একটুও চেনা লাগল না কাউকে?
না বীণাদি। বোধ হয় বাইরের ছেলে।
কত বয়স হবে?
পঁচিশ-ছাব্বিশ বলে মনে হয়।
প্যান্ট-শার্ট পরা?
একজনের পরনে পায়জামা ছিল।
আবার দেখলে চিনতে পারবে?
জানি না। এত ভয় পেয়েছিলাম যে, কিছু মনে পড়ছে না।
বীণা ভ্রূ কুঁচকে পারুলের দিয়ে চেয়ে রইল। তার মনে হয়, পারুল মিথ্যে কথা বলছে। ধর্ষণকারীদের কাউকে হয়তো সে চেনে।
তবে বীণা আর আকচাকিচি করল না। বলল, ডাক্তাররা কী বলছে! কবে ছাড়বে তোমাকে?
দু-তিন দিন লাগবে।
পুলিশ কী বলে গেল?
আরও নাকি জানতে আসবে। তুমি আমার কাছে একটু বসবে বীণাদি? বসলে আমার একটু সাহস হয়।
আমি নিজেই তো ভীতু।
তুমি মোটেই ভীতু নও। একা একা কেমন ডাকাবুকোর মতো থাকো, তোমাকে সবাই ভয় খায়।
আমি বুঝি দেবী চৌধুরানী?
তোমার বেশ তেজ আছে? আমাদের নেই। আমার জায়গায় তুমি হলে ওরা পারত না।
বীণা বিছানার একধারে একটু বসল। তারপর বলল, তোমার প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে করে না?
খুব করে।
কি ভাবে নেবে?
তা তো জানি না। ইচ্ছে করে ওদের ধরতে পারলে জলবিছুটি দিই। আমার ভবিষ্যৎটাই তো নষ্ট হয়ে গেল।
বীণা মাথা নেড়ে বলে, নষ্ট হবে কেন? নতুন ভবিষ্যৎ তৈরি হবে। যারা রেপ হয় তারা পচে যায় না।
তুমি বেশ বলো। ঠিক যেন সিনেমার ডায়ালগ।
নাটক করি বলে বলছ?
না না, ছিঃ। তা নয়। কথাগুলো সুন্দর। সাহস হয় শুনলে।
তোমার এখন সাহসই তো দরকার। অনেকে যা হয়েছে তা মেনে নেয়। তুমি মেনে নিও না।
কী করব তা বলে দেবে?
ভেবে বলব। এখন নয়। আমারও অনেক লড়াই আছে। অনেক পথ যেতে বাকি।
কিন্তু তুমি তো রেপ হওনি বীণাদি। হলে বুঝতে।
পারুল হঠাৎ ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে লাগল।
বীণা চুপ করে বসে রইল। সে ডায়ালগ দেয় বটে। কিন্তু তার ভিতরটা বড় শূন্য।
০৫৯. বাড়ির প্ল্যান পাল্টাতে হল
বাড়ির প্ল্যান পাল্টাতে হল মণীশকে, অপর্ণা পরিষ্কার বলল, তুমি যাকে দিয়ে প্ল্যান করিয়েছে সে বড়লোকদের প্ল্যানার। আমাদের মত মধ্যবিত্তের জন্য নয়। নিশ্চয়ই একগাদা টাকা নিয়েছে।
মণীশ খুব অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে বলল, না, তেমন কিছু নয়।
অপর্ণা ম্লান একটু হেসে বলল, শুনতে চাই না। শুনলে আমার মন খারাপ হবে। শোনো, তোমার রক্ত জল-করা টাকা ওভাবে ওড়াতে নেই। টাকা আমাদের কাছে সস্তা নয়। আমি অন্য প্ল্যানারকে দিয়ে প্ল্যান করিয়ে নিচ্ছি। তুমি আর বাড়ি নিয়ে মাথা ঘামাবে না।
মণীশ লজ্জার সঙ্গে বলল, লেকটা আমার বন্ধু। ও আবার প্ল্যান করে দেবে। আর ফি দিতে হবে না। কথা হয়ে আছে, প্ল্যান অলটার করলে আর বাড়তি কিছু লাগবে না।
তাহলে শোনো, আমি অনেকদিন আগে থেকেই বাড়ির একটা রাফ স্কেচ করে রেখেছি। খুব ভেবেচিন্তে, আমাদের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই করেছি। সেটা ওই ভদ্ৰলোককে দিও। উনি ওটা দেখে প্ল্যান করে দেবেন।
অপর্ণা বাস্তবিকই তার কাঁচা হাতে সাদা কাগজে প্ল্যান করেছে। একটা নয়, একাধিক। দুপুরে বা বিন্দ্রি রাতে সে ভেবে ভেবে ঘর বারান্দা সিঁড়ি এঁকেছে। এ তার স্বপ্নের বাড়ি। খুব বড় নয়। ছোট মিষ্টি একখানা, দোতলা, বাগানঘেরা, চটকদার নয়, কিন্তু ছিমছাম। কী রঙ হবে তাও ভেবে রেখেছে। সেই আঁকা কাগজ সে মণীশের হাতে দিয়ে বলল, ঠিক এরকম হবে। মনে রেখো। ঘর আর বারান্দার মাপও দিয়ে দিয়েছি।
মণীশ একটু কাচুমাচু হয়ে বলে, দত্ত একটা কথা বলছিল। আধুনিক কনসেপশন হচ্ছে ছাদে সোলার প্যানেল লাগিয়ে নেওয়া।
সোলার প্যানেল! বলে চোখ কপালে তোলে অপর্ণা, কী হবে সোলার প্যানেল দিয়ে?
ঘরদোর শীতকালে গরম করা যাবে, গরম জলের অভাব হবে না।
অপৰ্ণা আকুল হয়ে বলে, কী মানুষ বলে তো তুমি! বাচ্চা ছেলে নাকি? এটা কি সাহেবদের দেশ যে ঘর গরম করতে হবে। এ শহরে বছরের মধ্যে নয় মাসই তো গরম। আর গরম জল আমাদের কোন কাজে লাগবে? তোমাকে নিয়ে যে আর পারি না।
মণীশ একটু গম্ভীরভাবে কাগজগুলো দেখে নিয়ে তার অ্যাটাচি কেসে ভরে যখন রওনা হচ্ছিল তখন অপর্ণার বড় কষ্ট হল মণীশের জন্য। বাচ্চা ছেলের হাত থেকে খেলনা কেড়ে নিলে তার যেমন অভিমানী মুখ হয় মণীশের মুখের অবস্থা ঠিক তেমনি। অপর্ণা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দুহাতে মণীশকে জড়িয়ে ধরে বলল, রাগ করোনি তো!
মণীশ হাসল, বলল, না। তুমি এ্যাকটিক্যাল আর আমি ড্রিমার। তুমিই ঠিক কথা বলছো। আমি শুধু ভাবি, ড্রিমারদের দিয়ে দুনিয়ার কিছুই বোধ হয় হয় না।
ওভাবে বলো না। স্বপ্ন কি আমিও দেখি না! তোমার মতোই দেখি। কিন্তু মাটিতে পা রেখে। তুমি যে পাখনা মেলে উড়ে যাও কল্পনার রাজ্যে! দুঃখ পাওনি তো!
না। তোমার কথায় দুঃখ পাবো কেন অপু? তুমি তো বরাবর আমাকে তোমার সবটুকু দিয়ে আড়াল করে রাখতে চেয়েছে।
আজকাল তোমাকে বড় ভয় পাই। একটুতেই অভিমান করে যে!
মণীশ পুব ফ্যাকাসে একটু হেসে বলে, তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কি তাহলে ফর্মাল হয়ে যাচ্ছে অপু যদি বেশী মন বুঝে চলতে শুরু করে তাহলে যে আমি আর আমার আগের পাগলি, সোহাগী, ডমিনেটিং অপুকে খুঁজে পাবো না।
অপর্ণা দুহাতে মণীশের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, আমি বুঝি বদলেছি? তুমিই তো বড্ড গোমড়া মুখ করে থাকো।
আমার মুখ গোমড়া করে দাও কেন? আমি তো হাসিখুশিই থাকতে চাই।
অপর্ণা অবাক হয়ে বলে, আমি মুখ গোমড়া করে দিই? ওমা! বলে কী রে?
মণীশ তার অ্যাটাচি খুলে অপর্ণার আঁকা স্কেচগুলো বের করে বলল, দেখ অপু, একতলার ডিজাইনে তুমি একা হলঘর এঁকেছে। এক কোণে ছোট্ট করে লিখেছে ব্যাঙ্ক অর অফিস। কেন লিখেছে অপুএকতলাটা ভাড়া দিতে চাও?
