অপর্ণার দুটি হাতই মণীশের গলা জড়িয়ে ধরে ছিল। হাত দুটি এ কথায় হঠাৎ শিথিল হয়ে গেল। একটু বিবর্ণ হয়ে সে বলল, ওঃ, ওটা এমনিই লিখেছিলাম। ভাবছিলাম একটু বড়ই তো হচ্ছে বাড়িটা। আমরা কজনই বা লোক বলে! মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাবে, বা কোথায় চাকরি করতে চলে যাবে হয়তো। তখন বুড়োবুড়ি কি করে থাকব। বরং একতলায় একটা ব্যাংক বা অপিস থাকলে ততটা ফাঁকা লাগবে না।
মণীশ হাসল না। মৃদু স্বরে বলল, তাই বুঝি অপু?
হ্যাঁ গো, বিশ্বাস করো।
তুমি কিন্তু বরাবর বলে এসেছে, বাড়ি করলে কখনও সে বাড়িতে ভাড়াটে রাখবে না।
আহা, এ তো আর ফ্যামিলি ভাড়াটে নয়। অফিস বা ব্যাংক তো দশটা-পাঁচটা। তারপর তো আর ঝামেলা থাকবে না। কন্ট্রাক্ট থাকবে। দুচার বছর পর তুলে দিতে পারা যাবে।
জিব দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে মণীশ খুব মৃদুস্বরে বলল, আমি ভাবলাম বুঝি তুমি ভবিষ্যতে একটা আয়ের পথ খোলা রাখলে। হয়তো ধরেই নিয়েছে, আমি আর বেশি দিন নয়। তাই কি এইসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, অপু?
অপর্ণা এত কঠোর ও নগ্ন সত্যকে স্বীকার করে কি করে? সে কৃতকৰ্মকে চাপা দেওয়ার জন্যই যেন আরও আবেগে জড়িয়ে ধরে মণীশকে। মণীশের ইস্ত্ৰি-করা শার্টের কলার দুমড়ে যায়। অপর্ণা বলে, কি করে এমন কথা ভাবতে পারো তুমি? কি করে ভাবো?
আমি তোমার দূরদৃষ্টির প্রশংসাই তো করছি অপু!
না, তুমি সন্দেহ-বাতিকে ভুগছে। সবসময়ে সন্দেহ করছে যে, আমরা তোমাকে খরচের খাতায় ধরে নিয়েছি।
মণীশ একটু হাঁফিয়ে পড়ছিল। ধীরে সে অপর্ণার বাহুপাশ আলগা করে চেয়ারে বসল অবসনের মতো। বলল, একটু জল দাও। ঠাণ্ডা জল।
উদ্বিগ্ন অপর্ণা দৌড়ে গিয়ে ফ্রিজের জল নিয়ে এল, তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?
মণীশ মাথা নেড়ে বলে, না। মাঝে মাঝে একটু হাফ ধরে যায়। হাৰ্ট একটা ভীষণ জরুরি জিনিস। তাকে বেশী উত্তেজিত করতে নেই।
দাও, প্ল্যানটা আমি এখনই ছিঁড়ে ফেলছি।
না অপু, থাক। আমার মনে হচ্ছে, তুমি ঠিকই করেছে। ও বাড়িতে আমাদের ফাঁকাই লাগবে।
আচ্ছা, আর এত রাগ করতে হবে না। নিচের তলাটা আমরা একটা হলঘরই রাখব। আমার অনেকদিনের ইচ্ছে, পাড়ার ওয়ার্কিং মায়েদের বাচ্চাদের জন্য একটা ক্রেশ করি। কলকাতায় ভাল ক্ৰেশ নেই। আমি একটা কিছু নিয়ে থাকতে চাই। দেবে করতে?
মণীশ একটা গভীর শ্বাস ছেড়ে বলে, কোনো অপু।
হ্যাঁ গো, সত্যিই শরীর খারাপ লাগছে না তো! আজ তাহলে অফিস গিয়ে কাজ নেই।
মণীশ বলল, আজ জরুরি কাজ আছে অফিসে। যেতে হবে। শরীর ঠিক আছে অপু। তবে মনে হয়, আমার একটু চেঞ্জ দরকার ছিল।
তাহলে চলো না, পুরী থেকে কয়েকদিন ঘুরে আসবে।
মণীশ ম্লান হেসে মাথা নেড়ে বলে, অনেক কামাই হয়েছে অপু। আর ছুটি নেওয়া যায় না। কাজও অনেক জমে গেছে।
এই বলে মুখের বিবৰ্ণতাটুকু নিয়েই বেরিয়ে গেল মণীশ। পিছনে একা ঘরে কেমন বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল অপর্ণা। চোখ ভরে আসছে জলে। এ কান্নাকে থামানো যাবে না কিছুতেই। তার এখন কান্নাই দরকার। মণীশ কেন সব বুঝতে পারে। তার মনের কথা, তার ভবিষ্যতের গোপন চিন্তা, সবই যে ধরা পড়ে যাচ্ছে মণীশের কাছে! অথচ সে তো চায় মণীশ আরও একশো বা হাজার বছর বেঁচে থাকুক। সে কি তা চায় না। অবশ্যই চায়। আবার এও সত্য, সে বাস্তববাদী, সে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্না। ভাবাবেগে ভেসে যেতে নেই, বেশী বিস্তার করা উচিত নয় কল্পনার পাখা। সে তাই একতলাটা ভাড়া দেওয়ার কথা ভেবে রেখেছিল। কোনও দোষ হয়নি তাতে। অথচ মণীশ কত কী ভেবে নিল হয়তো।
এক একটা দিন যেন পাষাণভার নিয়ে আসে। সারাটা দিন যেন দমচাপা, পাগল-পাগল, বিচ্ছিরি। আজকের দিনটা কিরকম যে যাবে, কে জানে! এরকম সব বিচ্ছিরি দিনে মাঝে মাঝে অপর্ণার ইচ্ছে করে কেরোসিনে স্নান করে একটা দেশলাই কাঠি ঘষে দেয় শরীরে।
এক বুক ভালবাসা আছে বলেই না এত জ্বালা! যাদের সে ভালবাসে না, তাদের জন্য তো জ্বালা-যন্ত্রণা নেই, উদ্বেগ নেই, অশান্তি নেই। কিন্তু যাদের ভালবাসে তাদের জন্যই সবসময়ে বুক দুরু-দুরু, তাদের মুখ একটুখানি হাস্যহীন দেখলেই বুক ফাঁকা লাগে। তাহলে ভালবাসার এত গুণগান করে কেন লোকে? ওই যে ফ্যাকাসে মুখখানা নিয়ে বেরিয়ে গেল মণীশ, এখন সেই মুখখানা সারাদিন চোখের সামনে আসবে, আর জ্বালাতন হবে সে। তার পাগল স্বামী তাকে একদিন বলেছে, পঁচিশ হাজার বছর বেঁচে থাকলে তারা নাকি আর পরস্পরকে ভালবাসতে পারত না। মণীশ পারত কিনা কে জানে। কিন্তু অপর্ণা পারত। খুব পারত। ভাগ্যিস পঁচিশ হাজার বছর তাদের বাঁচতে হবে না। হলে পঁচিশ হাজার বছর ধরে সহ্য করতে হত এই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। এই কয়েক বছরেই পঁচিশ হাজার বছরের অভিজ্ঞতা হয়ে গেল বোধ হয় তার।
বিকেলে শুকনো মুখে মেয়েটা ফিরল।
অপর্ণা বলল, কি রে, মুখ শুকনো কেন?
ঝুমকি বড় শান্ত বিবেচক মেয়ে। একটু চুপচাপ আপনমনে থাকতে ভালবাসে। বলল, দেখ না মা, ওরা মোটে তিন শশা টাকা মাইনে দেবে বলছে।
অপর্ণা উত্তষ্ঠ হয়ে বলল, ওরা কারা? অমন অর্ধেক করে কথা বলিস কেন?
একটা কম্পিউটার ফার্ম।
তিনশো টাকা মাত্ৰ!
তিনশো টাকাতেই লোক পেয়ে যাবে।
অপর্ণা মেয়ের দিকে চেয়ে থেকে বলল, তুই ও চাকরি করবি?
ভাবছিলাম চাকরিটা ভাল না হলেও এক্সপেরিয়েন্স তো হবে।
চারুশীলার ভাই যে তোকে চাকরি দেবে বলেছিল, তার কী হল।
