চয়ন! সে তো চারুদিদির গুপ্তচর। ছেলেটা ভাল। জানতে এসেছিল।
বাঁকা মিঞা মাথা নেড়ে বলে, কিছু একটা পাকিয়ে তুলেছেন বলে মনে হচ্ছে। একটু খোলসা হবেন কি?
হেমাঙ্গ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, খোলসা হতে বলছো? কিন্তু নিজেই তো জানি না তোমাকে কী বলব!
মাঝে মাঝে এমন এক একটা সংকটের সময় আসে যখন মানুষ সত্যিই বুঝতে পারে না, সে কী চায়। যেটা চায় না, সেটাই হয়তো চায়, যেটা চায় সেটা হয়তো তার সত্যিই প্রয়োজন নেই। এরকম সব সংকটের মুহূর্তে একজন প্রম্পটারের অভাব বড় বেশী বোধ করে হেমাঙ্গ। কে বুঝিয়ে দেবে, কে বলে দেবে।
বাঁধ ধরে সকালে অনেক দূর হটে হেমাঙ্গ। সূর্যোদয় দেখে। মাঠঘাট, নদী নিয়ে বিশাল বিস্তার জেগে ওঠে চোখের সামনে। মনে হয়, কোনও পিছুটান আর নেই। নোঙর ছেড়ে সে এখন অনির্দিষ্ট বার রিয়ায়। যেন সে আর চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নয়, যেন তাকে আর পয়সা রোজগার করতে হবে না, আর বিষয়-চিন্তা করতে হবে না, যেন তার কোনও দায়ভারই নেই পৃথিবীতে।
কিন্তু তিষ্টোতে দেয় না বাঁকা মিঞা। প্রায়ই এসে তাড়া দেয়, একবার কলকাতা ঘুরে আসেন গিয়ে। কাজকর্ম যে সব রসাতলে যাবে।
আমাকে চাষবাস শেখাবে বাঁকা।
সে সব হবেখন। শখের শেখা শিখতে বেশী সময় লাগবে না। কিন্তু আপনার যা বিদ্যে তা তো এ কাজের জন্য নয়, সবাই চাষ করলে দুনিয়াটা চলবে কি করে?
দিন দুয়েক আগে সে রশিকে একটা চিঠি দিয়েছে। তাতে লিখেছে, নিজের সঙ্গে কিছু বোঝাঁপড়া আছে। তাই কদিনের ছুটি নিয়েছে। তুমি কিছু মনে কোরো না। এই ছুটিটার বড় দরকার ছিল আমার। বোধ হয় মানসিক ক্লান্তিই হবে। আমার ঠিকানা চাদি জানে। সুতরাং নিরুদ্দেশ হইনি। তুমি বোধ হয় দিল্লি গেছ। সেরকমই শুনেছিলাম তোমার মুখে। এসে এ চিঠি পাবে। পাওয়ার পর একটু অপেক্ষা কোরো। আমি গিয়ে বুঝিয়ে বলব। এমনই কপাল, বাংলায় গুছিয়ে একটু চিঠিও লিখতে পারি না। লেখার দোষে ভুল বুঝে না।
চিঠিটা পৌঁছে থাকবে। নাও পৌছোতে পারে। চিঠিটা দেওয়া উচিত হল কিনা তা বুঝতে পারে না হেমাঙ্গ। উচিত হল কি? এই অজ্ঞাতবাসের জবাবদিহিই বা সে কেন করল?
গত চার দিন বাঁকা মিঞার ঘাড়ে আর খাচ্ছে না হেমাঙ্গ। সে আজকাল রান্না করছে। প্রথম প্রথম পুড়ে বা গলে যেত তরকারি বা ভাত। আজকাল মোটামুটি হয়। তবে এত খারাপ রান্না জীবনে খায়নি হেমাঙ্গ। খিদের মুখে খাওয়া যায়, এই মাত্র।
বাঁকা মিঞা যথেষ্ট আপত্তি তুলে বলেছে, আমি যতদিন আছি ততদিন রাঁধবেন কেন? আমি মরণে না হয়–
হেমাঙ্গ বলে, না বাকা, তোমার ঘাড়ে বসে খেলে আমার এই অজ্ঞাতবাসটাই অর্থহীন হয়ে যাবে। কোনও মানে থাকবে না। নিজের ওপর নির্ভর না করলে মজাও থাকে না।
সাত দিনে সে বুঝতে পারছে, ব্যাপারটা একটু বোরিং। সাতটা দিন কাটছে খুব ঢিমে তেতালে। সে হিসেব করে দেখেছে এখানে এক ঘণ্টা কাটে কলকাতার আড়াই ঘন্টার মাপে। এখানে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তে অনেক বেশী সময় লেগে যায়। গত সাত দিনে এখানে সে যত হেঁটেছে, গত দশ বছরেও সে এত হাঁটেনি। হাঁটা জিনিসটাও তার কাছে ক্লান্তিকর। কারণ এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যেতে পথ যেন ফুবোয় না।
এসব না ধরলে তার কিছু খারাপ লাগছে না। গাঁয়ের অনেক মানুষজনের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে। দু-চারজন ডেকে নিয়ে চা-টা খাইয়েছে তাদের বাড়িতে। কিন্তু এটাও ঠিক জীবন নয়। অনেক ফাঁক, অনেক ফোকর।
শীত এসেছে। এখনে আঁকিয়ে শীত পড়ে গেছে। নদীর ধারে তার আড়ালহীন ঘরখানা সারা রাত হিমেল হাওয়ার ঝাঁপটা খায়। এত শীত করে ভোরের দিকে যে ঘুম ভেঙে সে উঠে বসে থাকে। অন্ধকার রাতে বাতাসের হু-হু বিরহের শব্দে এসে মেশে নদীর অবিরল ঢেউ ভাঙার ছলছল। শেষ যামের শেয়াল ডাক দিয়ে যায়। শেষ রাতে সে মাঝে মাঝে বাইরে এসে দাঁড়ায়। কখনও বড্ড কুয়াশায় সব আবছা হয়ে থাকে। কখনও পাতলা কুয়াশার ভিতর দিয়ে জ্যোৎস্যরাতে এক অপার্থিব প্রেক্ষাপট দেখে সে মন্ত্ৰমুগ্ধ হয়ে থাকে।
না, সে কোনও বোঝাঁপড়াই করে উঠতে পারেনি নিজের সঙ্গে। সে নিজের মনকে বুঝতে পারছে না। সে নিজেকে চিনে উঠতে পারছে না। নদী বা প্রকৃতি তাকে কোনও পথের সন্ধান দিল না। শুধু মুক্ত বায়ু তার ময়লা ফুসফুস পরিষ্কার করে দিল, একটু নেশা ধরিয়ে দিল।
বাঁকা, ভাবছি রোববারে কলকাতায় ফিরে যাবো।
যাবেন। তাই যান। এ বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। খবরও তো দিয়ে আসেননি।
কিন্তু আমি আবার শিগগিরই এসে কিছুদিন থাকব।
থাকবেন। তবে ওদিকটা সামাল দিয়ে আসবেন।
বিষয়ী বাঁকা তার সমস্যা বোঝে না। কিন্তু বাঁকা যা বলে তা বাস্তববাদীর কথাই। বাঁকা তার এই একাকী বাস করাটা পছন্দ করছে না। কিছু একটা সন্দেহ করছে। সেটা অমূলকও নয়।
দাড়িতে আমাকে কেমন লাগছে বাঁকা?
বাঁকা হাসল। বলল, কিছু খারাপ লাগছে না। তবে রাখার দরকারটাই বা কী?
দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে হেমাঙ্গ বলল, রেখে দেখাই যাক না। শুনেছি দাড়িতে র্যাডিয়েশন আটকায়, চোখ ভাল থাকে। তাছাড়া কেন কে জানে, দাড়ি কামাতে আমার বড় আলিস্যি।
কী যে বলেন।
শনিবার দুপুরে রান্না চাপানোর আয়োজন করছিল হেমাঙ্গ। উনুন ধরাতে, বাসন মাজতে, ঘর ঝটপাট দিতে একটা মেয়ে আসে। তার নাম বাসন্তী। বয়স সতেরো-আঠারো এবং ভীষণ ফচকে। মোটেই লজ্জাবতী লতা নয়। বয়সটা বিপজ্জনক, তবে বাঁকা সার্টিফিকেট দিয়েছে, মেয়েটা ভাল। ঢলাঢলি করার মতো মেয়ে নয়।
