বলল, কিছু করছি না।
আমার শরীরগতিক ভাল বুঝছি না। বড্ড হাঁফ ধরে যাচ্ছে আজকাল।
হাঁফ ধরছে!
একটুতেই আজকাল হাঁফিয়ে যাচ্ছি। ঘাম হচ্ছে এই শীতেও।
ডাক্তারকে একটা খবর দেবো নাকি?
দুটো দিন দেখি। বয়সের দোেষই হবে। বামা কী বলছিল তোমাকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে?
বাড়ির ভাগ চাইছে? পাকা বাড়ি তুলবে।
তা তুলুক না। কে ঠেকাচ্ছে?
জমির দলিল না হলে নাকি টাকা ধারা পাবে না।
ওসব কথায় কান দিও না।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, কান না দিয়েও উপায় নেই। বামা কৃষ্ণজীবনকে চিঠি দিয়েছিল। কৃষ্ণ নাকি আজই আসছে।
আসছে! বলে নয়নতারা ঝটিতি খাড়া হল, কখন আসবে? খাবে তো এসে! জোগাড়যন্তর করতে হবে যে!
ব্যস্ত হয়ে না। আগে আসুক। সে কাজের মানুষ। কখন ফুরসত পাবে তার ঠিক নেই। তুমি জিরোও। বরং একটা পান খাও বসে।
পান খাচ্ছি, কিন্তু জিরোনোর উপায় নেই। রাঙার মাজায় ব্যথা। সে আজ আর রান্নাঘরে যেতে পারবে না। আমাকেই করতে হবে সব।
বিষ্ণুপদ একটু হাসল। তারপর বলল, একটা কথা কইব?
কি কথা?
আজ আমাকে তোমার যোগালি করে নাও।
সে আবার কি?
যোগালি বোঝে না? জল তোলে, মশলা করে, এটা-ওটা এগিয়ে দেয়।
যোগালি বুঝি। তা তোমার আবার এ ভীমরতি কেন হল?
তোমার শরীরটা যখন যুতের নেই, করলামই না হয় একটু কাজ।
সে কাজের দরকার নেই। আরও ভণ্ডুল লাগাবে। তার চেয়ে বাজারে যাও বরং কিছু নিয়ে-টিয়ে এসো। রেমো তো কাল ঝড় থেকে নেই। কেট্রনগর না কোথায় যেন গেছে।
একটু মাছ-টাছ এনো। শীতের সবজি। একটু তেলও লাগবে।
বিষ্ণুপদ উঠল।
একসময় বাজার করতে বড় ভালবাসত বিষ্ণুপদ। যথেষ্ট পয়সা ছিল না বটে, কিন্তু বাজারে ঘুরে বেড়ানোরও একটা আনন্দ আছে। ঘুরে ঘুরে দেখত। কিনতে পারত সামান্যই। দরাদরি করা, জিনিস পরখ করা এসবই করত বেশি। দোকানীদের সঙ্গে আলাপ-সালাপও হত। আজকাল বাজারের নামে গায়ে জ্বর আসে যেন।
বটতলায় আগে বাজার বসতি সপ্তাহে দুদিন। আজকাল নিত্যি রমরমে বাজার। কিন্তু জায়গাটা আর ভাল নেই। গায়ে একখানা জামা চাপিয়ে থলি। আর তেলের শিশি নিয়ে বেরিয়ে পড়ার পর বিষ্ণুপদ টের পেল, বাইরের দুনিয়াটা এখন অনেক অচেনা হয়ে গেছে। সরু একটা রাস্তার শেষে একটু মাঠ, তারপর আবার মেটে রাস্তা। বরাবর গেলে পাকা রাস্তায় উঠেই বাজার। এটুকু পথ তার তো মুখস্ত। কিন্তু না-বেরোনোর অভ্যাস এমন হয়েছে যে, এটুকু পথকেই মনে হয় যেন তেপান্তর পেরোতে হচ্ছে।
কী নিতে হবে বলে দেয়নি নয়নতারা। বিষ্ণুপদ একটু পালং। কিনতে গেল। দীর শুনে ভিরমি খেতে হয়। ফুলকপি বাধাকপির দরও অবিশ্বাস্য। আজকাল এত দাম দিয়ে নাকি এসব কেনে লোকে? এ তো পয়সা চিবিয়ে খাওয়া।
মাছ কিনতে গিয়ে বিষ্ণুপদ বড্ড বেচাল হয়ে পড়ল। কী দাম বলছে! সর্বনেশে ব্যাপার!
আনমনা ছিল বড়। একখানা বিশাল বাস এসে বটতলায় দাঁড়ানোর পর বেশ কিছু লোক নামল। আজকাল শীতলাতলা-বিষ্টুপুরে লোকের আনাগোনা বেড়েছে। অতি সুলক্ষণ। আনাগোনা মানেই জায়গাটা বর্ধিষ্ণু হচ্ছে। আগে লোকজন। এদিকে মাড়োতই না।
সাহেবী পোশাক পরা একটা লোক হঠাৎ বিষ্ণুপদর সামনে দাঁড়াল এসে। বিষ্ণুপদ তটস্থ হয়ে পড়তেই লোকটা বলল, বাবা! আপনি কী করছেন। এখানে?
বিষ্ণুপদ একগাল হাসল, কৃষ্ণজীবন! এই এলি?
হ্যাঁ। কী করছেন? বাজার নাকি?
তোর মা পাঠাল।
কৃষ্ণজীবন একটু হাসল। বলল, বাজার করতে হবে না। কলকাতা থেকে আমি এক ঝুড়ি সবজি এনেছি। ওই নামাচ্ছে বাসের মাথা থেকে।
বিষ্ণুপদ ফের হাসল। বলল, ভাল। তা হ্যাঁ রে, তোর যে গায়ে ফিরে আসার কথা ছিল, তুই নাকি আসবি না?
কে বলল বাবা?
বামাচরণকে নাকি চিঠিতে লিখেছিস!
আসব না লিখিনি। বামাচরণ চায় আমি আমার ভাগটা ছেড়ে দিই। আমি রাজি হয়েছি। তা বলে গায়ে ফিরে আসব না কেন? নতুন করে জমি-জায়গা কিনব, চাষবাস করব।
