বই-খাতা ফেলে এসেই অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরল, হাই মাৰ্ম্মি, হোয়াটস দি নিউজ?
অপর্ণা তার মাথায় হাত দিয়ে বলে, রোজ কি আর নিউজ থাকে? আমাদের আবার নিউজ কিসের?
হোয়ট অ্যাবাউট দি হাউস?
হবে, তোমার বাবা আবার নতুন করে প্ল্যান করতে দিয়েছে।
তুমি এক নম্বরের মাইজার। আগের প্ল্যানটা কত বেটার ছিল। কত বড় আর কী সুন্দর ব্যাপারটা হত বলো তো!
আর টাকাটা আসত কোত্থেকে? তোর শ্বশুর দিত।
ইউ আর ইমপসিবল। আমার বাবা কি বেকার। বাবা ঠিক পারত।
তোদের বুদ্ধি নিয়ে চললে সংসার একদিন ভেসে যাবে। আমরা যেমন, আমাদের বাড়িও ঠিক তেমনি হবে।
মজা থাকবে না মা।
খুব থাকবে। মজা তো জিনিসে থাকে না, থাকে মনে।
আমাকে সেপারেট রুম দেবে তো? দেখব।
প্ল্যান হয়ে গেলে আর কি করে দেখবে?
দেখব নয়, দেখেছি। তোমাদের আলাদা আলাদা ঘরই হবে।
দ্যাটস্ মাই মাগ্নি। বলে অনু তাকে একটু আদর করল।
এই মেয়েকে নিয়ে চিন্তা আছে অপর্ণার। বড় ইংরিজিয়ানা শিখছে। ট্যাশ স্কুলে পড়ে বলে নয়। সে তো বুকাও পড়ে। ওর মধ্যে একটু বিলিতি নকলের ঝোক আছে। একটু ছেলে-ঘেষা। ওর অনেক বয়ফ্রেন্ড। মেয়েটার একটু ডোন্ট কেয়ার ভাবও আছে। তবে পড়াশুনোয় অনু বেশ ভাল।
স্কুলের পোশাক না ছেড়েই অনু টেলিফোনের সামনে বসে গেল। রোজ গাদা গাদা ফোন করে। কাজের কথা হয় কিনা কে জানে, বন্ধুদের সঙ্গে বিস্তর হা-হা হি-হি হয়।
এই, না খেয়েই যে বড় টেলিফোন করতে বসলি?
খিদে নেই মা। আজ ফেট ছিল। স্কুলে খাইয়েছে।
টেলিফোনের বিল কত আসছে জানিস।
উঃ, তুমি না দারুণ মাইজার।
মোটই মাইজার নই। ফ্রি কল-এর ওপরে আগের বারে অন্তত একশো কল হয়েছে, তা জানিস?
তিনটে ফোর করব মা। মাত্র তিনটে।
কাকে করব?
ফ্রেন্ডদের।
তাদের কাছ থেকেই তো এলি এইমাত্র।
একটু দাও না মা। কত কথা থাকে জানো না তো। এণাক্ষী একটা দারুণ স্টোরি বলছিল। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই ওর স্টপ এসে গেল যে।
অপর্ণা চোখ কপালে তুলে বলে, এখন ফোনে স্টোরি শুনবি?
একটা করি না মা, মাত্র একটা।
না। এখন নয়। ও মেয়েটাও বাড়িতে গিয়ে এখন একটু হাফ ছাড়ছে। ওকে একটু সময় দাও। সন্ধের পর করিস।
উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না।
এক একদিন অপর্ণা টের পায়, মাঝরাতেও অনু কাকে যেন টেলিফোন করে। বন্ধুদেরই করে কি? নাকি? সেসব কথা এখনই ভাবতে চায় না অপৰ্ণা। অনু এখনও ছেলেমানুষ। তবে আজকালকার মেয়ে, তাদের সম্পর্কে কিছু ধারণা করে রেখে লাভ নেই। তার কাছে ছেলেমানুষ, লোভী যুবকদের কাছে তো তা নয়। তাদের কাছে লোভনীয় সামগ্রী।
বুকা আসে সবার পরে। স্কুলে আজকাল টিউটোরিয়াল ক্লাস হচ্ছে। তর পরেও ক্রিকেট প্র্যাকটিস থাকে প্রায়ই।
বুবকা এলে বুকটা ভরে যায় অপর্ণার। ভিতরে ভিতরে একটু পক্ষপাত তার হয়তো আছে। এ জন্মে সেটা কাটবে না। ছেলের জন্য একটা বাড়তি তেষ্টা তার থাকেই। একটু চিন্তাও। বুবকা বড় ভাল ছেলে। তার মধ্যে কোনও কমপ্লেক্স নেই। একটু বেশী সাদা আর সরল। উনিশে পা দিয়েছে, কিন্তু এখনও শিশুর মতো। কিন্তু এ সমাজে শিশুদেরই বিপদ বেশী। কে কোথায় ভুলিয়ে ভালিয়ে ভুল পথে নিয়ে যাবে।
বুবকা সম্পর্কে একটু দুঃখের বোধও আছে অপর্ণার। বুবকা মাকে ভালবাসে খুব, কিন্তু বাপকে একটু বেশী। খুব শিশুকাল থেকেই ছেলেটা বাপ-ঝোকা, কি করে যে হল কে জানে। বুবকা তার বাবাকে যত ভালবাসে, যত বিশ্বাস করে, বাপের ওপর যত নির্ভর করে, তত আর কাউকে নয়, কারও ওপর নয়।
মা! বলে এক গাল হাসল বুবকা।
ইস ঘেমেছিস কেন? শীতে কেউ ঘামে?
আমার যে ফ্যাট আছে।
ফ্যাট! কে আবার ওকথা বলল?
তুমি খাইয়ে খাইয়ে বোজ আমার ফ্যাট বাড়িয়ে দিচ্ছো।
বলিস কি রে? কোথায় আবার ফ্যাট?
আছে মা। রোজ এত এত খাচ্ছি, সেগুলো যাচ্ছে কোথায়?
মোটেই তোর ফ্যাট নেই।
স্কুলে আমাকে আজকাল কেউ কেউ ফ্যাটসো বলে ডাকে।
তারা অন্ধ।
বুবকা নিঃশব্দে হাসল, তারপর বলল, কী টিফিন খাওয়াবে বলে তো! আই অ্যাম হাংরি।
হাত-মুখ ধুয়ে আয়। নুডলস্ করে রেখেছি, চিংড়ি দিয়ে।
দ্যাটস্ ফাইন।
সন্ধে অনেকটা গড়িয়ে মণীশ ফেরে। মুখখানা গম্ভীর। ছেলেমেয়েরা যে যার ঘরে পড়ছে। একা অপৰ্ণাই রিসিভ করে তাকে।
গম্ভীর কেন গো?
গম্ভীর! না তো!
অপর্ণার আবার চোখে জল আসতে চায়। সে তো মণীশকে দুহাতে আগলে রেখেছে। তবু কোথায় যে ব্যবধান রচিত হয়ে যায়। সে কিছু করতে পারে না।
০৬০. নদীর ধারে বাস করতে
নদীর ধারে বাস করতে হেমাঙ্গর কি নেশা ধরে গেল? গত শুক্রবার এসেছে। কলকাতায় বিস্তর বকেয়া কাজ পড়ে থাকা সত্ত্বেও আজ আর এক শুক্রবার অবধি রয়ে গেছে এখানে। কোনও খবরও দেয়নি কোথাও। না বাড়িতে, না অফিসে, না রশ্মিকে। দায়হীন জীবন কি এরকমই হয়? গত সাত দিন সে নৌকোয় নৌকোয়, হেঁটে হেঁটে নানা গায়ে ঘুরেছে, বাঁকা মিঞার সঙ্গে বাঘের জঙ্গল অবধি। দাড়ি কামায়নি, শহুরে পোশাক পারেনি। ধুতি আর শার্ট। তাও ময়লা হয়েছে যথেষ্ট।
বাঁকা মিঞা না বলে পারল না, বাবু, কাণ্ডটা কী? এসব হচ্ছেটা কি? আপনি যে আর বাড়িমুখো হচ্ছেন না।
একটু হেসে হেমাঙ্গ বলে, কী হবে বাড়িমুখখা হয়ে? কী আছে বলে তো সেখানে!
এখানেই বা কোন মধুটা পাচ্ছেন আপনি? এখানে কী আছে?
এখানে আর যাই হোক, দায় তো নেই। এটা করতে হবে, সেটা করতে হবে বলে তো আর কেউ শাসাচ্ছে না।
সেদিন যে লোকটা এসেছিল কী বলে গেল আপনাকে?
