হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বাঁকা, এসব তুমিই তাহলে করেছো!
বাঁকা হাসল, আপনার ভাবগতিক ভাল বুঝছিলাম না, তাই।
সবাই বসল।
মুখোমুখি একা হেমাঙ্গ। যেন সামনে জুরিরা। সে আসামীর কাঠগড়ায়।
০৬১. পড়াতে পড়াতে সব মনে পড়ে যাচ্ছে
তাকে পড়াতে পড়াতে সব মনে পড়ে যাচ্ছে। কত কী ভুলে গিয়েছিলাম।
বিষ্ণুপদ খুব আহ্লাদের সঙ্গে হাসল। সামনে মাদুরে বসা পটল, তার পাশে শান্ত বোবা গোপাল।
পটল খাতা খুলে দেখছিল। গায়ের স্কুলে পরীক্ষা মোটে দুটো। হাফ ইয়ার্লি আর অ্যানুয়াল। কলকাতার ভাল ভাল ইংরিজি স্কুলে নাকি সপ্তাহে সপ্তাহে নানারকম পরীক্ষা হয়। পটলের এখন পরীক্ষার একটা ঝোক এসেছে। আজকাল দাদুই তার পরীক্ষা নিচ্ছে, নম্বরও দিচ্ছে। একখানা প্রশ্নের উত্তরে দাদু দিয়েছে। দশে ছয়। উরিব্বাস! ইংরেজিতে শতকরা ষাট নম্বর তো সে ভাবতেই পারে না।
ও দাদু, তুমি আমাকে বেশি বেশি নম্বর দাওনি তো!
বিষ্ণুপদ হাসল, প্রথম প্রথম তাই দিতুম। যাতে তোর নিজের ওপর ভরসা আসে। এখন বুঝে সুঝেই দিচ্ছি।
কিন্তু এ তো অনেক নম্বর।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, যখন ইস্কুলে পড়াতাম তখনও অবশ্য আমার নম্বর দেওয়ার হাতটা দরাজই ছিল। হেডমাস্টারমশাই ডেকে বলতেন, বিষ্টুবাবু, নম্বরটা বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের দিচ্ছেন। আমি ভাবতাম কি জানিস! নম্বর তো আর ঘরের গোলার ধান নয়, ক্যাশবাক্সের টাকাও নয়, তা হলে কেপ্পনের মতো দেবো কেন?
ও দাদু, তুমি কি আমাকে ওরকমভাবেই নম্বর দিয়েছো নাকি? আমার সে নম্বর চাই না। জ্যাঠার মতো লেখাপড়ায় ভাল হতে হবে যে।
ওরে না, তোকে ওরকমভাবে নম্বর দিইনি। তোর আজকাল দিব্যি ভাল হচ্ছে। মাথা খুলছে। বিশ্বাস না হয় ইস্কুলের মাস্টারমশাইকে দেখাস।
বিষ্ণুপদ খুব হাসতে লাগল। দাদুর ওপর পটলের খুব একটা নির্ভরতা নেই। তবে দাদুকে তার বড় ভাল লাগে। সবসময়ে ঠাণ্ডা, সুস্থির। রাগারগি, চেঁচামেচি নেই। এ বাড়িতে দাদু আর ঠাকুমা ছাড়া বাকি সকলেরই মাথা গরম। ঠাকুমার চেয়েও দাদু ঠাণ্ডা। আর দাদু যে ভালই পড়ায় এটা আজকাল পটল বুঝতে পারছে খুব। দাদু পড়ালে মাথায় খুব বসে যায় পডা।
বিষ্ণুপদ গলাটা নামিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, তুই জ্যাঠার মতো হতে চাস?
খুব চাই দাদু। অনেক লেখাপড়া শিখব, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়োব।
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, খুব ভাল। রোখি থাকা চাই। খুব গো ধরে যদি থাকিস তবে পারবি।
পারব দাদু?
মানুষ তো সবই পারে। কত কী কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলছে। মানুষের বুদ্ধির বহর দেখে তাজ্জব হয়ে যাচ্ছি।
আমাকে জ্যাঠার কথা বলবে দাদু? জ্যাঠার গল্প শুনতে খুব ভাল লাগে।
বিষ্ণুপদ কৌতুকের দৃষ্টিতে নাতির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, সে তো অনেক বলেছি তোকে।
আবার শুনতে ইচ্ছে করে।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, শোনা অবশ্য ভাল। শুনলে ভিতরটা চাঙ্গা হয়। কৃষ্ণর কষ্টের জীবন ছিল, আমাদের স্কুলেরই ছিল। কষ্টের ভিতর দিয়েই যা হওয়ার হয়েছে। আমিও তার কথা খুব ভাবি। যত ভাবি তত অবাক হই। কেন জানিস?
কেন দাদু?
তার ধারাটা এ বাড়িতে নেই।
তার মানে কী দাদু?
কৃষ্ণ যেমনটা হল ঠিক তেমনটা আর কেউ তো হল না। বংশের একটা ধারা তো থাকবে। তাই অবাক হই। তুই যদি কৃষ্ণর মতো হয়ে উঠিস, তা হলে একখানা কাণ্ডই হয়।
পারব না। দাদু?
বললাম যে, মানুষের পারার যেন শেষ নেই। মানুষই তো পারে।
মাঝে মাঝে মনে হয় কি জানো? উরিব্বাস, কত বই পড়তে হবে, কত কি শিখতে হবে, কত বুদ্ধি লাগবে, স্মৃতিশক্তি লাগবে, তবে না জ্যাঠার মতো হওয়া যাবে।
খুব গো ধরে থাক। কচ্ছপের কামড়ের মতো ধরে থাক।
আমি আজকাল কত মন দিয়ে পড়ছি না। দাদু?
হ্যাঁ। তোর খুব মন হয়েছে পড়ায়।
শুধু বাবা মাঝে মাঝে সব ভণ্ডুল করে দেয় যে! এমন চোঁচামেচি ঝগড়া করে যে মাথাটা তখন গুলিয়ে যায়।
বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, তারও রোখা ছিল। দাদাকে খুব ভক্তি করত। সেই ভক্তি থেকেই আবার ফ্যাকড়া বেরোলো যে। তোর বাবা যা করে তাও একটা রাগ থেকে করে। দাদার সঙ্গে পাল্লা টানতে গেল যে! এ তো আর পাঞ্জার লড়াই নয়। তোকেও বলি, রোেখ রাখিস, কিন্তু রাগ নয়, পাল্লা টানতে যাস না।
না, রাগ পটলের নেই, সে কারও সঙ্গে পাল্লাও টানতে চায় না। সে কিছু একটা হতে চায়। জ্যাঠা বড্ড ওপরে উঠে গেছে। অত ওপরে কি উঠতে পারবে সে? নাও যদি পারে, কাছাকাছিও যদি ওঠা যায়। তবে তাই ঢের। আজ কোন বেহানবেলা থেকে পড়তে লেগে গেছে সে। ভোরের আলো ফোটেনি। তখনও। নিবু নিবু। হ্যারিকেন উস্কে বইপত্র নিয়ে বসেছে। একটু একটু আলো ফুটতেই বারান্দায় দাদুর কাছে এসে মাদুর পেতে সেই থেকে পড়া করছে, টাঙ্ক করছে। গোপাল ঘুম থেকে উঠে গুটিগুটি এসে কোন ফাঁ্কে বসেছে তার পাশটিতে। গোপাল দাদা ছাড়া থাকতেই পারে না।
ও দাদু, গোপালের কি পড়া হবে?
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কে জানে দাদা। বোবার মুখেও একদিন হয়তো মানুষ কথা ফোঁটাবে। কানে শুনতে পায় না তো, তাই বোল ফোটে না। কানের ব্যবস্থা হলে কথা ফুটতে কতক্ষণ?
বোবাদের ইস্কুলে যদি দেওয়া যায়?
সেখানে কী শেখায়?
আমি জানি না।
খোঁজ নিস।
গোপাল যদি কথা কইতে পারত তা হলে একটা কাণ্ডই হত, না দাদু?
বিষ্ণুপদ একটু হাসল।
পটল বলল, আমি প্রায় রাতেই স্বপ্ন দেখি, গোপাল হঠাৎ আমাকে দাদা বলে ডেকে উঠল। আচ্ছা স্বপ্ন কি সত্য হয় দাদু?
