দুর্গানাথ বিপদ বুঝে একটা পারিবারিক মিটিং ডেকে বললেন, বাড়ির পজেশন নেওয়াটাই আইনের বড় কথা। অবিলম্বে বাড়িতে লোক ঢোকানো দরকার। হেমাঙ্গ যখন স্বেচ্ছায় ওখানে থাকতে চাইছে তখন ওকেই পাঠানো হোক।
মা অবশ্য বেঁকে বসল, হাঙ্গামার মধ্যে ছেলেকে পাঠানো কেন? ও কি ভেসে এসেছে? যদি ওকে মারে?
বিস্তর বিতর্কের পর শেষ অবধি হেমাঙ্গই জয়টিকা পরল। পরদিন বাক্স-বিছানা নিয়ে গিয়ে সে গড়চা বাই লেনের বাড়ির দখল পত্তন করল। সঙ্গে পাড়ার কয়েকজন বন্ধুবান্ধব। বন্ধুরা অবশ্য সাময়িকভাবে সঙ্গ দিতে গিয়েছিল।
মহিমবাবুর ভাইপো কিছু তিড়িংবিড়িং করেছিল বটে, কিন্তু ডাহা একটা মিথ্যে দাবী নিয়ে বেশিদূর এগোতে পারল না। দিন সাতেক বাদে সে নিরস্ত হল।
সেই থেকে হেমাঙ্গ এক সুখী ও একা মানুষ। দোতলায় চারখানা যাওয়ার ও একখানা বড় বসবার ঘর নিয়ে বিশাল ফ্ল্যাটে সে থাকে। একতলাটা কিছুদিন ফাঁকা থাকার পর তার সেজদা গৌরাঙ্গ সেখানে একটা সাউন্ড রেকর্ডিং স্টুডিও করে। সেটা চলল না। এরপর টিভি সিরিয়ালের সেট হিসেবে সেটা ভাড়া দেওয়া হয় কিছুদিন। তারপর বিয়েবাড়ি হিসেবে ভাড়া দেওয়া হতে থাকে। অবশেষে ওটা এখন তাদের গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হেমাঙ্গ এখন নিশ্চিন্ত। সে এখন নিরঙ্কুশ একা।
একা বটে, কিন্তু উৎপাতহীন নয়। তার পৈতৃক বড় বাড়িটা বিডন স্ট্রিটে হলেও, তার সেজদি নীলা বন্ডেল রোড এবং পিসতুতো দিদি চারুশীলা গোলপার্কে থাকে। তারা সময় অসময়ে এসে হাজির হয় এবং যথেষ্ট হামলা মাগিয়ে যায়। প্রথম প্রথম বিডন স্ট্রিট থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে মা বা ছোড়দি চলে আসত। আজকাল সেটা বন্ধ হয়ে হয়েছে। কিন্তু এই দুই দিদির খবরদারি বন্ধ হয়নি। হেমাঙ্গর প্রত্যেকটা শ্বাসপ্রশ্বাস অবধি এরা দুজন বিডন স্ট্রিটে ফোন করে জানিয়ে দেয়।
এই যে তার ফিয়াট গাড়ির ডিকিতে মাইক্রোয়েভের বাক্সটি নিয়ে সে বাড়ি ফিরছে এটা দুএকদিনের মধ্যেই রাষ্ট্র হয়ে যাবে। ফি রোববার সে বিডন স্ট্রিটে মাকে দেখতে যায়। আর তখন কৃতকর্মের জন্য তাকে শতেক গঞ্জনা শুনতে হয় নানাজনের কাছে। মাইক্রোওয়েভ তাকে যথেষ্ট বেগ দেবে।
হেমাঙ্গ কি বোঝে না যে এত জিনিসপত্র কোনও কাজের নয়? অবুঝ হেমাঙ্গর ভিতরে একজন যুক্তিবাদী হেমাঙ্গও বাস করে। যুক্তিবাদী হেমাঙ্গ ভালই জানে, এই সব জিনিসপত্র কেনা মানে দুর্লভ অর্থশক্তির অপপ্রয়োগ মাত্র। অবুঝ হেমাঙ্গ বলে, আরে, আয়ু তো দুদিনের। যা ইচ্ছে যায় তা করে নেওয়াই ভাল।
ডিকি থেকে বাক্সটা ওপরে তুলে দিল ফটিক। ফটিক একটি বেশ লোক। হেমাঙ্গর সব কথাতেই সে সায় দেয় এবং যথেষ্ট বাতির করে। ফটিকের বয়স ষাটের ওপর এবং হেমাঙ্গর বয়স ত্রিশের নিচে হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে একটা। বন্ধুত্বের সম্পর্ক আছে।
বাক্স খুলে জিনিসটা বের করে রান্নাঘরের তাকে রেখে প্লাগ লাগিয়ে হেমাঙ্গ বলল, জিনিসটা দেখেছ ফটিকদা?
ফটিক সবিস্ময়ে চেয়ে থেকে বলে, রান্নাঘরে টিভি দিয়ে কি হবে দাদাবাবু?
এটা টিভি নয়। মাইক্রোওয়েভ। এতে রান্নাবান্না হয়। বসে দেখ।
ফটিক উবু হয়ে বসল। তার চোখের সামনে চোখের পলকে ফ্রিজের ঠাণ্ডা খাবার গরম করে ফেলল হেমাঙ্গ। পাঁপর সেঁকল। বিনা জলে আলু সেদ্ধ করল।
দেখলে?
ই রে বাবা! এ তো দেখছি অশৈলী কাণ্ডকারখানা! দোয়া নেই, শব্দ নেই, তা হলে কী হল কাণ্ডখানা।
মাইক্রোওয়েভ হল পৃথিবীর নতুন বিস্ময়। আলট্রা মডার্ন জিনিস।
তাই তো দেখছি।
ফটিকের জিনিস এত কম যে সেটাও হেমাঙ্গর কাছে বিস্ময়। ফটিকের সম্বল মাত্র একটা তোলা উনুন, একখানা কড়াই, একটি হাঁড়ি আর থালা। একটা ঘটি,একটা বালতি, একখানা মগ ও একটা গামছা আছে তার। আছে দুটি লুঙ্গি, দুখানা ধুতি আর দু-তিনটে জামা। আসবাব বলতে একটা ছোট চৌকি। এ সবই খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করেছে হেমাঙ্গ। ফটিকের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে তার। ফটিকের অতি ছোটো ঘরটায় গিয়ে মাঝে মাঝে বসে হেমাঙ্গ। চারদিকে চেয়ে ফটিকের একাবোকা সংসার দেখে। এরকমভাবেও মানুষের তো চলে যায় বেশ!
০০৬. নপাড়ার ছেলেরা
নপাড়ার ছেলেরা তাকে পেলে কেন মারবে তা ঠিক ঠিক বলতে পারবে না পটল। বোধহয় সে নিতু, নন্দ আর গৌরাঙ্গর বন্ধু বলে। নপাড়ার তাপসকে ওরা কদমতলায় ইস্কুলে পথে তিনজনে মিলে মেরেছিল। সে দলে পটল ছিল না। কাজটা ভালও করেনি ওরা। মারপিটে নপাড়ার বদনাম আছে। মারপিট হয়ে যাওয়ার পরদিন কলোনিতে হামলা করেছিল অন্তত বিশ জন ছেলে। হাতে রড, লাঠি, ড্যাগার অবধি। বড়রা বেরিয়ে মাঝখানে পড়ে মিটমাট করে নেয়। কলোনির লোকও জানে নপাড়া গুণ্ডার জায়গা। তাই কেউ গা-জোয়ারি দেখায়নি। কিন্তু বাইরে থেকে মিটলেও আসলে ব্যাপারটা। মেটেওনি। নিতু, নন্দ আর গৌরাঙ্গ দুদিন ইস্কুল কামাই দিয়েছে, তারপর গোঁসাইপাড়া ঘুরে অনেক দূর হেঁটে ইস্কুল যাচ্ছে। পটল অত জানত না। মারপিটের পরদিন কদমতলার কাছে কিছু ছেলে তাকে তাড়া করে, বাশ চালিয়ে সাইকেল সমেত তাকে ফেলেও দিচ্ছিল। তার এই পুরনো সাইকেলখানা সেদিন পক্ষিরাজের মতো না উড়লে মার খেয়ে পিসে যেত পটল। আর কিছু না জানুক পটল সাইকেলটা জানে। এ গায়ে সাইকেলের ওস্তাদ হিসেবে তার নাম আছে, লোকে বাহবা দেয়। তাও এই ঝাঁ-কুকুর সাইকের। পেত যদি একখানা এস এল আর বা স্পোর্টস সাইকেল তাহলে আরও কত কী দেখাতে পারে পটল।
