বাসন্তী একটু বেশী কথা কয় বটে, কিন্তু সময়টা খারাপ কাটে না হেমাঙ্গর। আগে বাবু বলে ডাকত, আজকাল দাদা ডাকে।
ও দাদা, আজ কী রাঁধবে গো? যজ্ঞিবাড়ির আয়োজন দেখছি।
এটা অবশ্য ঠাট্টা। যজ্ঞিবাড়ির আয়োজন কিছুই নেই। কিছু আলু, কয়েকটা মূলে আর একটু বেগুন মাত্ৰ আছে। হেমাঙ্গ একটা ঝোল আর ভাত রাখে। কখনও একটু সেদ্ধ। এই-ই যথেষ্ট।
হেমাঙ্গ মৃদু একটু হেসে বলে, এতেই হবে।
তোমার তো সব তাতেই হয়। ঝোল রাঁধবে তো? এই ঝোলে কী দিতে হয় জানো? ডালের বড়ি।
ওসব লাগবে না।
বলো তো এনে দিই। শঙ্কুর মা বড়ি বিক্রি করে, এই তো কাছেই বাড়ি।
বড়িফড়ির অনেক ঝামেলা।
তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না। সারাদিন হাঁ করে গালে হাত দিয়ে কী ভাবছে আর সেদ্ধপোড়া অখাদ্য সব সোনামুখ করে খেয়ে নিচ্ছে। আমার হাতে খাবে? বলো তো বেঁধে দিয়ে যাই।
তোর হাতে খেলে আমার মজাটাই মাটি।
উঃ, খুব তো মজা। কাল না গরম তেলের ছিটে লেগেছিল হাতে।
রাঁধতে গেলে ওরকম হয়।
তোমাকে বলেছে! আমরা বুঝি রাঁধি না? তুমি যে কড়াইতে তরকারি ছাড়ার সময় ভয়ে সিঁটিয়ে থাকো, আর দূর থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দাও। ওতেই তো ছিটে লাগে।
হেমাঙ্গ লজ্জার হাসি হেসে বলে, কি জানিস, গরম তেলে তরকারি দিলেই যে প্রথমে ঝম করে ওঠে বা চিড়বিড় করে ওটাকে আমি একটু ভয় পাই।
বাসন্তী হি-হি করে হাসল। বলল, তাহলেই বোঝ কেমন রাঁধুনী হয়েছে। আমার হাতে যদি খাও তো কম তেল কম মশলায় ভাল করে বেঁধে দেবো। আমাদের গরিব ঘরে ওসব শিখতে হয়। তুমি গুচ্ছের তেল মশলা নষ্ট করছে রোজ। অত লাগে না।
শিখব রে, আস্তে আস্তে শিখ সব।
তোমার শেখারই বা কি দরকার? বাঁকা চাচা বলে, তুমি নাকি বড্ড বড়লোক। তাহলে শিখবে কেন? রাধার তো লোক আছে।
তবু শেখা ভাল। সব শেখা ভাল। তাতে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
ই বাবা, সব যদি তুমিই করে নাও তবে আমাদের কে আর ঘরের কাজ অতে ডাকবে? খাবো কি তবে?
তুই বরের জন্য রাঁধবি।
আহা, আমাদের আবার বিয়ে, তার আবার বর। তোমাদের মতো নাকি? বর তো আজ আছে, কাল নেই। ছেড়ে চলে যায়।
তোরটা গেছে নাকি?
একবার নয় গো, এই নিয়ে দুবার হল। আমাদের তো আর তোমাদের মতো বিয়ে রেজিস্টারি হয় না, ডিভোর্স করতে কেউ আদালতেও যায় না। ধরলেই হল, ছাড়লেই হল।
সেটা তো ভালই। সম্পর্কে ধারাবাধা ব্যাপার নেই।
তোমার এরকম ভাল লাগে বুঝি? পেটের চিন্তা থাকলে বুঝতে। তার ওপর যদি বাচ্চাকাচ্চা হয়। মরদের তো দায় নেই, যত দায় আমাদের। মরদ তো ছেড়ে দিয়ে আর একটাকে ধরে।
আর মেয়েগুলো বুঝি বরকে ছাড়ে না?
বাসন্তী হি-হি করে হেসে বলে, তাও ছাড়ে। তবে কম।
তোর বয়স কত?
ঠোঁট উল্টে বাসন্তী বলে, কে জানে কতা! তবে খুব কম নয়।
সতেরো-আঠেরোর বেশী হবে না।
তাই ধরে নাও, হি-হি।
এই বয়সে দু-দুটো মরদ তোকে ছাড়ল? হ্যাঁ রে বাসন্তী, তুই যে তাজ্জব করলি!
আমার দোষ বুঝি! দেখ গে। আমাকে ছেড়ে আর একজনকে নিয়ে ঘর করছে। ফের তাকেও ছাড়বে। সবই আমাদের কপাল।
তা ভাল দেখে একটা মানুষকে বিয়ে করতে পারিস না?
বিয়ে কি আর খোলামকুচি? ইচ্ছে করলেই ভাল পাব কোথায়? কপালে যা জোটে। আমাদের ওরকমই সব হয়।
এ তো অরাজকতা রে!
তা যা বলো। তুমিই তো এক্ষুনি প্রশংসা করছিলে। বললে তো যে, ব্যাপারটা বেশ, ধরাবাধা থাকে না কেউ।
হেমাঙ্গ একটু হাসল, একদিক দিয়ে তো ভালই। কিন্তু সমাজবন্ধন বলে একটা কথা আছে, সেটা তুই বুঝবি না। তবে সমাজটাকে একটু খুঁটে বেঁধে না রাখলে মুশকিল। এরকম ভেসে বেড়ালে সমাজটাইতো গড়ে ওঠে না। পরিবার একটা মস্ত কথা। সমাজের নিউক্লিয়াস।
বড্ড শক্ত শক্ত কথা বলো তুমি। হ্যাঁ দাদা, আজ মশলাটা কী হবে বল তো! জিরে হলুদ বেটে দিই?
দে। আমার একটা হলেই হল।
শোনো, জিড়ে ফোড়ন দিও, একটা তেজপাতা দিও তার সঙ্গে। তুমি মাছ-টাছ খাও না?
কদিন খাচ্ছি না।
কেন খাচ্ছে না? ঝামেলার ভয়ে? আমি কেটেকটে দিয়ে যাবোখন।
হেমাঙ্গ একটু ম্লান হেসে বলে, আসলে, আমি মাছ রাঁধলে কেমন একটা আঁশটে গন্ধ থেকে যায়। খেতে পারি না।
হি-হি করে খুব হাসে বাসন্তী। বলে, সাঁতলাও না?
সবই করি। তবু হয় না।
হি-হি। তুমি কিছু পারো না। শুধু লেখাপড়া আর বসে বসে ভাবা।
এরকমই ভাল। বেশী হাঙ্গামা করতে নেই। যত সহজ সরল থাকা যায়।
আমি মাছ রোধে দিয়ে যাবো কাল থেকে।
না রে। নিরামিষ তো খারাপ লাগছে না। ভাবছি। এবার থেকে এখানে এলে নিরামিষই খাবো।
তোমার যে কী বুদ্ধি! এখানে তো একটা জিনিসই ভাল। মাছ। এত টাটকা মাছ কি কলকাতায় পাবে? নগেনকে বলে দিলে সে একেবারে জ্যান্ত মাছ ঘরে পৌঁছে দিয়ে যাবে। কানকো উল্টে দেখার দরকার নেই। দাপানো মাছ।
হোক গে। আমার মাছ ভাল লাগছে না।
ধনে পাতা খাও?
খাই। কেন?
আমাদের উঠোনে হয়েছে। কাল নিয়ে আসবো। ঝোলে একটু দিও। স্বাদ হবে।
আচ্ছা।
এইভাবেই সম্পর্ক রচিত হয় বুঝি। কোথায় ছিল সে, কোথায় বাসন্তী বা বাঁকা মিঞা বা এ গায়ের আর সবাই। কত তফাত তাদের জীবনযাত্রায়। এ গায়ে এই অজ্ঞাতবাস করতে এসেই না চেনা হল! এটা কি কম! মানুষের যা আয়ু তাতে জীবৎকালে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের প্রত্যেককে একবার হ্যালো বলে যাওয়ারও সময় নেই। কত দূর দূরান্তে শহরে গায়ে পাহাড়ে জঙ্গলে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষ। এত মানুষের কত জনকে চেনে হেমাঙ্গ? এই চেনাজানা হচ্ছে, পরিচয় বিস্তারলাভ করছে, এটাই হেমাঙ্গর মস্ত প্ৰাপ্তি বলে মনে হয়।
