বিষ্ণুপদ হাসল, সত্য হওয়াই কি ভাল? সব স্বপ্ন সত্য হলে ভারী বিপদ হত। ওই যে কালঘড়ি দেখেছিলাম দু রাত্তির, তখন থেকে কথাটা মনে হয়।
হয় না, না দাদু?
কে জানে ভাই। তবে সব স্বপ্ন যে হয় না তা জানি।
আমি লেখাপড়া করে যখন অনেক টাকা রোজগার করব তখন গোপালকে বিলেতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাব।
কিসের চিকিৎসা?
বিলেতে তো ভাল ডাক্তার আছে, তারা হয়তো অপারেশন করে গোপালের মুখে কথা ফুটিয়ে দিতে পারবে।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, পারলে তো খুব ভাল হবে।
গোপাল কিন্তু বোকা নয় দাদু, সব বুঝতে পারে। বুদ্ধিও খুব। শুধু কানে শুনতে পায় না। আর কথা কইতে পারে না।
বিষ্ণুপদ মাথা নাড়ল, জানি।
বইখাতা গুছিয়ে মাদুর গুটিয়ে পটল ভাইকে নিয়ে চলে গেল।
বিষ্ণুপদ বারান্দায় বসে রইল। আজ হঠাৎ ছেলেবেলার কথা খুব মনে পড়ছে তার। খুব মনে পড়ছে। কী ছিল ছেলেবেলায়? এই এমনিই ভাঙা ঘরদোর, অনেকটা এরকমই দারিদ্র্য ছিল। ময়মনসিংহ জেলার এক অখ্যাত পাড়াগায়ে বাস ছিল। গাছে গাছে প্রকৃতিদত্ত ফল ছিল বলে রক্ষে। নইলে উপোসে উপোসে প্রাণ বেরিয়ে যেত। সে-সব জাতের ফল নয়। কামরাঙা, করমচা, ডেউয়া, বেল কিংবা কাঁচা আম বা বরই। আর ছিল লটকা, পানিয়ল, খেতের আখ। কিন্তু দারিদ্র্য ছিল গায়ের ধুলো, ভিতরে ঢুকত না। না, ভিতরে কোনও দারিদ্র্য ছিল না। তখন। বড় আনন্দ ছিল। গায়ের জামা খুলে ফেলে পুকুর বা নদাঁতে অনায়াসে ঝাঁপিয়ে পড়া যেত। গাছ বাইতে, ফুটবল খেলতে তখন কী ভালই লাগত। বাবা ছিল, মা ছিল, দাদু-ঠাকুমা ছিল, পিসি-কাকা-জ্যাঠা ছিল, ভাইবোন ছিল মেলা। কোথায় যে কালের বাতাসে সব উড়ে গেল! চিহ্নও নেই। এখানে সেখানে আছে। কেউ কেউ, এখন আর খোঁজও রাখে না। যে যার নিজেরটা নিয়ে আছে। সকলে হয়তো নেইও। কে জানে বাবা!
ও বাবা, কী করছেন?
বামাচরণ নাকি? কিছু বলবি?
বামাচরণ বেরোবে বোধহয়। গায়ে হাওয়াই শার্টের ওপর সোয়েটার চাপানো, পরনে পাতলুন। গালে কয়েকদিনের দাড়ি। বিষ্ণুপদ লক্ষ করল।
বামাচরণ কিন্তু-কিন্তু করে বলে ফেলল, ভাগজোখের কিছু হল?
কিসের ভাগজোখ?
জমিজমার একটা বিলিব্যবস্থার কথা হয়েছিল, আপনার মনে নেই?
বিষ্ণুপদ ঝাম করে অতীত থেকে বর্তমানের কঠিন মাটিতে এসে পড়ল। বলল, তোরা যা করিস, আমার তো আপত্তি নেই।
কিন্তু হচ্ছে কোথায়? আপনি তো হাত গুটিয়ে রইলেন। গায়ের মাতব্বরদের ডেকে সালিশি বসিয়ে সব বাটোয়ারা করে দেওয়ার কথা হয়েছিল যে!
বিষ্ণুপদ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে, তা হয়েছিল বটে। তা হলে সেরকম কিছু করলেই তো হয়।
করবেন তো আপনি। জমিজমা তো আপনার। আপনি করছেন না, এদিকে রামজীবন তো গাপ করতে লেগে গেছে। আমার ঘরের পিছনের জমিটায় তো দেখছি রামজীবন সর্ষে বুনেছে। এরকম অরাজকতা তো চলতে পারে না। জমির কতটা কার, কোনটায় কে চাষ করবে তার একটা বন্দোবস্ত না হলে তো বড়ই কঠিন হচ্ছে।
বিষ্ণুপদ প্রবল অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে বলে, সবাইকে ডেকে একদিন বসে তোরাই ঠিক করে নে না। আমার মতামত দিয়ে কী হবে? আমার একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেই হয়।
আপনি তো বলেই খালাস। কিন্তু মধ্যস্থ কে হবে? মধ্যস্থ একজন না থাকলে তো ফের লাঠালাঠি লেগে যাবে।
কৃষ্ণজীবনকে একটা খবর পাঠা না হয়। সরস্বতী আসুক, বীণাপাণি আসুক।
আপনি কি জমির ভাগ মেয়েদেরও দেবেন নাকি?
বিষ্ণুপদ আতান্তরে পড়ে বলে, আজকাল নাকি কি সব আইন-টাইন হয়েছে। মেয়েদেরও পাওনা হয়।
বামাচরণ রূঢ় গলায় বলে, মোট তো দেড় দুই বিঘের ওপর আমাদের বসত। তা এতগুলো ভাগ হলে আর থাকবে কী?
তা হলে কী করতে চাস?
মেয়েদের বাদ দিন। বিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন তারা নিজেদের আখের বুঝুক। জমি তিন ভাগ হবে। চাষের জমি রামজীবন নিতে পারে, কিন্তু আমাদের ন্যায্য দাম দিয়ে নিতে হবে। যা হয় দু-চার দিনের মধ্যেই ঠিক করে ফেলুন।
গলা খাঁকারি দিয়ে বিষ্ণুপদ বলল, সবাই মানলে আমার আর আপত্তি কিসের?
আপনার জন্যই ব্যাপারটা ঝুলে আছে। সরকারী দলিল তো আপনার হাতে। উদ্যোগ তো আপনাকেই নিতে হবে।
চুপ করে বসে থাকলে তো হবে না। আমি দাদাকে চিঠি দিয়েছি। জবাবও এসে গেছে।
বিষ্ণুপদ ফের গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, কী লিখেছে সে?
আসছে। আজই আসার কথা।
আজই! বলে চোখ কপালে তোলে বিষ্ণুপদ।
নিজের ভাগ নিয়ে কি করবে, তা আপনাকে জানিয়ে দিয়ে যাবে। যদি ছেড়ে দেয় তো ভালই। জমি বাড়ি দুভাগ হবে। রামজীবন পাকা যে ঘরখানা তুলেছে সেটাও বে-আইনি। পঞ্চায়েতের একটা পারমিশন নেওয়া উচিত ছিল। তবে আমি গোলমাল করব না ও নিয়ে। আপনি আর মা ও-ঘরে উঠে যান, আমরা আপনার ঘরের দখল নেবো।
এ ঘরের?
তা ছাড়া আর ঘর কোথায়? আমি যে ঘরে আছি সেটার অবস্থা দেখেছেন? টিন ঝুরঝুরি করছে, বেড়া ভাঙা। মেঝেটাও সারানো দরকার। আমি সারাচ্ছি না, তার কারণ ঘর কার দখলে পড়ে তার তো ঠিক নেই।
বিষ্টুপুর কুণ্ঠিতগলায় বলে, কৃষ্ণ যদি তার ভাগ ছেড়ে দেয় আর মেয়ের যদি ভাগ না বসায় তা হলে তো আর ঝামেলাই
হ্যাঁ। সেক্ষেত্রে বাড়ি দুভাগ হবে। ভাগ-বাটোয়ারা না হলে এ বাড়িতে থাকা কঠিন হচ্ছে। আমার বউকে তো শোওয়ার ঘরেই রান্না করতে হচ্ছে। দেখছেন তো!
তা অবিশ্যি ঠিক।
ঠিক তো বলছেন। কিন্তু আমার কথা ভেবেছেন কখনও? আপনার হাবভাব দেখে তো মনে হয় আমি বানের জলে ভেসে এসেছি। ভাগ করে দিলে আমি আর কথা কইতে আসব না। ও ল্যাঠা চুকিয়ে ফেলুন।
