ঝুমকি মায়ের দিকে চেয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ওসব কথার কোনও দাম নেই। লোকটার বোধ হয় আমার কথা মনেই নেই। তাছাড়া হেমাঙ্গবাবুর এখন রোমান্টিক পিরিয়ড চলছে। এসব ছোটখাটো প্রবলেম নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই।
অপর্ণা সামান্য স্ক্যান্ডালের আভাস পেয়ে বলল, রোমান্টিক পিরিয়ড? কার সঙ্গে?
বিলেত-ফেরত দারুণ সুন্দরী একটা মেয়ের সঙ্গে। রশ্মি রায় শুনতে পাচ্ছি বিয়ের পর দুজনেই বিলেতে চলে যাবে।
শোনো ঝুমকি, তোমাকে আর চাকরি চাকরি করে হন্যে হতে হবে না। চেহারাটা দিন-দিন যা হচ্ছে। কষ্ঠার হার বেরিয়ে গেছে, মুখ শুকিয়ে এতটুকু। এখন কয়েকদিন বাড়িতে বসে বিশ্রাম নাও। তোমার রেস্ট দরকার। যদি ভাল কোনও চাকরি পাও তখন দেখা যাবে।
ঝুমকি মায়ের দিকে একটা আনমনা দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলল, আচ্ছা, মা পৃথিবীতে কিছু মানুষ খুব অন্যায় রকমের সুখে আছে, না?
কী বলছিস।
দেখ না, কিছু মানুষ এমন ভাগ্য করে এসেছে যে, তাদের কিছুই করতে হয় না। তাদের অনেক টাকা, গাড়ি বাড়ি, ব্যবসা বা চাকরি, যখন তখন বিদেশে চলে যাচ্ছে, আসছে। ভাবলে কেমন লাগে বলো তো? আমার তো ভীষণ রাগ হয়।
অপর্ণা একটু হাসল, ওভাবে বিচার করলে রাগ হওয়ারই কথা। আবার আমাদের চেয়েও কত দুঃখে কষ্টে মানুষ আছে।
সেটা ভাবলে তো আরও রাগ হয় না। মানুষে মানুষে এত তফাত যে, সেটাকে লজিক্যাল বলেই মনে হয় না। কেন পৃথিবীটা এরকম বলো তো!
অপর্ণা মায়ের মাথায় একটু হাত বুলিয়ে মাথাটা নিজের কাঁধে চেপে ধরে। ঝুমকি তার চেয়ে এক ইঞ্চি লম্বা। একটু হেসে বলে, বড়লোকদের হিংসে করে কী করবি? যার যেমন কপাল।
কপালে আমার বিশ্বাস ছিল না। ভাবতাম, সবাই সবকিছু হতে পারে। যদি চেষ্টা করে। কিন্তু এখন দেখছি, চেষ্টাতে কিছু হয় না। একটা সামান্য ভদ্র মাইনের চাকরি পাওয়াই কঠিন!
ইদানীং ঝুমকির মুখে যে প্রগাঢ় ক্লান্তির ছাপ দেখতে পায় অপর্ণা, তা তার একটুও ভাল লাগে না। শুধু একটা চাকরির জন্যই কি এত আকাতা আর এত হতাশা? চাকরির ওর এমন কি দরকার? মেয়েদের একটু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকা যে ভাল, তা অপর্ণাও বিশ্বাস করে। কিন্তু তার জন্য এত তাড়াহুড়োর কি আছে? ঝুমকির বাবা তার সন্তানদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মুক্তহস্ত। দশ টাকা চাইলে বিশ টাকা দিয়ে দেয়। কিন্তু বুবকা বা অপু যেমন টাকা-পয়সা খরচ করতে ভালবাসে, ঝুমকি সেরকম নয়। সে বাবার কাছ থেকে ততটুকুই নেয়, যতটুকু না হলেই নয়। সেই হিসেবে ঝুমকি অনেকটা অপর্ণার মতো টাকা-পয়সা ওড়াতে পছন্দ করে না। একটু হিসেবী। ইদানীং বাই চেপেছে বাবাকে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু সেটা এখনই না হলেও হয়। অপর্ণার সন্দেহ হয়, চাকরি নয়, অন্য কোনও গুঢ় কারণে মেয়েটা শুকিয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই এই বয়সের মেয়েদের ভিতরের কথা টেনে বার করা কঠিন। তার ওপর ঝুমকি ভীষণ চাপা। অন্য সব কথা দূরে থাক, ঝুমকি কী খেতে ভালবাসে বা কোন রং পছন্দ করে সেটা অবধি অপর্ণা ধরতে পারে না। তার তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে ঝুমকিই সবচেয়ে বেশী আবছা তার কাছে।
অপর্ণা মেয়ের দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থেকে ওর মনের কথা বুঝবার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। বলল, তোর বুঝি চাকরি ছাড়া আর কিছুতে মন নেই? হ্যাঁ রে, তোর কি একটাও ছেলে-বন্ধু নেই।
ঝুমকি যেন সামান্য অবাক হল। তারপর দ্রু কুঁচকে বলল, খুব পাকা হয়েছে তো মা! মেয়ের বয়ফ্রেন্ডের খবর নেওয়া হচ্ছে?
আহা, আছে কি নেই, বল না!
আমার আবার বয়ফ্রেন্ড! কী যে বলো না! এই তো তুমিই বললে আমার চেহারাটা হাড়গিলের মতো।
মিথ্যুক! আমি কনো তোকে হাড়গিলে বলিনি।
হাড়গিলে কথাটা হয়তো উচ্চারণ করেনি, কিন্তু যা বিবরণ দিয়েছে, তাতে তাই দাঁড়ায়।
মোটই না। চেহারা খারাপ হয়েছে তাই বলছিলাম। গায়ে মাংস লাগলে তোর পাশে কেউ দাঁড়াতে পারে।
খুব পারে। নিজের মেয়েকে অত বাখনাতে হবে না। আমার চেহারা কেমন, তা আমি জানি।
খুব জানিস। কটা দিন রেস্ট নে, আর ভাল করে খা। তারপর দেখিস আয়না অন্য কথা বলবে।
ঝুমকি একটু হাসল।
অপর্ণা বলল, তোর একটা কিছু হয়েছে। কী হয়েছে বলবি আমাকে?
কী হয়েছে বলে ঝুমকি অবাক হয়ে চেয়ে থাকে।
তুই বলছি না। কিন্তু আমি যেন টের পাচ্ছি।
ঝুমকি শান্ত গলায় বলে, তুমি সব সময়ে এত টেনশনে থাকো কেন মা। আমার আর কী হবে? চাকরি পাচ্ছি না, তাই মনটা ভাল লাগে না।
চাকরি তো তোর তত দরকার নেই। এমন নয় যে, তুই চাকরি না করলে আমরা খেতে পাবো না।
চাকরি পাওয়াটা শুধু খাওয়ার জন্য দরকার নয় মা। একটা প্রেস্টিজেরও ব্যাপার। চাকরি না-পাওয়া মানে আমাকে কেউ যোগ্য মনে করছে না। কম্পিটিশনে আমি হেরে যাচ্ছি।
আহা, ওসব ভাববার কি আছে? সবাই কি একবারেই পায়? সকলকেই চেষ্টা করতে হয়।
ঝুমকি একটু মাথা নেড়ে বলে, আমার কিছু হবে না মা। কিছুই হবে না।
অপর্ণার সন্দেহটা গেল না। তার ষষ্ঠ ইন্দ্ৰিয় হয়তো নেই, কিন্তু মায়ের মন বলে কথা! তার মনের মধ্যে একটু চিমটি থেকে গেল। মেয়েটা তাকে বন্ধু বলে ভাবে না, হয়তো বিশ্বাসও করে না, হয়তো ভাবে মা বুঝবে না। কিন্তু বললে অপৰ্ণা হাঁফ ছেড়ে বাঁচত।
অনু ফিরল বিকেলের মুখে। এ মেয়েটা ঝুমকির মতো নয়। খুব হাসিখুশি আর ইয়ারবাজ হচ্ছে দিনকে দিন। চেহারাটা ভর। এখনই যৌবন ডাক দিয়েছে যেন। অনুর খুবই সুন্দরী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।
