উঠোন ঝাড় দিতে দিতে হঠাৎ বাসন্তী চেঁচাল, উঃ মা গো!
সাপে কামড়েছে ভেবে ভয় খেয়ে হেমাঙ্গ ঘর থেকে তার কোম্পানি ট্যাক্সের বইখানা হাতে নিয়েই দৌড়ে বেরিয়ে এল, কী হল রে? কী কামড়েছে?
ওমা, কী সুন্দর মতো একটা মেয়ে ঘাটে নেমেছে দেখ? এ হয় তোমার কাছে এসেছে, নয়তো ফিল্ম স্টার। শুটিং করতে এসেছে। সঙ্গে লোক আছে। দেখবে এসো না!
হেমাঙ্গর বুকটা ধক করে উঠল।
এক সেকেন্ড বাদেই বাসন্তী আর একটা আর্তনাদ করল, ওমা গো, আর একটা সুন্দরমতো মেয়ে যে গো! কী শাড়িটা! ওঃ, ময়ূরের মতো দেখাচ্ছে দুজনকে।
হেমাঙ্গ উঠোনে নামল এবং দেখল। চারুদি, রশ্মি, চয়ন। আর কে আছে দেখল না হেমাঙ্গ। হঠাৎ তার এত লজ্জা করতে লাগল যে, পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হল।
বাসন্তী সম্মোহিতের মতো চেয়ে থেকে বলে, ও দাদা, এসব কি তোমার লোক? নাকি শুটিং?
হেমাঙ্গ আস্তে করে বলে, আমারই লোক। তুই নগেনের কাছে যা। মাছ নিয়ে আয়।
তোমার লোক! বলে খুশিতে হি-হি করে হাসল বাসন্তী, কী মজা বলো তো!
তোর কথা মিথ্যেও নয়। সামনের জন আমার এক দিদি। একসময়ে ফিল্ম স্টার ছিল।
চোখ গোল করে বাসন্তী বলে, সত্যি? যাবো? গিয়ে নিয়ে আসবো ওদের?
আনতে হবে না। নিজেরাই চিনে আসবে। ওরা আমাকে খুঁজতেই এসেছে।
পিছনের মেয়েটা কে বলো তো?
ও আর একজন। বলে হেমাঙ্গ অপ্ৰস্তৃত ভাবে চুপ করে গেল।
হি-হি করে বাসন্তী হাসল।
হাসছিস কেন?
ও তোমার কে হয় বলব?
বলতে হবে না। নগেনের কাছে যা।
যাচ্ছি। আসুক না, একটু দেখে যাই। আর, মাছটা কিন্তু আমি রাঁধব।
রাঁধিস। আজ সবই তোকেই রাখতে হবে বোধ হয়।
সত্যি।
আমার রান্না আমি ছাড়া আর কেউ খেতে পারবে বলে মনে হয় না।
তুমি যে বড় দাঁড়িয়ে আছে? ফটক পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াও। ওঁরা তোমাকে দেখতে পেলে তো ইদিকে আসবে। তুমি যেন বাপু কেমনধারা!
বাসন্তীর দিকে চেয়ে হঠাৎ মনে মনে একটু প্ৰমাদ গুনল হেমাঙ্গ। টগবগে সপ্তদশী গেয়ে যুবতীটিকে তার বাড়িতে দেখে ওদের কিছু সন্দেহ হবে না তো! বিশেষ করে চারুদিদি একটু সন্দেহবাতিকগ্ৰস্ত। তার একবার ইচ্ছে হল, বাসন্তীকে গা-ঢাকা দিতে বলে। তারপর ভাবল, থাকগে, যা হওয়ার হবে।
আশ্চর্যের বিষয়, ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এল বাঁকা মিঞা। মুখে একটু পাজি হাসি লেগে আছে। হঠাৎ এ সময়ে সে কেন ঘাটে হাজির ছিল, তা বুঝল না হেমাঙ্গ। কিন্তু সন্দেহ হতে লাগল, এ ব্যাপারে বাঁকা মিঞার কিছু যোগসাজস। থাকতেও পারে।
আগড় ঠেলে যখন উঠোনে ঢুকছিল ওরা তখন হেমাঙ্গ একটু আড়ালে সরে ছিল ইচ্ছে করেই। চট করে মুখোমুখি হতে বড্ড সংকোচ হচ্ছে। বুকটা টিপচিপ করছে বড়। দরজার আড়াল থেকেই দেখতে পেল, শুধু চারুশীলা, চয়ন, রশ্মিই নয়, পিছনে আরও দুজন। চারুশীলার বর সুব্রত আর. আশ্চর্যের বিষয় আর একজন হল ঝুমকি।
চারুশীলা উঠোনে পা দেওয়ার আগে থেকেই বকবক করছিল, এই নাকি হাইড আউট বাঁকা মিঞা? এ তো ভীষণ বিচ্ছিরি অ্যারেঞ্জমেন্ট! ও বাঁকা, ভূতটা এখানে থাকে কি করে? ও যে বরাবর ভীষণ শৌখিন।
বাঁকা হাসি-হাসি মুখ করে বলে, সেটাই তো বুঝে উঠতে পারি না। কেন যে আছেন পড়ে এখানে। জমি জায়গাও কিনতে চাইছেন। ঘোরতর পাগলামি।
কী যে মুশকিলে পড়েছি। ওকে নিয়ে! এরকম বিচ্ছিরি জায়গায় লোকে থাকে?
সুব্রত একটু পিছনে ছিল। সে মৃদুভাষী। কখনও অন্যের ওপর নিজের মত চাপানোর চেষ্টা করে না। কিন্তু এখন হঠাৎ অনুচ্চ স্বরে সে বলে উঠলো, না চারু, জায়গাটা খারাপ নয় তো।
চারু স্বামীর দিকে এক ঝলক চেয়ে বলল, ভাল বলতে তো সিনিক বিউটি! সেটা তো বড় কথা নয়। আর কী আছে এখানে বলো! কিন্তু হাঁদা গঙ্গারামটা কোথায় গেল?
ধারে কাছেই আছেন। যাবেন আর কোথায়? এখানে যাওয়ার জায়গাটাই বা কই? বাঁকা মিঞা হেসে হেসে বলে।
চারু আচমকাই বাসন্তীকে দেখে থমকে যায়, ওমা! এ মেয়েটা কে বাকা?
এ হল বাসন্তী। খুব ভাল মেয়ে, দুঃখী মেয়ে। ঘরের কাজটাজ করে দিয়ে যায়।
বাসন্তী হঠাৎ গিয়ে টিপ করে একটা প্ৰণাম করে ফেলল। চারুশীলাকে। তারপর পাইকারি হারে সবাইকে। সুন্দরী মেয়েদের দেখে তার চোখে পলক পড়ছে না। মুখ ফেটে পড়ছে খুশিতে।
যতখানি ক্যাজুয়াল হওয়া সম্ভব ততখানি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে দরজা দিয়ে খুব ধীরে নিজেকে প্রকাশ করল হেমাঙ্গ। খুব বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, আরে তোরা!
এই অলম্বুশ! বাঃ বাঃ চেহারার কী ছিরি হয়েছে।
হেমাঙ্গ অপ্রতিভ একটু হাসল।
চারুশীলা বেশ চেঁচিয়েই বলল, রশ্মি, দেখে নাও, এর গলায় মালা দিতে তোমার ইচ্ছে হবে তো!
রশ্মি একটু পিছনে। তার মুখে হাসি নেই, কিন্তু যেন একটা হাসির আভাস রয়েছে। এই সেটআপকে সে হয়তো অপছন্দ করছে না। চারদিকে চেয়ে দেখছিল। সবার শেষে তাকাল তার দিকে।
এসো রশ্মি। এসো, আসুন, আপনারা।
চারু বলল, থাক আর আহবান করতে হবে না। আমরা আসবো বলেই এসেছি।
ঘরে ঢুকে চারদিকটা খুব ক্রিটিক্যাল চোখে দেখছিল চারুশীলা। বলল, তোর টয়লেট নেই? না থাকলে তো সর্বনাশ!
হেমাঙ্গ হাসে, আছে। ভয় নেই।
তাড়াতাড়ি সে বসবার জায়গা তৈরি করছিল; জায়গা। অবশ্য বিশেষ নেই। বিছানা, একটা চেয়ার, গোটা দুই মোড়া সম্বল।
বাঁকা মিঞা বলল, থাক থাক। কষ্ট করতে হবে না। ফজল চেয়ার নিয়ে এসে গেছে। আর খাবার বন্দোবস্তও আজ আমিই করেছি। আপনি ব্যস্ত হবেন না।
বাস্তবিকই ফজল আর তার কয়েক বন্ধু গুটিকয়েক চেয়ার নিয়ে এসে ফেলল। একটা ফোন্ডিং টেবিলও এনে রাখল বারান্দায়। বোধ হয় খাওয়ার সময় লাগবে।
